kalerkantho

রোহিঙ্গাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া গ্রুপের উল্লাস

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার ও জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ   

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রোহিঙ্গাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া গ্রুপের উল্লাস

ইউএনএইচসিআরকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর টেকনাফের শালবন ক্যাম্পে রোহিঙ্গা মা

বাংলাদেশের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও মিয়ানমারে সমস্যার কারণে রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে রাজি হচ্ছে না। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদ তীরের শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে মিয়ানমার ও চীন দূতাবাসের তিনজন প্রতিনিধিকে পাশে রেখে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনকমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘যাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে তারা ফিরতে আগ্রহী নয়। তাদের মনোভাব পরিবর্তন হলে এবং যখনই তারা ফিরে যেতে সম্মতি জানাবে তখনই পাঠানো হবে। প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

এদিকে গতকাল প্রত্যাবাসন শুরুর নির্ধারিত দিনেও শালবাগান শিবিরে ১২৬টি পরিবারের রোহিঙ্গারা জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রতিনিধির কাছে গিয়ে সাক্ষাৎকার পর্বে অংশ নিয়েছে। তিন দিনের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারে গতকালও রোহিঙ্গারা অভিন্ন সুরে বলেছে, তারা এ মুহূর্তে দেশে ফিরে যাবে না। আরআরআরসি বলছেন, বাংলাদেশ কোনো রোহিঙ্গাকে জোর করে ফেরত পাঠাবে না। চীন দূতাবাসের একজন প্রতিনিধিও বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তবে এটি শুরু করতে হবে।

এদিকে আরআরআরসি আপাতত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার কথা ঘোষণা দেওয়ার পর আশ্রয় শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাইরের কিছু কর্মীও উল্লাস প্রকাশ করে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উল্লাস প্রকাশকারী এসব কর্মী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত। তাদের মধ্যে কেউ এনজিওকর্মী, কেউ রোহিঙ্গা শিবিরের ব্যবসায় জড়িত, কেউবা প্রত্যাবাসন কাজে বিরোধিতায় সক্রিয়। সাংবাদিকরা উল্লাস প্রকাশকারীদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা দ্রুত সরে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষায়, এরা আসলে রোহিঙ্গাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়া গ্রুপ।

অন্যদিকে আরআরআরসির সংবাদ ব্রিফিংয়ে মিয়ানমার ও চীনের প্রতিনিধির উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় লোকজন খুশি। কারণ প্রত্যাবাসন না হওয়ার দায় মিয়ানমার বরাবর বাংলাদেশের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। সে ক্ষেত্রে এবার চীনও দেখেছে যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাঠাতে চাইলেও মিয়ানমারের ওপর আস্থার ঘাটতির কারণে রোহিঙ্গারা ফিরতে চায় না।

গতকাল সকাল থেকে শালবাগান শিবিরে মিয়ানমারে ফিরতে ছাড়পত্রপ্রাপ্ত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপকালে সাংবাদিকরা বুঝতে পারেন যে তারা সবাই একই সুরে এবং অভিন্ন কথা বলছে। অনেকেই মনে করছেন, রোহিঙ্গাদের এ রকম ‘বুলি’ কারো শেখানো। ওই শিবিরটির তিন হাজার ১৪০ জন রোহিঙ্গা দেশে ফিরতে ছাড়পত্র পেয়েছে। তাদের অনেক পরিবারের প্রধান আগের রাতে অন্যত্র অবস্থান করেছেন।

শিবিরের এ-৪ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মা কুলসুমা বেগম (৫৫) হচ্ছেন পরিবারপ্রধান। বুধবার দুপুরে আমাদের ঘরে ইউএনএইচসিআরের এক কর্মী এসে মাকে তাঁর তালিকাভুক্তির কথা জানান। এটা জেনেই তত্ক্ষণাত্ মা ঘর থেকে পালিয়ে গেছেন।’

পরিবারটির ছয় সদস্যের মধ্যে আবদুল্লাহর নাম অবশ্য তালিকায় নেই। গতকাল এ প্রতিবেদকের মুখে প্রত্যাবাসন আপাতত না হওয়ার কথা শুনেই আবদুল্লাহ তাঁর মাকে ফিরিয়ে আনতে অন্যত্র চলে যান। ওই একই ব্লকের আবদুস সালাম নামের আরেক রোহিঙ্গার দরজাটিতে তালা লাগানো ছিল। পাশের ঘরের বাসিন্দা ইয়াসমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, স্বামী-স্ত্রীসহ সন্তানদের নিয়ে তিনি হাসপাতালে গেছেন।

পরে আবদুল্লাহ নামে অপর এক রোহিঙ্গা এগিয়ে এসে বলেন, আসল কথাটি ভয়ে বলছে না। মিয়ানমারে ফিরতে তালিকাভুক্ত হওয়ায় ভয়ে আগের রাত থেকেই তাঁরা অন্যত্র সরে গেছেন। প্রত্যাবাসন আপাতত স্থগিত ঘোষণার কথা শুনে গতকাল বিকেলে অবশ্য পরিবারটি ফিরে এসেছে।

স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ, প্রত্যাবাসনে ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করার দাবি : দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভণ্ডুল হওয়ায় কক্সবাজারের বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ। রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের গাফিলতি ছিল কি না তা তারা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে সুকৌশলে অবস্থান করানোর চক্রান্ত চলছে। গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যর্থতা নিয়ে কালের কণ্ঠর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসনিক একটি ‘অদৃশ্য দ্বন্দ্ব’ রয়েছে। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা কাজ করছেন। উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি শিবির তাঁরাই দেখাশোনা করে থাকেন। তাঁদের ভূমিকা ও এনজিওগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়েও স্থানীয় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন আছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আরআরআরসি দপ্তরের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।

তবে আরআরআরসি মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেছেন, তাঁরা অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন। অন্যদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তাঁর প্রশাসনের যা যা করার দায়িত্ব দেওয়া তাই পালন করেছেন।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ-উখিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিরোধীরা বরাবরই সোচ্চার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ নাগরিক সমাজকে কাজে লাগাতে হবে। রোহিঙ্গাদের এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম নেতা উখিয়ার নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেছেন, রোহিঙ্গাদের শিবিরের বাইরে বের হওয়া, চাকরির সুযোগ বন্ধ করতে হবে। এনজিওগুলো প্রত্যাবাসনবিরোধী ভূমিকার ব্যাপারে নজরদারি বাড়াতে হবে।

কক্সবাজারের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গাদের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা উপার্জনের পথ বন্ধ করতে হবে। সবার আগে বন্ধ করতে হবে তাদের ইয়াবা কারবার।

মন্তব্য