kalerkantho

গাড়িচালক থেকে হঠাৎ ‘বড় নেতা’ হাজি সুমন

লায়েকুজ্জামান    

১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



গাড়িচালক থেকে হঠাৎ ‘বড় নেতা’ হাজি সুমন

‘হাজি সুমন’ নামে পরিচিত, কিন্তু প্রকৃত নাম সুমন আহমেদ। রাজধানীর তুরাগ থানার ফুলবাড়িয়া এলাকার এই ব্যক্তি পাঁচ বছর আগেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মরদেহবাহী গাড়ির চালক হিসেবে চাকরি করতেন। বেতন পেতেন সাকল্যে ১৮ হাজার টাকা। বাড়িতে ছিল মাটির দেয়ালঘেরা টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর। এখন চাকরিতে নেই। হঠাৎ আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ায় ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে বিদ্যুত্গতিতে। দখলদারি, চাঁদাবাজিতে আয়-উন্নতির ধারা বাড়তে থাকায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি বহু কোটি টাকার মালিক। বাড়িতে টিনের ঘরের স্থলে ১০ তলা ভিতের আধুনিক ইমারত নির্মাণের কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গা দখল করে বিপণিবিতান, আবাসন ও বাণিজ্যিক হিসেবে ভাড়া দেওয়া, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, সুদের কারবার এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবসা করে এখন তাঁর দিনে আয় প্রায় সোয়া লাখ টাকা।

পরিবারের অন্যরা বিএনপি করলেও চাকরিতে থাকার সময়ে জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন বাবুলের হাত ধরে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। তাঁর পিতা আবদুল আজিজ ছিলেন হরিরামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সুমন উত্তরার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগ দিতে থাকেন মিটিং-মিছিলে। এর মধ্যে হঠাৎ এলাকাবাসীর চোখে পড়ে তাঁর ছবিযুক্ত একটি রঙিন পোস্টার।  পোস্টারে তাঁর বড় ছবির পাশে পরিচয় লেখা ‘জাতীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ’ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও উত্তরা পূর্ব থানা কমিটির সভাপতি। যদিও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, ওই নামের কোনো সংগঠন আওয়ামী লীগ স্বীকৃত নয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের গত উপনির্বাচনে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে এলাকাবাসীর দোয়া চেয়ে পোস্টারও লাগান সুমন। ওই পোস্টারে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রীর ছবির পাশাপাশি মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান ও উত্তরার ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আফসারউদ্দিন খানের ছবির পাশে তাঁর ছবিও বেশ বড়সড়। এসব পোস্টার শাসক দলের নেতা হিসেবে সুমনের নিজেকে জাহির করার, এলাকায় প্রভাব বিস্তার, আয়-রোজগার বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

সরেজমিনে এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, আবদুল্লাহপুর স্লুইস গেট এলাকায় তুরাগ নদের উত্তরার রানা ভোলা মৌজায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রায় তিন একর জায়গা দখল করে ফল বিক্রির পাইকারি বাজার বসিয়েছেন সুমন। ওপরে টিনের ছাউনি দিয়ে ১৫০টি ঘর। প্রতিটি ঘর ভাড়া দেওয়া হয়েছে দেড় লাখ টাকা জামানত নিয়ে। সেই হিসাবে জামানত বাবদই সুমন হাতিয়ে নিয়েছেন আড়াই কোটি টাকা। প্রতিটি ঘর থেকে দিনে ভাড়া নেওয়া হয় ২০০ টাকা করে। তাতে তাঁর দিনে আয় হয় ৩০ হাজার টাকা।

অবৈধভাবে গড়ে তোলা ওই পাইকারি ফল বিক্রি করার আড়তের একাধিক ভাড়াটিয়া কালের কণ্ঠকে বলেছে, তারা অগ্রিম জামানত হিসেবে এক লাখ ৫০ হাজার করে টাকা দিয়েছে, কিন্তু সুমন কাউকে ঘরের দলিল হস্তান্তর করেননি। পাউবোর জায়গা জেনেও কেন আপনারা অগ্রিম টাকা দিলেন, এ প্রশ্নের জবাবে একজন বলেন,  ‘সুমন বলেছিলেন এটা তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি, এখন দেখছি তিনি সঠিক বলেননি।’

ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, ওই মৌজার স্লুুইস গেট এলাকায় সুমনদের পারিবারিক কোনো সম্পত্তি নেই। পাউবো ১৯৮৯ সালে অধিগ্রহণের আগে দলিলপত্রে ওই জমির সর্বশেষ মালিক ছিলেন খলিলুর রহমান গং। তিনিই অধিগ্রহণের মূল্য গ্রহণ করেন।

পাউবোর সম্পত্তি বিভাগের দপ্তরে রক্ষিত ফাইলে দেখা যায়, সুমন জায়গাটি লিজ পাওয়ার জন্য তাদের কাছে একটি আবেদন করেছেন। এ বিষয়ে বোর্ড এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। পাউবো খতিয়ে দেখছে, জায়গাটি তাদের না বিআইডাব্লিউটিএর। এ বিষয়ে বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক (উচ্ছেদ অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত) আরিফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, নদীর তীর থেকে ওপরের জায়গা পাউবোর, অন্যদিকে তীর থেকে নদ পর্যন্ত বিআইডাব্লিউটিএর জায়গা। সে হিসেবে আবদুল্লাহপুর বেড়িবাঁধের বাইরের জায়গা বিআইডাব্লিউটিএর।

আবদুল্লাহপুর স্লুইস গেটে অবৈধভাবে নির্মিত বাজারগুলো কেন উচ্ছেদ হয় না জানতে চাইলে আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা উচ্ছেদ করেছি। ওগুলো অস্থায়ীভাবে নির্মিত, কোনো পাকা ইমারত নয়। আমরা উচ্ছেদ করে আসার পর ওরা দ্রুত আবার টিনের ঘর নির্মাণ করে বাজার বসায়।’

এ ছাড়া আবদুল্লাহপুর স্লুইস গেট এলাকায় সাফা টাওয়ারের পাশে পাউবোর প্রায় ১০ কাঠা জায়গা দখল করে সুমন ৩০টি ঘর তৈরি করেছেন। প্রতিটি ঘর তিন হাজার টাকা করে ভাড়া দিয়েছেন। এখান থেকে তাঁর মাসিক আয় ৯০ হাজার টাকা। ওসব ঘরে অবৈধভাবে পানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগও দেওয়া হয়েছে শাসক দলের নেতার প্রভাব খাটিয়ে। এ ছাড়া হোটেল সি-শেলের পাশে বাঁধের ঢাল দখল করে চারটি মোটরগাড়ি মেরামতের গ্যারেজ ভাড়া দিয়েছেন তিনি। গ্যারেজ মালিকরা জানিয়েছে, তাদের কাছে অগ্রিম জামানত হিসেবে সুমন আহমেদ নিয়েছেন ১০ লাখ টাকা করে। সুমন প্রতিটি গ্যারেজ থেকে মাসের ভাড়া নেন ৪০ হাজার টাকা করে।

ওই দখলবাজির বিষয়ে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখলদারদের চিহ্নিত করেছি। অচিরেই নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।’

সুমন অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগেরও ব্যবসা করেন। স্লুইস গেট এলাকায় ৩৫০টি দোকানে তিনি বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ২৫০টি দোকানে প্রতিদিন একটি করে বাল্ব জ্বালানো বাবদ সুমন নেন ১০০ টাকা করে। সে হিসাবে দিনে আয় ২৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে তাঁর নিজের গড়ে তোলা ফলের বাজারের ১৫০টি ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ বাবদ মাসে নেন ৩০০ টাকা করে। সে হিসাবে মাসে তাঁর আয় ৪৫ হাজার টাকা। একটি আবাসিক মিটার থেকে তিনি দোকানে দোকানে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ব্যবসা করেন।

সরকারি সম্পত্তিতে অবৈধভাবে নির্মিত আবাসস্থলে কিভাবে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই দেওয়া সম্ভব নয়, আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি; সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে এবং যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পাউবোর জায়গায় কিভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হলো? জবাবে ডেসকো উত্তরা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারো বাণিজ্যিক মিটার থাকলে একটি মিটার থেকে অনেক ঘরে সংযোগ দেওয়ার বিধান আছে। তবে আবাসিক মিটার হলে হবে না। এখন আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব সুমন আহমেদ যে সংযোগ দিয়েছেন তা চোরাইভাবে দেওয়া কি না। এ ছাড়া যদি কোনো মিটার থেকে সংযোগ দেওয়া হয় তাহলে সে মিটার বাণিজ্যিক না আবাসিক, তা-ও দেখা হবে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

গায়ে শ্রমিক নেতার তকমা লাগিয়ে পরিবহন থেকেও চাঁদাবাজি করেন সুমন। আবদুল্লাহপুর স্লুইস গেট ও আবদুল্লাহপুর মোড় থেকে প্রতিদিন এক হাজার ৫০০ বাস রাজধানীতে চলাচল করে। প্রতিটি বাস থেকে সুমনের নামে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হয় ২০ টাকা করে। এতে তাঁর দিনে আয় ৩০ হাজার টাকা। প্রজাপতি, আসমানীসহ একাধিক বাস কম্পানির চালক ও সহযোগীরা কালের কণ্ঠকে বলেছে, এই রুটে বাস চালাতে হলে সুমন আহমেদকে চাঁদা না দিয়ে উপায় নেই। না দিলে বাস চালানো যাবে না।

এক লাখ টাকা সুদে লাগিয়ে প্রতি তিন মাসে তিনি গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করেন ২৫ হাজার টাকা। একাধিক দোকানি কালের কণ্ঠকে বলেছে, ‘ব্যবসার প্রয়োজনে অনেক সময় নগদ টাকার দরকার হয়। সুমন আহমেদের চেয়ে অন্য কেউ কম সুদে টাকা দিতে চাইলেও আমরা নিতে পারি না। তাহলে সুমন তার লাঠিয়াল বাহিনী পাঠিয়ে দেয়।’ সূত্র জানায়, সুমন প্রায় ১০ কোটি টাকার ওপরে সুদে লাগিয়েছেন। এ খাত থেকে তাঁর মাসে আয় কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা।

সুমন আহমেদ বর্তমানে হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। তাঁর মোবাইল ফোনে কল করা হলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘ফলের পাইকারি বাজারের জায়গা আমার পারিবারিক সম্পত্তি।’ যদিও পাউবোতে যোগাযোগ করে জানা যায়, সুমন আহমেদ ওই জায়গা লিজ পাওয়ার জন্য কয়েক মাস আগে তাদের কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। তিনি পাউবোর জায়গায় ঘর তুলে ভাড়া আদায় করার অভিযোগ অস্বীকার করেন। সরকারি সম্পত্তি দখল করে গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে সুমন বলেন, ‘এসব আমি জানি না।’ পরিবহনে চাঁদাবাজির বিষয়ে বলেন, ‘আমি শ্রমিক রাজনীতি করি। চাঁদা তোলা হয় শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য। আমি চাঁদার টাকা নিই না।’ আপনি ১০ তলা বাড়ি করার টাকা কিভাবে আয় করলেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি নয়, ব্যবসা করে টাকা উপার্জন করেছি।’

আপনি তো আগে জাতীয় পার্টি তারপর বিএনপি করতেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন আহমেদ রাগত স্বরে বলেন, ‘আপনি করতে পারেন, আমি না। আমার পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগ করে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা