kalerkantho

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর দিন আজ

সব কিছু প্রস্তুত, শুধু সম্মতির অপেক্ষা

চীন ও মিয়ানমার দূতাবাসের কর্মকর্তারা কক্সবাজারে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও কক্সবাজার এবং টেকনাফ প্রতিনিধি   

২২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সব কিছু প্রস্তুত, শুধু সম্মতির অপেক্ষা

বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর দিন আজ বৃহস্পতিবার। গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসন শুরুর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার আজ আবারও প্রত্যাবাসন শুরুর দিন ঠিক করেছে। রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে রাজি হলেই কেবল বাংলাদেশ তাদের পাঠাতে চায়। বাংলাদেশ স্পষ্ট বলেছে, কাউকে জোর করে পাঠানো হবে না।

জানা গেছে, প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে পাঠানো তিন হাজার ৪৫০ জনের মধ্যে ১৫টি পরিবারের ৪৭ জনের নাম দুইবার করে আছে। সংশোধিত তালিকা অনুযায়ী এক হাজার ৩৮টি পরিবারের তিন হাজার ৩৯৯ জন রোহিঙ্গার সম্মতি যাচাইয়ের জন্য গত ৮ আগস্ট বাংলাদেশ জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছে। সেই যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর গত দুই দিনে বেশির ভাগই বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। যদিও সরকারি সূত্রগুলো বলছে, তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দেখতে ঢাকায় মিয়ানমার ও চীন দূতাবাসের কর্মকর্তারা কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ভারতও।

তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের অনেকে ফিরতে যেমন অনীহা প্রকাশ করেছে তেমনি অনেকেই ফিরতে আগ্রহী। কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং হিন্দু রোহিঙ্গা শিবিরে ১১০টি পরিবারের ৪২২ জন সদস্য আছে। ওই শিবিরের বাসিন্দা জগদীশ পাল গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এই মুহূর্তেই আমাদের ফেলে আসা দেশের বাড়িঘরে ফিরতে চাই। আমরা প্রস্তুত। এমনকি আমরা রাতে বললে রাতেই চলে যাব।’

জানা গেছে, ওই রোহিঙ্গাদের নাম মিয়ানমারের পাঠানো তালিকায় নেই। গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দিনও তাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মূল শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি না হওয়ায় সেদিন তাদেরও প্রত্যাবাসন উদ্যোগ স্থগিত রাখা হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গাদের অনেকেই ফিরতে চায়। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার বলছে, তারাও পুরোপুরি প্রস্তুত। আমরাও পুরোপুরি প্রস্তুত। মিয়ানমার যখন চায়, আমরা সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেব। যতজনকে চায় আমরা ততজনকে দিয়ে দেব।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রায় ৫০ হাজারের তালিকা দিয়েছি। তারা মাত্র তিন হাজার ৪৫০ জনের নাম পাঠিয়েছে। শুরু করুক। আমরা চাই, একটু তাড়াতাড়ি যাক। কারণ না গেলে তাদের ভবিষ্যৎ খুব সুখের হবে না এবং এই অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হবে। শান্তি ছাড়া আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না।’

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় একাধিক কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ছোট পরিসরে এমনকি আট-দশজনের একটি দলও যদি ফিরে যায় তাহলে তারা অবাক হবেন না। গত নভেম্বর মাসে প্রথম দফা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর বাংলাদেশ চীনকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছে। ভারতও চাইছে, প্রত্যাবাসন শুরু হোক। তা ছাড়া মিয়ানমারের মিন্ট থিয়ো গত মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরের সময় বলেছেন, মিয়ানমার আট হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের বাসিন্দা বলে স্বীকার করেছে। তারা যেকোনো সময় ফিরতে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত নভেম্বর মাসে প্রত্যাবাসন শুরুর প্রস্তুতি সত্ত্বেও কেউ না ফেরায় প্রমাণ হয়েছে মিয়ানমারের ওপর রোহিঙ্গাদের আস্থার ঘাটতি আছে। এবারও বাংলাদেশ তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখতে চায় না। অন্যদিকে মিয়ানমারও প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়টি বিশ্বকে দেখিয়ে চাপমুক্ত হতে চায়।

এদিকে গত মঙ্গলবারের ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবারও আরো ২১৪ পরিবারের রোহিঙ্গা সদস্য অভিন্ন সুরে সুর মিলিয়ে বলেছে, ‘আঁরা এহন ন-যাইয়্যুম।’ অর্থাৎ আমরা মিয়ানমারে এখন ফিরে যাব না। এ নিয়ে গত দুই দিনের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে সাক্ষাৎকারে ২৩৫টি রোহিঙ্গা পরিবার গতকাল পর্যন্ত তাদের দেশে ফিরতে না সূচক জবাব দিয়েছে। আজ বৃহস্পতিবারও রোহিঙ্গাদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার গ্রহণের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। কর্মকর্তারা আশাবাদী, শেষ মুহূর্তে হলেও যদি কারও সুমতি মিলে!

তবে সাক্ষাৎকার পর্বে কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবার স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানালেও পরে এসব পরিবারের লোকদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়টি সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) স্বীকার করতে রাজি হননি। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি পরিবার মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সাক্ষাৎকার পর্ব শেষে প্রত্যাবাসনবিরোধী রোহিঙ্গারা তা জানতে পেরে তাদের হুমকি দেয়। এরপর তারা তাদের সম্মতি প্রত্যাহারের কথা জানায়।

এদিকে আরআরআরসি মোহাম্মদ আবুল কালাম গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে প্রত্যাবাসনের জন্য সব আয়োজন রয়েছে। ঘুনধুম স্থলসীমান্ত দিয়েই প্রত্যাবাসন করা হবে।’

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দিয়েই সীমান্ত পার করে দেওয়া হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক যানবাহন এবং রোহিঙ্গাদের খাবার-দাবারের ব্যবস্থাও রাখা থাকবে।

এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) কর্মকর্তাদের কাছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে অসম্মতির কথা জানানো নিয়ে কক্সবাজার সীমান্ত এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীও ব্যঙ্গাত্মক সুরে রোহিঙ্গাদের ভাষায় বলছে, ‘আঁরা এহন ন-যাইয়্যুম’। তারা অভিযোগ করেছে, এগুলো মহল বিশেষের শেখানো বুলি।

স্থানীয় লেদা বাজারের দোকানি নুরুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এত দিন শুনছি রোহিঙ্গারা দেশে ফিরবে। কিন্তু এখন ফেরার তারিখ নির্ধারণের পরে আকস্মিক কী হলো যে তারা ফিরবে না?’

স্থানীয়দের অনেকে সংঘাতেরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান রাশেদ মোহাম্মদ আলী গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানের কারণে এলাকার লোকজন রোহিঙ্গাদের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে দিন দিন। তাই আমাদের এলাকাবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যাওয়ার কাজটি শুরু করার জন্য।’

মন্তব্য