kalerkantho

ডেঙ্গুতে মৃত্যু নিয়ে ভূতুড়ে হিসাব

মোট আক্রান্ত ৬০ হাজার ছুঁয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ১৬২৫, আরো দুই মৃত্যু

তৌফিক মারুফ   

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ডেঙ্গুতে মৃত্যু নিয়ে ভূতুড়ে হিসাব

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালে। অথচ জানালার পাশেই যেন এডিস মশার আঁতুড়ঘর। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

তসলিম (৩৫) ও তাসনিম (১৭) নামের ডেঙ্গু আক্রান্ত দুই রোগী গত বুধবার মারা যায় রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ওই হাসপাতালে এ নিয়ে এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট সাতজনের মৃত্যু ঘটেছে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন ওই হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এম এ রশিদ। কিন্তু গতকালই ওই হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমে পাঠানো তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত এখানে ভর্তি দুই হাজার ৮৮৯ জন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৯৭ জন আর ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি গেছে দুই হাজার ৪৫২ জন। পাঠানো তথ্য ছকে মৃত্যুর ঘর থাকলেও তা ফাঁকা রাখা। সেখানে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় সালাউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমে পাঠানো হিসাবে দেখানো হয়েছে, মোট ৬০০ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল, এর মধ্যে ৫৬৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে আর বাকি ৩১ জন গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ওই হাসপাতালের সপ্তম তলার ইনচার্জ শাহিনা আক্তারও কালের কণ্ঠকে একই তথ্য জানান। সেই সঙ্গে ওই হাসপাতালে ডেঙ্গুতে তিন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ভর্তি, ছাড়পত্র নেওয়া আর চিকিৎসাধীন থাকার সংখ্যা যোগ করে মোট হিসাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো রোগীর সংখ্যাই বাদ যায়নি। কিন্তু গোল বেধেছে ওই হাসপাতালে মারা যাওয়া তিনজন রোগী নিয়ে। ৬০০ জনের মধ্যে ৫৬৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে আর ৩১ জন এখানো চিকিৎসাধীন বলে ধরে নেওয়া হলে মৃত ওই তিনজনের হিসাব কোথায় গেল সেই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি তারা।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির কালের কণ্ঠকে গতকাল বিকেলে বলেন, তাঁর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট ছয়জনের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু ওই হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো তথ্যে কোনো মৃত্যুর হিসাব নেই, বরং মোট ভর্তি হওয়া এক হাজার ৪৩০ জনের মধ্যে ১৬৩ জন গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল এবং বাকি এক হাজার ২৬৭ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। এখানেও হিসাবে কোনো ভুল নেই; সংখ্যার হিসাবে সবই মিলে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে মৃত ছয়জনের হিসাব নিয়ে।

ওই পরিচালক অবশ্য নিজের হাসপাতালে জনবল সংকটের কারণে রোগীর হিসাবের সঠিক বিশ্লেষণ করার সুযোগ পাননি বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সেই সঙ্গে বলেন, ‘আমি অবশ্য এক হাজার ৪৩০ জনের সঙ্গে ছয়জন যোগ করে এক হাজার ৪৩৬ করে দিয়েছি মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা।’

কেবল এ কয়টি হাসপাতালই নয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও মিলেছে একই চিত্র। গতকালের তথ্যে দেখানো হয়েছে, এ পর্যন্ত মোট রোগী ভর্তি হয়েছিল পাঁচ হাজার ৫১৪ জন, হাসপাতালে আছে ৫১৩ জন, ছাড়পত্র নিয়ে গেছে চার হাজার ৯৯৮ জন আর মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। এখানেও হিসাবে একটি সংখ্যার সঙ্গে আরেকটি সংখ্যা যোগ করে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে আমাদের এখানে মৃত্যু কেবল তিনজনের নয়, সংখ্যাটা আরো বেশি; যা আমরা প্রথম দিকে সবাইকেই জানাতাম, কিন্তু এই সংখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি হওয়ায় এখন আমরা সরাসরি আইইডিসিআরকে তথ্য দিচ্ছি। তারা সবগুলো পর্যালোচনা করে হয়তো আপনাদের শিগগিরই জানাবে।’

তিনি বলেন, ‘তবে যাদের ডেঙ্গুতে মৃত্যু বলে আমরা প্রাথমিকভাবে অনেকে বলে থাকি, তাদের কারো কারো ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্য জটিলতাই বেশি ছিল। তাই এগুলো পর্যালোচনার দরকার রয়েছে।’

এ ছাড়া সারা দেশের যতগুলো হাসপাতালেই বিভিন্ন সংখ্যায় রোগীর মৃত্যু ঘটেছে, প্রায় সব হাসপাতালেই ভর্তি, চিকিৎসাধীন ও ছাড়পত্র নেওয়া রোগীর সংখ্যার যোগ-বিয়োগ মিলিয়ে দেওয়া হলেও মৃত্যুর সংখ্যার হিসাবেই রয়ে গেছে গরমিল; যার প্রভাবে প্রতিদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সারা দেশের হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে কেবল রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) থেকে নিশ্চিত করা মৃতের সংখ্যার বাইরের সব হিসাব। যথারীতি যেমনটা ঘটেছে গতকালের হিসাবেও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাসপাতালগুলোর কারণে সরকারি মোট হিসাবে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়। প্রতিদিনই সাংবাদিকদের নানা ধরনের প্রশ্নে আটকে যেতে হয় কর্মকর্তাদের। কিন্তু অবস্থা এমন যে ভর্তীকৃত মোট রোগী থেকে বর্তমানে চিকিৎসাধীনদের বাদ দিলে ছাড়পত্র নিয়ে যারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়, মৃতরাও যেন সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছে! এমন কাণ্ডে শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুসারে এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া মোট ৫৯ হাজার ৫৯২ জন রোগী দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ছয় হাজার ১৪৭ জন গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল আর মারা গেছে ৪৭ জন। বাকি থাকে ৫৩ হাজার ৩৯৮ জন। এ হিসাবেও সব যোগ করে মিলিয়ে দেওয়া। কিন্তু ওই কন্ট্রোল রুমের তথ্যেই বলা হয়েছে (আইইডিসিআর) ডেঙ্গুতে ৮০ জনের সম্ভাব্য মৃত্যু পর্যালোচনা করে এ পর্যন্ত ৪৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। ফলে বাকি ৩৩ (৮০-৪৭=৩৩) জনের হিসাব কী হলো এর কোনো হদিস পাওয়া যায় না। সরকারি এই ৩৩ জনের বাইরে বেসরকারি হিসাবে আরো ৬০-৭০ জন মৃতের তথ্য যেন হাওয়া হয়ে গেছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর তালিকা থেকে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডাইরেক্টর (হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা) ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, আসলেই বিষয়টি আশ্চর্যজনক। এটা তো হওয়ার কথা নয়। যোগ-বিয়োগ মেলালেই তো হবে না। হাসপাতালে যাদের মৃত্যু ঘটেছে সেটা তো কেন্দ্রে ছক পূরণ করে পাঠাতেই হবে। কিন্তু কেন এমন হলো তা খতিয়ে দেখা হবে এবং সব হাসপাতালে এ ব্যাপারে চিঠি দেওয়া হবে।

নতুন রোগী ১৬২৫ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী গতকাল সকাল ৮টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৫৯৭ জন, যা আগের দিন ছিল এক হাজার ৬২৫ জন। আর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে এক হাজার ৭২৮ জন। এর মধ্যে গতকাল সকাল ৮টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় নতুন ভর্তি হয়েছে ৭৬১, জন যা আগের দিন ছিল ৭১১ জন এবং ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি হয়েছে ৮৩৬ জন, যা আগের ২৪ ঘণ্টায় ছিল ৯১৫ জন। গতকাল সকালে সারা দেশে নতুন ও পুরনো মিলে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ১৪৭ জন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে তিন হাজার ৩৩২ জন এবং ঢাকার বাইরে দুই হাজার ৮১৫ জন। গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মোট রোগীর সংখ্যা ৫৯ হাজার ৫৯২। এর মধ্যে ছাড়পত্র নেওয়া রোগীর সংখ্যা ৫৩ হাজার ৩৯৮।

কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, গতকাল সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১২২ জন, যা আগের দিন ছিল ১১৫ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ১০২ জন, যা আগের দিন ছিল ৫৫ জন, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৮৮ জন, যা আগের দিনে ছিল ৬৮ জন।

আরো ২ জনের মৃত্যু : এদিকে গতকাল ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরো দুজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু ঘটেছে বলে হাসপাতালগুলো থেকে জানানো হয়েছে গণমাধ্যমকে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গতকাল সকালে গিয়াস নামের এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই রোগীর জ্বর ছিল, তবে মৃত্যু হয়েছে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে।’ এ ছাড়া বুধবার রাতে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মনির হোসেন (৩৪) নামের এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বরিশালে ছয়জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হলো। মনির বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার রুকুনদি এলাকার শাহজাহানের ছেলে।

গতকাল সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করে হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, মুমূর্ষু অবস্থায় মনির হোসেন গত ১৮ আগস্ট হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলেন।

মন্তব্য