kalerkantho

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা আসছে

শরীফুল আলম সুমন   

২০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা আসছে

প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে সবচেয়ে বেশি স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি হয়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বলাবলি আছে, এখানে প্রার্থী আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। নিয়োগ চূড়ান্ত করতে শুধু নামকাওয়াস্তে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। এমনকি কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাগত যোগ্যতাও কমিয়ে-বাড়িয়ে থাকে। ফলে প্রকৃত মেধাবীদের বেশির ভাগই শিক্ষক হতে পারছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদোন্নয়নে অভিন্ন নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

জানা যায়, ইউজিসি গঠিত ছয় সদস্যের কমিটি এই অভিন্ন নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। এখন শেষ মুহূর্তের ঘষামাজা চলছে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে খসড়া চূড়ান্ত করা হবে।

খসড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরাই শুধু মৌখিক পরীক্ষায় ডাক পাবেন। এন্ট্রি পদ প্রভাষক হতে হলে অনার্স ও মাস্টার্সে সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে কমপক্ষে ৩ দশমিক ৫ পেতে হবে। তবে বিভিন্ন অনুষদ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী প্রার্থীর যোগ্যতায় ভিন্নতা থাকবে।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। তা পাস হলে আমরা সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে এই নীতিমালার মধ্যে আনার চেষ্টা করব।’

বর্তমানে ছোট ও নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হতে হলে একের অধিক প্রকাশনা থাকার নিয়ম রয়েছে। সাধারণত একের অধিক বলতে দুটি প্রকাশনাকে পুঁজি করে স্বল্পতম সময়েই অনেকে অধ্যাপক হয়ে যাচ্ছেন। মাত্র ১১ থেকে ১২ বছরেও অধ্যাপক হওয়ার নজির রয়েছে। অথচ তাঁরা শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত অধ্যাপকের ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হতে ১০ থেকে ১২টি প্রকাশনা এবং ১৫ থেকে ১৬ বছর লেগে যাচ্ছে। নতুন নীতিমালায় পদোন্নতির জন্য অভিন্ন প্রস্তাব রাখা হচ্ছে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, অধ্যাপক হতে হলে কমপক্ষে ১২টি প্রকাশনা থাকতে হবে। পিএইচডি ডিগ্রি থাকলে ১২ বছর, এমফিল ডিগ্রি থাকলে ১৭ বছরে অধ্যাপক হওয়া যাবে। আর উচ্চতর ডিগ্রি না থাকলে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক হতে লাগবে ২১ বছর। এ ছাড়া সহযোগী অধ্যাপক হতে হলে প্রকাশনা থাকতে হবে সাত থেকে আটটি। তবে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের সাত বছর, এমফিল ডিগ্রিধারীদের ৯ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। উচ্চতর ডিগ্রি না থাকলে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর সহকারী অধ্যাপক পদের জন্য কমপক্ষে তিন থেকে চারটি প্রকাশনা থাকতে হবে। পিএইচডি ডিগ্রি থাকলে এক বছর, এমফিল থাকলে দুই বছর এবং কোনো ডিগ্রি না থাকলে তিন বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। 

এ ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেড-৩ থেকে গ্রেড-২-তে উন্নীত হতে হলে অধ্যাপক পদে অন্তত চার বছর চাকরি এবং স্বীকৃত কোনো জার্নালে বিষয়ভিত্তিক দুটি নতুন আর্টিকল প্রকাশের শর্ত রাখা হচ্ছে। আর গ্রেড-২ প্রাপ্ত অধ্যাপকদের মোট চাকরিকাল অন্তত ২০ বছর এবং দ্বিতীয় গ্রেডের সর্বশেষ সীমায় পৌঁছানোর দুই বছর পর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রথম গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে প্রথম গ্রেডপ্রাপ্তদের সংখ্যা মোট অধ্যাপকের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

সূত্র জানায়, খসড়া প্রণয়ন কমিটির ছয়জন সদস্যই ইউজিসির কর্মকর্তা। এর মধ্যে চারজন রয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ এই কমিটি গঠন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, খসড়া প্রণয়ন কমিটিতে বর্তমানে চাকরিরত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নয়তো এই খসড়া গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজার একজন শিক্ষক বিবৃতিও দিয়েছেন।

তবে নাম প্রকাশ না করে কমিটির এক সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খসড়া প্রস্তাব নিয়ে একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় ফেডারেশন ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁদের প্রস্তাবিত খসড়ার কপিও দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সেখানে নতুন নতুন বিষয় যোগ-বিয়োগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মত অনুসারেই এই খসড়া করা হচ্ছে। কিন্তু যাঁরা নিজের পেশায় ঠিকমতো সময় দেন না এবং গবেষণায় আগ্রহী নন তাঁরাই এর বিরোধিতা করছেন। আবার যাঁরা তদবির-অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের পক্ষে তাঁরাও এই নীতিমালায় আগ্রহী নন।’

মন্তব্য