kalerkantho

গুলশানে আক্রান্ত সবাই পুরুষ ধানমণ্ডির ৬১ শতাংশ নারী

২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ১৭০৬

তৌফিক মারুফ   

১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গুলশানে আক্রান্ত সবাই পুরুষ ধানমণ্ডির ৬১ শতাংশ নারী

মশার স্বর্গরাজ্য : রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলা খেলার মাঠে জমে থাকা পানিতে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য মশা। ছবি : শেখ হাসান

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঢাকার কোনো কোনো এলাকাকে ডেঙ্গুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে এখনো ঢাকার সব এলাকায়ই আছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। আর ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও বরিশালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। এর মধ্যে এলাকাভেদে ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে নারী-পুরুষের আধিক্যের বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এডিস মশার বিস্তারের সূচক বিবেচনায়।

গত ১২ আগস্ট থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরীসহ পুরো ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে চট্টগ্রামের অবস্থান, আর এর পরেই রয়েছে বরিশাল। গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৭০৬ জন, যা আগের ২৪ ঘণ্টায় ছিল এক হাজার ৪৬০ জন।

এদিকে ঢাকায় এলাকাভিত্তিক আরেক পর্যবেক্ষণের তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকার গুলশান এলাকায় ১২ আগস্টের পর থেকে যতজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে তাদের সবাই পুরুষ। আবার একই সময়ে ধানমণ্ডি এলাকায় আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৬১.১ শতাংশ নারী এবং ৩৮.৯ শতাংশ পুরুষ, গেণ্ডারিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে ৭১.৪ শতাংশ নারী এবং বাকি ২৮.৬ শতাংশ পুরুষ, সূত্রাপুরে ৩৩.৩ শতাংশ নারী ও ৬৬.৭ শতাংশ পুরুষ, খিলগাঁওয়ে ৪১.৭ শতাংশ নারী, বাকিরা পুরুষ। রাজধানীর শেরেবাংলানগর এলাকায় আক্রান্তদের মধ্যে ৫০ শতাংশ করে সমান সমান নারী-পুরুষ রোগী।

ঢাকা বিভাগে গড়ে ৫৭.১ শতাংশ পুরুষ ও ৪২. ৯ শতাংশ নারী গত ১২ আগস্টের পর থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ঢাকার বাইরে বরিশালে আক্রান্তদের মধ্যে ৬৬.৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৩.৪ শতাংশ নারী, খুলনায় ৪০ শতাংশ নারী এবং ৬০ শতাংশ পুরুষ।

এ বিষয়ে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ডেঙ্গুর গতিবিধি দেখার চেষ্টা করছি। যার মাধ্যমে কোন এলাকায় ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহী এডিস মশার বিস্তার কেমন, সেটা যেমন বোঝা যায়, আবার কোন এলাকায় কী ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তারও এক ধরনের নির্দেশনা পাওয়া যায়।’

অবশ্য ড. ফ্লোরা এর সঙ্গে যুক্ত করে বলেন, একেক এলাকার অবকাঠামোগত চরিত্র-চিত্র একেক রকমের। তাই মশার অস্তিত্বও কিংবা ঘনত্বও একেক রকমের। আবার মানুষের বিচরণের ধরনেও পার্থক্য আছে। এর ওপর ভিত্তি করেই রোগের গতিবিধি প্রভাবিত হয়। ধানমণ্ডি-গুলশান কিংবা উত্তরা-লালবাগের দিকে তাকালেই ব্যবধান বোঝা যায়।

এদিকে গতকাল দেশে নতুন ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির হার আগের দিনের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে; তবে এর সঙ্গে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার হারও আগের দিনের তুলনায় ৮১ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত এক সপ্তাহের চিত্র অনুসারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও তা যে আর বাড়ার আশঙ্কা নেই—এমন কথা আমরা বলতে পারছি না। বরং সবাইকেই আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে।’ গতকাল ঢাকায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা কমেছে ৯ শতাংশ। তিনি বলেন, ‘ঈদের বন্ধের পর এখন স্কুল-কলেজ, অফিস-

আদালত খুলেছে, তাই এসব স্থাপনা থেকে যাতে নতুন করে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হয় আমরা সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে বলেছি।’

২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ১৭০৬ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৭০৬ জন, যা আগের ২৪ ঘণ্টায় ছিল

এক হাজার ৪৬০ জন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে দুই হাজার ৩৯৪ জন, আগের ২৪ ঘণ্টায় যে সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩২৪ জন। এর মধ্যে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় নতুন ভর্তি হয়েছে ৭৩৪ জন, যা আগের দিনে ছিল ৬২১ এবং ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি হয়েছে ৯৭২ জন, যা আগের দিনে ছিল ৮৩৯ জন। গতকাল সকালে সারা দেশে নতুন ও পুরনো মিলে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল সাতা হাজার ১৬৮জন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে তিন হাজার ৬৬৮ জন এবং ঢাকার বাইরে তিন হাজার ৫০০ জন।

গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মোট রোগীর সংখ্যা ৫৩ হাজার ১৮২। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৫ হাজার ৯৭৪ জন। গতকাল সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৯৭ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৯৩ জন, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬১ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫২ জন।

এদিকে আরেক তথ্য অনুসারে, চলতি আগস্ট মাসের ১৭ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৩৪ হাজার ৭২১ জনে উন্নীত হয়েছে, যা গত জুলাই মাসের ৩১ দিনের তুলনায় (১৬ হাজার ২৫৩ জন) দ্বিগুণের বেশি। বাংলাদেশের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের হিসাবে এটাই সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল গত বছর (১০ হাজার ১৪৮ জন)।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতবিনিময়

গতকাল রবিবার সচিবালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে করণীয় বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে মতবিনিময় করেন আওয়ামী লীগের ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা মনিটরিং সেলের নেতৃবৃন্দ। এ সময় ডেঙ্গু রোগের বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়।

সভায় আওয়ামী লীগের ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা, বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া, স্বাচিপ মহাসচিব ডা. এম এ আজিজ, বিপিএসপিএর মহাসচিব ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং

দেশে ডেঙ্গু রোগী মোট কত—এ ব্যাপারে কোনো ধারণা বা তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানতে চাইলে পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত হাসপাতালে যারা ভর্তি হচ্ছে কিংবা যারা আউডডোরে এসে চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের তথ্য পাচ্ছি। কিন্তু যারা বিভিন্ন প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা নিয়ে সাধারণ ডেঙ্গু নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসার আওতায় আছে তাদের কোনো তথ্য পাই না বা নিতেও পারছি না। তবে আশা করি, সামনে হয়তো কোনো টেকনোলজির মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করব। তবে আমরা যেহেতু জানি—যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের অবস্থা বাড়িতে থাকা রোগীদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত খারাপ, তাই আগে তাদের চিকিৎসার দিকেই বেশি নজর রাখছি।’

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারিভাবে প্রদত্ত তথ্য একান্তই ওই সব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বিষয়, ওই তথ্য সামগ্রিকভাবে সরকারি তথ্য বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য হিসাবে পরিগণিত করা যাবে না। ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা শাখার লাইন ডাইরেক্টর ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী বলেন, কোনো হাসপাতালে কেউ মারা গেলে ওই রোগীর সার্টিফিকেট দেওয়ার দায়িত্ব সেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। এ ক্ষেত্রে তারা যদি কাউকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কথা বলে থাকে সেটা তাদের জায়গা থেকে সঠিক থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের ন্যাশনাল প্রটোকল অনুসারে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই আইইডিসিআরের ঘোষণা লাগবে। তারা মৃত্যুর তথ্য যাচাই-বাছাই করে তবেই তা নিশ্চিত বলে ঘোষণা করে। যেমনভাবে ৭০টি মৃত্যুর তথ্যের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুতে ঘটেছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শাখার ডিপিএম ডা. আকতারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের এডিস মশার উৎস নিয়েও কাজ করে যাচ্ছি। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতেও প্রতিদিন নানাভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা