kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশেষ নজরে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল

► দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে
► পেপারবুক তৈরি হচ্ছে

আশরাফ-উল-আলম ও এম বদি-উজ-জামান   

২১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশেষ নজরে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল

ফাইল ছবি

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ও কারাগারে থাকা আসামির আপিল বিশেষ তদারকির মধ্যে রয়েছে। এই মামলার আপিল শুনানি হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে। এমন আশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, মামলার পেপারবুক তৈরির কাজ চলছে। এটা হাতে পেলেই মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে যাবে।

আজ থেকে ১৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ভূত হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের দুটি মামলায় বিচারিক ট্রাইব্যুনাল রায় দেন গত বছর ১০ অক্টোবর। রায়ে ১৯ জনকে ফাঁসি ও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরো ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে কারাগারে থাকা আসামিরা ওই রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক আপিল করেন। অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামির ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য বিচারিক ট্রাইব্যুনাল হাইকোর্টে নথি পাঠান। এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে বিষয়টি। গত ১৩ জানুয়ারি উভয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।

বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে তা কার্যকর করতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী অনুমোদন লাগে হাইকোর্টের। এটাকেই ‘ডেথ রেফারেন্স’ বলা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাইকোর্টে আসা ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা বাড়ছেই। বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের তিনটি দ্বৈত বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল নিষ্পত্তি করছেন। আগে একটি বেঞ্চ ছিল। তিনটি বেঞ্চে ২০১০ সালের আগের মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য জমা আছে। ক্রমানুযায়ী শুনানি হলে ২১ আগস্ট মামলার শুনানি হতে আরো সাত-আট বছর লাগতে পারে। কিন্তু জনস্বার্থে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই মামলার শুনানি হবে—এমন বক্তব্য রাষ্ট্রপক্ষের। আর এ জন্য যথাযথ উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নেবে রাষ্ট্রপক্ষ। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলা যেভাবে হাইকোর্টে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে, সেভাবেই নিষ্পত্তি হবে গ্রেনেড হত্যা মামলা।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘২১ আগস্টের ঘটনায় করা মামলায় নিম্ন আদালত রায় ঘোষণার পর ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে। আসামিরা আপিল করেছেন। এখন পেপারবুক তৈরির কাজ চলছে। এটা তৈরি হলেই আমরা বিচারকাজ সম্পন্ন করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’

মাহবুবে আলম আরো বলেন, ‘পিলখানা হত্যা মামলায় এ রকম বিশেষ ব্যবস্থায় পেপারবুক তৈরি হয়েছিল। এ মামলাটিতেও আমি সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের গোচরে নেব যাতে পেপারবুকটা তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। তার পরই শুনানি হবে।’

সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার সাইফুর রহমান বলেন, দুইজন মুদ্রাক্ষরিক মামলার নথি টাইপ করছেন, টাইপ করা হয়ে গেলেই পেপারবুক তৈরির কাজ সম্পন্ন করা যাবে।

বিএনপি থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি একটি রাজনৈতিক মামলা। রাজনৈতিক কারণেই নেতাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। এমন মন্তব্যের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া কী—প্রশ্ন করা হলে জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এটা তো স্পষ্ট প্রতীয়মান। এখানে চারদিক থেকে গ্রেনেড হামলা করা হলো। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কেউ ঘটনাস্থলে পর্যন্ত গেল না। তারপর যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন তাঁরাও নির্বিকার, নিশ্চুপ ছিলেন। এ ঘটনার পরপরই মাওলানা তাজউদ্দিনকে দেশ ত্যাগ করতে সুযোগ দেওয়া হলো এবং অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁরাও পালিয়ে যেতে সমর্থ হলেন। স্পষ্টত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলকে তার নেতা-নেত্রীসহ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্যই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে, এটা একটি স্পর্শকাতর মামলা। তাই এই মামলার শুনানির বিষয়টি বিশেষ নজরে রয়েছে।’ তিনি বলেন, তবে এই মামলাটি অনেক বড় মামলা। ২২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আসামির সংখ্যাও অনেক। কাজেই শুনানি শুরু হওয়ার পরও সময় লাগবে। আইনি সুযোগ সবাইকে দেওয়া হবে।

সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, ২১ আগস্টের হামলা জাতির জন্য একটি বড় আঘাত। জঙ্গিগোষ্ঠী এবং তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী মিলে জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর হামলা করেছিল। এই হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। হামলাটি জাতির জন্য কলঙ্কজনক। ধীর্ঘ ১৪ বছর পর ওই ঘটনার বিচার হয়েছে। এখন আপিল শুনানির জন্য এ মামলা অন্য মামলার মতো বছরের পর বছর পড়ে থাকতে পারে না। শুধু ২১ আগস্ট এলেই বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া দায়িত্ব নয়। দায়িত্ব দ্রুত সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত বিচারকাজ নিষ্পত্তি করা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর হলে দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে। অন্যদিকে জঙ্গি কার্যক্রম ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে সন্ত্রাসীরা বিরত থাকবে। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলা যেমনভাবে হাইকোর্টে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে, আশা করা যায় সেভাবেই রাষ্ট্রপক্ষ ২১ আগস্ট হামলার মামলাও নিষ্পত্তি করবে।

পাকিস্তানি নাগরিক আসামি আবদুল মাজেদ ভাটসহ ছয় আসামির পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী আবদুর রশিদ মোল্লা ও মাওলানা আবদুস সালামসহ তিন আসামির আইনজীবী মিয়া মো. ইদি আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের আসামিদের পক্ষে নিয়মিত আপিল করা হয়েছে। অন্য আসামিদের পক্ষেও আপিল করা হয়েছে। আবার কারাগারে থাকা আসামিরা জেল আপিলও করেছেন। ডেথ রেফারেন্সও হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে। হাইকোর্ট আপিলগুলো শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন। পেপারবুক তৈরি শেষ হলে রাষ্ট্রপক্ষ বিশেষ উদ্যোগ নিলে শুনানি হবে।

ঘটনার ১৪ বছর পর গত বছর ১০ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা বা এনএসআইয়ের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম এবং হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের নেতাকর্মীদের ১৯ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন এই রায় দেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের দুই মামলার রায় ঘোষণা করা হয় একই সঙ্গে। হত্যা মামলায় ১৯ জনকে ফাঁসির দণ্ড, ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় ১৯ জনকে ফাঁসি এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই ৩৮ জনকে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের অন্য ধারায় ২০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হুজি নেতা শাহাদত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর হুমায়রা ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে হান্নান সাব্বির, আরিফ হাসান সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, আবু বকর ওরফে হাফেজ ওরফে সেলিম হাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ (ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার), মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরসালিন ওরফে মুরসালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, মো. লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও বাবু ওরফে রাতুল বাবু ওরফে রাতুল (পিন্টুর ভাই)। দুই মামলায়ই এই ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে শেখ হাসিনাসহ অন্যদের হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আবারও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এই মামলায় তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ ১৮ আসামি পলাতক রয়েছেন। তাঁরা আপিল করার সুযোগ পাননি। মোট ৫২ আসামির মধ্যে মুফতি আবদুল হান্নান ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়। বাকি ৩২ আসামি কারাগারে ছিলেন। এঁদের মধ্যে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক আসামি কয়েক দিন আগে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন। কাজেই ৩১ জনের পক্ষে দায়ের করা আপিল ও ১৯ জনের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা