kalerkantho

শনিবার । ১৬ নভেম্বর ২০১৯। ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিদায় ত্যাগী রাজনীতিক মোজাফফর আহমদ

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিদায় ত্যাগী রাজনীতিক মোজাফফর আহমদ

জন্ম : ১৯২২ মৃত্যু : ২০১৯

দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আর নেই। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৯ মিনিটে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে ছিলেন। এই ত্যাগী রাজনীতিকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন।

রাষ্ট্রপতি এক শোক বার্তায় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

প্রধানমন্ত্রী এক শোক বিবৃতিতে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিতে তাঁর অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং তাঁর পরিবারের শোকাহত সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

পৃথক শোক বার্তায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

কুঁড়েঘর প্রতীকের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে বলা হতো বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম কুশীলব। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি এ দেশের রাজনীতি অঙ্গনের ঊজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন এবং জীবিত কিংবদন্তির এক দুর্লভ উদাহরণ। প্রায় আট দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই মানুষ ইতিহাসের ‘নায়ক’ হতে পারেননি বটে; তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন। কারো কারো মূল্যায়ন—তিনি চলমান ইতিহাস।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) কুমিল্লার দেবীদ্বারে এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে হিসাবে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর চার মাস। তাঁর পিতা আলহাজ কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া ছিলেন স্কুলশিক্ষক, মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। মোজাফফর আহমদ হোসেনতলা স্কুল, জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশন, দেবীদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে লেখাপড়া করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ইউনেসকোর ডিপ্লোমা লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কৃতী ছাত্র দীর্ঘদিন বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা শেষে ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন।

মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ১৯৩৭ সালে। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরিভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেবীদ্বার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মুসলিম লীগের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করেন। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার মোফাফফর আহমদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে। এমনকি তাঁকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়। তিনি আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় আইয়ুবি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। আট বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে তিনি আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন। এই রাজনীতিক ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং কারাবরণ করেন। তিনি আইয়ুব খান আহৃত রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন।

একাত্তরের স্বাধীনতাসংগ্রামে মূল নেতৃত্বের একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে তিনি বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ওই সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ, সিপিসি ও ছাত্র ইউনিয়নের নিজস্ব ১৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধা গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মন্ত্রিত্ব নিতে অস্বীকার করেছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ২০১৫ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার ঘোষণা হলেও রাজনৈতিক আদর্শের কারণে তিনি তা গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯৭৯ সালে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে ন্যাপ, সিপিবি ও প্রগতিশীল শক্তির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শুরুতে কারারুদ্ধ হন এই রাজনীতিক।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের স্ত্রী আমিনা আহমদ নিজেও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। হাঁটতে-চলতে সমস্যা হয়। বর্তমানে দলের নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তাঁদের একমাত্র মেয়ে আইভী রহমান মস্কোতে চিকিৎসাবিদ্যা বিষয়ে লেখাপড়া করেন। গত রাত সাড়ে ৮টায় তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবার জানাজা ও তাঁকে কোথায় দাফন করা হবে সে ব্যাপারে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেবেন।’

ন্যাপের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পরিতোষ দেবনাথ গত রাতে জানান, আজ শনিবার সকাল ১১টায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মরদেহ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নেওয়া হবে। পরে সেখান থেকে নেওয়া হবে ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটে দলীয় কার্যালয়ের সামনে।

সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুপুর ১২টায় মোজাফফর আহমদের মরদেহ নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এরপর বাদ জোহর বায়তুল মোকাররমে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে অধ্যাপক মোজাফফরের মরদেহ নেওয়া হবে কুমিল্লায় তাঁর নিজের এলাকায়। আগামীকাল রবিবার সকালে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা