kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

পেঁয়াজের বাজার লাগামছাড়া

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে প্রায় ২০ টাকা

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম ও গোলাম মোস্তাফিজার রহমান মিলন, হিলি   

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পেঁয়াজের বাজার লাগামছাড়া

দিনাজপুরের হিলির আড়তগুলোতে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম হঠাৎ আবার বেড়ে গেছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারেও প্রতিদিন দাম বাড়ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ২০ টাকা বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে দেশি পেঁয়াজের বাজারেও।

হিলির আড়তগুলোতে কোরবানির ঈদের আগে যে পেঁয়াজ পাইকারি বিক্রি হয়েছে ২২-২৫ টাকা দরে, সেই পেঁয়াজ এখন ৩৫-৪০ টাকা। অন্যদিকে চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪৮ টাকা দরে, যা ঈদের আগে ছিল ২৬-২৮ টাকা। চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে পেঁয়াজ

বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকা কেজি দরে। ঢাকার খুচরা বাজারেও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ৬-১০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা দরে। চার দিনের ব্যবধানে ঢাকার খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে আরো ১০-১৫ টাকা। এখন প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের অজুহাত, ভারতে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্যে বন্যা হওয়ায় এবং পরিবহন ধর্মঘটের কারণে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। তবে খুচরা বিক্রেতারা বলছে, আমদানি কম হওয়ার সুযোগ নিয়ে হিলি বন্দরের পাইকাররা কারসাজি করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

দেশের চাহিদার বেশির ভাগ পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি হয়ে থাকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে। আর এই পেঁয়াজ আমদানির ফলে বন্দর এলাকায় গড়ে উঠেছে আড়ত, যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পেঁয়াজ কিনতে আসে পাইকাররা।

আড়ত ঘুরে জানা গেছে, দুই দফায় পেঁয়াজের দাম বেড়ে প্রকারভেদে বন্দরের আড়তগুলোতে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে, যা কোরবানির ঈদের আগে আড়তগুলোতে বিক্রি হয়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকায়।

হিলি কাস্টমসের তথ্য মতে, গত দুই কর্মদিবসে ভারত থেকে ৫১ ট্রাক পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে এই বন্দর দিয়ে।

হিলি স্থলবন্দর আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ জানান, বন্দর দিয়ে কম আমদানি হওয়ায় হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার জন্য অনেক এলসি দেওয়া হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আমদানি হলে বাজার আবার স্বাভাবিক হবে।

কিন্তু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও এশিয়ান এজের গতকালের প্রতিবেদনে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ সংকটের কথা উল্লেখ করে নতুন করে রপ্তানি মূল্য আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে।

ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের খুচরা বাজারে পাঁচ দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম ১৮ শতাংশ বেড়েছে। কলকাতার খুচরা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজি ৩৫ রুপি, দিল্লিতে ৩৩ রুপি, চেন্নাইয়ে ২৭ রুপি ও মুম্বাইয়ে ৩০ রুপি দরে। ভারতের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী দুটি রাজ্য কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রে বন্যা হওয়ায় ফলন বিপর্যয় হয়েছে এবং সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় বিভিন্ন রাজ্যে পেঁয়াজের দাম বেড়ে চলেছে। দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়াতে ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নতুন করে ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য (এমইপি) আরোপের চিন্তা করছে। আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠকে গত বুধবার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

এই সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে বাংলাদেশের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ বাংলাদেশের আমদানিকারকরা মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই প্রধানত পেঁয়াজ আমদানি করে থাকে।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ কাঁচাপণ্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের বন্ধের পর স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি কমে গেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ অনেক কম। পুরো বাজার মিলিয়ে ২০০ বস্তা পেঁয়াজ খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে। এ অবস্থায় তিন দিন আগে থেকেই বাজারে দাম বাড়ছে পেঁয়াজের।’ তিনি বলেন, গত বুধবার সকালে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪০ টাকা, বিকেলে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আর গতকাল বৃহস্পতিবার বিক্রি হয়েছে ৪৮ টাকায়।

খাতুনগঞ্জের আদা-রসুনের বড় আমদানিকারক ফরহাদ ট্রেডিংয়ের মালিক নুর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আদা-রসুনের বাইরে আমদানি সাধারণত করি না। কিন্তু বাজারে পেঁয়াজের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে বিকল্প দেশ থেকে আমদানি করে চাহিদা সামাল দিতে হবে। এ জন্য আমি বেশ কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজের দর নিয়েছি, বাজার পর্যবেক্ষণ করছি। কিন্তু দেশের স্বার্থে বাজার স্থিতিশীল করতে আমরা আমদানির পর যদি বাজারে ধস নামে তাহলে তো আমি পথে বসব।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকার যদি এই সংকট মোকাবেলায় উদ্যোগ নেয়, ব্যাংক সুবিধা নিশ্চিত করে তাহলে বাজার স্থিতিশীল করতে আমি আমদানি করতে পারি।’

এদিকে আড়তে দাম বাড়ার কারণে খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়েছে। গতকাল চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫২ টাকা কেজি দরে। জানতে চাইলে খুচরা দোকানি নাসির অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক নাসির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বুধবার কেজি ৪৬ টাকা দরে খাতুনগঞ্জ থেকে পেঁয়াজ কিনে এখনো বিক্রি করতে পারিনি। একেক দিন একেক দাম শুনে ক্রেতারা কিনতে চাইছে না। পেঁয়াজ সব পড়ে আছে দোকানে।’

ঢাকা থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, তিন থেকে চার দিন আগে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ৫-১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ে। দাম বৃদ্ধির পর প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪০-৪৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৪০-৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।

ঢাকার পাইকাররা বলছেন, আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বাড়লে দেশি পেঁয়াজ কী ক্ষতি করেছে। এটার দাম আরো বের্িশ হওয়া উচিত। তা ছাড়া মৌসুমও শেষ দিকে। আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বাড়লে এমনিতেই দেশি পেঁয়াজের দাম বাড়ে।

কারওয়ান বাজারের আড়তদার শরিফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলসির (আমদানি করা) পেঁয়াজের দাম বাড়লে দেশি পেঁয়াজের দাম বাড়ে। মৌসুম শেষ, এখন তো কৃষকের কাছেও তেমন পেঁয়াজ নেই। এই কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা