kalerkantho

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া

► টেকনাফে যুবলীগ নেতাকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা
►স্থানীয়দের ব্যাপক বিক্ষোভ
►সীমান্ত থমথমে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি   

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে যুবলীগ নেতা হত্যার পর গতকাল টেকনাফের জাদিমুরা ক্যাম্প এলাকায় বিক্ষোভ করে স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রোহিঙ্গাদের বিপদের সময় কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা আশ্রয়সহ সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল। তারাই এখন উগ্রপন্থী কিছু রোহিঙ্গার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গত বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফে যুবলীগের এক নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। হত্যাকাণ্ডের খবরে বিক্ষুব্ধ কয়েক হাজার স্থানীয় বাসিন্দা গতকাল শুক্রবার মহাসড়ক অবরোধ করে। একপর্যায়ে তারা রোহিঙ্গা শিবির ও শিবিরসংলগ্ন কয়েকটি সংস্থার কার্যালয়ে হামলা চালায়। রোহিঙ্গা শিবির থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দারা আগে থেকেই করে আসছিল। কিন্তু এবার খোদ আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের ওপর আশ্রিত গোষ্ঠীর একাংশের সরাসরি হামলা ও হত্যাকাণ্ড পুরো পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। উত্তেজনা বিরাজ করছে টেকনাফ সীমান্তে।

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে যুবলীগ নেতা হত্যাকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরা ক্যাম্প এলাকা উত্তপ্ত ছিল। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ, আনসার সদস্য নিয়োজিত রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, রোহিঙ্গা উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে টেকনাফের এক যুবলীগ নেতা নিহত হওয়াকে ঘিরে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ

ভেস্তে যাওয়ার পর উল্লাস করেছিল উগ্রবাদী রোহিঙ্গা গোষ্ঠী এবং রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির কারণে সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা। ওই উগ্রবাদী রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে। কারণ তারা মিয়ানমারে ফিরে গেলে সেখানে তাদের অতীত অপরাধের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। যুবলীগ নেতা হত্যার সঙ্গে ওই গোষ্ঠী সরাসরি সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন বন্ধ হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের কয়েকটি সংগঠন ক্যাম্পে উল্লাস করেছে। তাদের মধ্যে একটি সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে উল্লাস করতে করতে রোহিঙ্গা শিবির থেকে বাইরে চলে আসে। এ সময় তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুবলীগের এক নেতাকে অপহরণ করে তারা। পরে তাঁকে পাহাড়ে রোহিঙ্গাদের টর্চার সেলে নিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

নিহত যুবলীগ নেতার নাম ওমর ফারুক (৩০)। তিনি টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরা গ্রামের আব্দুল মোনাফের ছেলে। হ্নীলা ইউনিয়ন ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি জাদিমুরা এমআর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন।

গতকাল নিহত যুবলীগ নেতার জানাজা শেষে উপস্থিত হাজারো বাসিন্দা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে ওমর ফারুকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানায়। স্থানীয় বাসিন্দারা রোহিঙ্গাদের কর্মকাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত তাদের দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছে।

গতকাল সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জানা যায়, বৃহস্পতিবারের প্রত্যাবাসন বন্ধ হওয়ায় শালবাগান, জাদিমুরাসহ চারটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা আনন্দ উল্লাস করে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভোজেরও আয়োজন করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের একটি দল জাদিমুরা ক্যাম্পের বাইরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছিল। বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে বাড়ির পাশে নিজেদের পারিবারিক জমিতে কাজে গিয়েছিলেন ওমর ফারুক। তখন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়ারত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপকে তিনি টর্চলাইটের আলোতে দেখার চেষ্টা করেন। এতে রোহিঙ্গা গ্রুপটি ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে তুলে পাহাড়ে নিয়ে যায়। এরপর গুলি করে হত্যা করে তাঁর বাড়িতে সেই খবরও পৌঁছায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ কালের কণ্ঠকে জানান, সীমান্তে ইয়াবা পরিস্থিতি সামাল দিতে না দিতেই হঠাৎ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা স্থানীয় এক যুবলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় জনতা উত্তেজিত হলে পরিস্থিতি ভিন্নপথে প্রবাহিত হওয়ার আগেই পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ওসি প্রদীপ আরো জানান, এর আগেও বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও ইয়াবা কারবারি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এখন ক্যাম্পের ভেতরে স্বশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠন এবং উগ্রবাদী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগির সেখানে অভিযান চালানো হবে।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুবলীগ নেতা ওমর ফারুককে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা নির্মমভাবে হত্যা করলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়। পরে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে লোকজনকে শান্ত করার চেষ্টা করি।’

এদিকে জাদিমুরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তারা গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে ক্যাম্পের ভেতর একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে জরুরি বৈঠক করেছে। তারা যেকোনো সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের অনেকে তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে অভিযোগ করছে, জোর করে ফেরত পাঠাতে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানায়, রোহিঙ্গাদের মানবতার খাতিরে এ দেশে ঠাঁই দেওয়া হলেও তারা এখন আমাদের দেশের জন্য বিভিন্ন দিকে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। উখিয়া, টেকনাফের প্রতিটি পাহাড় উগ্রবাদী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠনের ডেরায় পরিণত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ওই এলাকাটিতে অপরাধের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। ২০১৫ সালে আল-ইয়াকিন নামধারী একটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে কর্তব্যরত আনসার কমান্ডারকে হত্যা এবং ২০টি অস্ত্র লুট করেছিল। গত দুই বছরে ওই শিবিরে সন্ত্রাসীদের হামলায় অন্তত আটজন স্থানীয় বাসিন্দা নিহত হয়। ওমর ফারুক হত্যার প্রতিবাদে গতকাল স্থানীয় বাসিন্দারা সমবেত হয়েছে জেনে রোহিঙ্গাদের একটি গোষ্ঠীও একত্র হয়ে প্রায় মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছিল। সে সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

একটি কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ওমর ফারুক হত্যার প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দারা সমবেত হওয়ার পরপরই জাতিসংঘ কর্মীদের টেকনাফ, জাদিমুরা ও নোয়াপাড়া শিবির এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

মন্তব্য