kalerkantho

দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায় মিলছে ডেঙ্গু ভাইরাস

► আরো পাঁচজনের মৃত্যু
► ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ১৪৬০ হমোবাইল অ্যাপ ‘স্টপ ডেঙ্গু’ চালু

তৌফিক মারুফ   

১৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



 দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায় মিলছে ডেঙ্গু ভাইরাস

হাসপাতালমুখো ডেঙ্গু রোগীর ঢল যেন থামছেই না। গতকাল মুগদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি শিশু রাফিকে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের উৎকণ্ঠা। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রথম দফা পরীক্ষা করে রক্তে ডেঙ্গুর অস্তিত্ব পাওয়া না গেলেও দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায় অনেকের শরীরে মিলছে এডিস মশাবাহী ভাইরাসের খোঁজ। আর তাতেই ছড়িয়ে পড়ছে নতুন করে ভয়। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আরো এক হাজার ৪৬০ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ঢাকা ও ফরিদপুরে গতকাল শনিবার মারা গেছে আরো পাঁচ ডেঙ্গু রোগী।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সেই তথ্য নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লুকোচুরি করছিল বলে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল। এমনকি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তেমন অনেক তথ্যই নিশ্চিত করেনি, যা নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন মহলে চলছিল সমালোচনা। কয়েক দিন ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে শুধু ৪০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত  করেছিল। তবে গতকালই প্রথম ওই অধিদপ্তর আরো ৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানিয়েছে।    

এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে সরকার গতকাল ‘স্টপ ডেঙ্গু’ নামের একটি বিশেষায়িত মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে।

দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় ধরা পড়ছে ডেঙ্গু : ‘প্রথমে জ্বরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন পর পর দুইবার এনএস-১ পরীক্ষা করিয়েছি; কিন্তু তাতে ডেঙ্গু ধরা পড়েনি। জ্বরও কমে গিয়েছিল। তাই নিশ্চিন্ত মনেই বাড়িতে ছিলাম। কিন্তু শরীরের দুর্বলতা কমছিল না। ফলে ছয় দিন পর আবার পরীক্ষা করতেই ডেঙ্গু ধরা পড়ে।’ গতকাল রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে এক রোগীর স্বজন কামরুল ইসলাম এভাবেই বিড়ম্বনার কথা জানান।

একই হাসপাতালের আরেক রোগীর ভাই নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বোনটার প্রথম দিন জ্বর হওয়ার পরই পরীক্ষা করিয়েছি। তখন ডেঙ্গু নেগেটিভ আসছে, সিবিসিতে প্লাটিলেট কাউন্টিংও দুই লাখের ওপরে ছিল। আমরা তো নিশ্চিন্তে ঈদ করতে বাড়ি গেছি। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার পরই বোন অসুস্থ হয়ে পড়ে। ঈদের পরে ঢাকায় এসে আইজিজি-আইজিএম করিয়ে দেখা যায় তার ডেঙ্গু আছে।’

শুধু এই দুজন নয়, ডেঙ্গু পরীক্ষার এনএস-১ নেগেটিভ হলে অনেকেই খুশি মনে বাড়ি ফিরছে ডেঙ্গু হয়নি বলে। কিন্তু প্রথম দফায় এনএস-১  নেগেটিভ হলেও পাঁচ-ছয় দিন পর আইজিজি-আইজিএম করে ডেঙ্গু ধরা পড়ছে বড় একটি অংশের। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত ১৬ দিনের এনএস-১, আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছয় হাজার ৮৮৩ জনের এনএস-১ পরীক্ষায় পজিটিভ হয়েছে ১৯.৬৭ শতাংশের (১৩৫৪ জনের)। দুই হাজার ৮৭২ জনের আইজিজি পরীক্ষা করে পজিটিভ হয়েছে ২৪.৪৪ শতাংশের (৭০২ জনের) এবং সমানসংখ্যকের আইজিএম পরীক্ষায় পজিটিভ এসেছে ৯.০৫ শতাংশ বা ২৬০ জনের।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, জ্বরের তিন-চার দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু থাকলে তা পজিটিভ আসবে। কিন্তু এরপর এনএস-১ পরীক্ষায় কোনো লাভ হয় না। এরপর জ্বরের পাঁচ-ছয় দিন পর আইজিজি-আইজিএম করলে তা পজিটিভ এলে বুঝতে হয় ওই রোগীর দেহে ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছে। এর মধ্যে আইজিজি পজিটিভ হলে বুঝতে হবে রোগী আগেও আরেক দফা ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মামুন মোর্শেদ বলেন, ‘আমাদের এখানে দ্বিতীয় দফায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং শনাক্ত হওয়া রোগী প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে আইজিজি পরীক্ষায় পজিটিভের হার সর্বোচ্চ ২৪.৪৪ শতাংশ, যা বেশি উদ্বেগের বিষয়।’

আরো পাঁচজনের মৃত্যু : ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কলেজছাত্র সুমন বাশার রাজুর (২২) মৃত্যু হয়েছে। তিনি মাগুরার চাঁদপুর গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে। সুমন মাগুরা থেকে ডেঙ্গু নিয়ে গত সোমবার ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল সকাল পৌনে ১০টার দিকে তিনি মারা যান। একই হাসপাতালে গতকাল সন্ধ্যায় ইউনুস শেখ (৫৫) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। তাঁর বাড়ি রাজবাড়ীর সুলতানপুর গ্রামে। তিনি গত সোমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল ভোরে রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালে মারা গেছেন গৃহবধূ লিপি রানী দাস (২২)। লিপি রানী পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার রতনদীতালতলী ইউনিয়নের নিমহাওলা গ্রামের বিমল চন্দ্র দাসের স্ত্রী।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল রাতে সিরাজগঞ্জের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন কলেজ ছাত্র মেহেদী হাসান (১৮)। তিনি কামারখন্দের হালুয়াকান্দি গ্রামের আমিরুল ইসলামের ছেলে।

এ ছাড়া গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মনোয়ারা বেগম (৪৫) নামের এক ডেঙ্গু রোগী মারা গেছেন। মনোয়ারা কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার সাইফুল ইসলামের স্ত্রী। সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কিছুদিন ধরেই জ্বরে ভুগছিল মনোয়ারা। স্থানীয় ভাগলপুর হাসপাতালে তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার সময় অবস্থার অবনতি হলে গত মঙ্গলবার তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আইসিইউতেও নেওয়া হয়েছিল।’

৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা চলছে : আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘আমাদের কাছে এ পর্যন্ত ৭০ জনের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনার জন্য এসেছে। এর মধ্যে আমরা সব প্রটোকল মেনে ৪০ জনের মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু ছিল বলে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পেরেছি। বাকিদের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ফল পাওয়া যায়নি। যাচাই-বাছাইয়ের সময়ে অনেক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করতে হয়, মৃতদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও তথ্য-উপাত্ত নিতে হয়। ফলে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে সময় লেগে যায়। তাই এটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ১৪৬০ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, গতকাল সকাল ৮টা থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৪৬০ জন, যা আগের ২৪ ঘণ্টায় ছিল এক হাজার ৭১৯ জন (১৫ শতাংশ কম) এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে এক হাজার ৩২৪ জন, আগের ২৪ ঘণ্টায় যে সংখ্যা ছিল এক হাজার ৫৭৩। এর মধ্যে গতকাল সকাল ৮টা থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় নতুন ভর্তি হয়েছে ৬২১ জন, যা আগের দিন ছিল ৭৫৯ (১৮ শতাংশ কম) এবং ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি হয়েছে ৮৩৯ জন, যা আগের দিনে ছিল ৯৬০ জন (১৩ শতাংশ কম)। গতকাল সকালে সারা দেশে নতুন ও পুরনো মিলিয়ে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল সাত হাজার ৮৫৬। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে চার হাজার ৪৩ জন এবং ঢাকার বাইরে  তিন হাজার ৮১৩ জন। গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মোট রোগীর সংখ্যা ৫১ হাজার ৪৭৬। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৩ হাজার ৫৮০ জন।

এদিকে ওই তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বন্ধের দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও তুলনামূলক কমে প্রায় সব হাসপাতালে। ঢাকায় এই সংখ্যা কমে অনেক বেশি, যদিও ঢাকায় কয়েক দিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে কমছে ভর্তির সংখ্যা।

চালু হলো সরকারের ‘স্টপ ডেঙ্গু’ : ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে গতকাল সরকারের পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং আরো চারটি সংস্থার সমন্বয়ে ই-ক্যাবের সহায়তায় ‘স্টপ ডেঙ্গু’ নামের একটি বিশেষায়িত মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে যে কেউ সারা দেশের যেকোনো স্থানে মশার প্রজনন স্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে পারবে, যা মশার প্রজনন স্থানের ম্যাপিং তৈরিতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে সিঙ্গাপুর থেকে আগত বিশেষজ্ঞ ডা. তৌফিকুল ইসলাম ও দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে এক মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়।

মন্তব্য