kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

গরিবের হকে সিন্ডিকেটের থাবা

ফারজানা লাবনী ও শাখাওয়াত হোসাইন   

১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



গরিবের হকে সিন্ডিকেটের থাবা

বিক্রি করতে না পেরে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে কোরবানির পশুর ৯০০ চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এবার কাঁচা চামড়ার দাম একেবারে ছিল না বললেই চলে। এই দাম কমার পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রভাবশালী সংঘবদ্ধ চক্রের কারণে এবার ‘গরিবের হক’ কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে বড় ধস নেমেছে। বাড়তি মুনাফার লোভে ট্যানারির মালিকদের বেশির ভাগই সিন্ডিকেট করে কোরবানির পশুর চামড়া কিনছে না। অল্প যা বিক্রি হয়েছে তা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে অনেক কমে, নামমাত্র মূল্যে। এতে চামড়া সংগ্রহকারীরা বিপাকে পড়েছে। চামড়া পচে যাচ্ছে। দুর্গন্ধে নিরুপায় হয়ে অনেকে সংগৃহীত চামড়া রাস্তায় বা নদীতে ফেলে দিচ্ছে। মাটির নিচেও পুঁতে ফেলছে অনেকে।

ঈদের পরের দিন মঙ্গলবার থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার জালকুড়ির ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশের রাস্তায় কয়েক হাজার কোরবানি পশুর চামড়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় ফেলে রাখা অন্তত ২০ ট্রাক চামড়া ডাম্পিং স্পটে পুঁতে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় আরো অন্তত ২৫০টি পশুর চামড়া নদীতে ফেলে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর হাফিজিয়া হোসেনিয়া দারুল হাদিস কর্তৃপক্ষ পুঁতে ফেলেছে নষ্ট হয়ে যাওয়া ৯০০ চামড়া। কোথাও মাত্র ৫০ টাকায় গরুর চামড়া বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। আবার ন্যয্যদামে চামড়া কিনে আড়তদারদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জেলার মৌসুমী ব্যসায়ীরা।

ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোরবানির পশুর যে চামড়া দুই-আড়াই হাজার টাকা বিক্রি হতো, এবার তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। ক্রেতার ঘাটতি থাকায় দাম নির্ধারণ ছাড়াই ট্যানারি মালিক এবং ব্যবসায়ীদের কাছে চামড়া দিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে রাজধানীর মসজিদ ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। কোরবানির চামড়ার এ দশা নিয়ে নগরবাসী, জনপ্রতিনিধি, মৌসুমী ব্যবসায়ী এবং মসজিদ-মাদরাসার নেতাদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ। চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। নামমাত্র দরে চামড়া বিক্রির চেয়ে তা ফেলা দেওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছেন তাঁরা।

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় আড়াই লাখের মতো পশু কোরবানি করা হয়েছে গত সোমবার। এছাড়া মঙ্গল ও বুধবার আরো ৩০ হাজারের মতো কোরবানি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় দুই লাখের মতো পশু কোরবানি করা হয়েছে ঈদের দিন। এরপর দুই দিনে আরো ৫০ হাজারের মতো পশু কোরবানি দেওয়া হয়েছে। তিন বছর আগেও পাঁচ লাখ পশুর চামড়া গড়ে দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি করে ১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাওয়া যেতো। এই অর্থ মসজিদ, মাদরাসা, এতিম ও গরিব মানুষদের দান করা হতো। কিন্তু মৌসুমী ব্যবসায়ীরা এবার রাজধানীতে চামড়াপ্রতি গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি দিতে রাজি হয়নি। ছাগলের চামড়া ১০ টাকার বেশিতে নিতে চাননি। রাজধানীর কোন কোন এলাকায় মৌসুমী ক্রেতাদের না পাওয়ায় দামদর ঠিক না করেই চামড়া আড়তদারদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে চামড়া বিক্রি বাবদ কত টাকা আসবে সে ব্যাপারে কিছুই জানেন না বিক্রেতারা।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নুরজাহার রোডের বাসিন্দা শাহাদাৎ হোসেন টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতি বছর এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে এলাকার মসজিদ ও মাদরাসায় দিতাম। কিন্তু এবার গরুর চামড়ার দাম গড়ে ২০০ টাকা বলছে। পানির দামে চামড়া বিক্রি করার চেয়ে ফেলে দেওয়া অনেক ভালো। এক লাখ টাকা খরচ করে যিনি কোরবানি দিতে পারবেন, তিনি এতিম ও গরিবদের জন্য তিন হাজার টাকাও দিতে পারবেন। তবে এবারের পরিস্থিতির জন্য সিন্ডিকেটবাজ ব্যবসায়ীদের শায়েস্তা করা উচিত।’

সাঈদনগরের জামিয়া সাঈদিয়া কারিমিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ফজলে বারী মাসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বছর ৫৪০টি গরুর চামড়া মাদরাসায় দান করেছেন এলাকাবাসী। আমি নিজে আগে যে মানের চামড়া তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেছি এখন তা ৩০০ টাকা দাম বলেছে ব্যসায়ীরা। নিরূপায় হয়ে দামদর না করেই সব চামড়া একজন ব্যবসায়ীকে দিয়েছি। তিনি কত টাকা দেবেন জানি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘মাদরাসার উন্নয়ন ও ছাত্রদের খাবারের একটা অংশ কোরবানির পশুর চামড়া থেকে সংগ্রহ করতাম। এখন অবশ্যই একটা সমস্যায় পড়বো আমরা। তবে সব কিছুর মালিক আল্লাহ। তাঁর উপর ভরসা আমাদের।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফারুক আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও ৪০-৫০ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চামড়া দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। কিন্তু এবার এক লাখ টাকার গরুর চামড়া ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। এর ফলে মূলত গরিব মানুষরা বঞ্চিত হয়েছে।’

ব্যবসায়ীদের কারসাজি: এদিকে চামড়ার বাজারে ধস নামার পিছনে ব্যবসায়ীদের কারসাজি আছে বলে অভিযোগ করেছেন খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। গত বুধবার রংপুর নগরীর শালবন এলাকায় তার বাসভবনে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন। চামড়ার এ দশা হওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঈদের পর দিনই জরুরি বৈঠক করে কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেয় যাতে কোরবানির চামড়া সংগ্রহকারীরা নায্যমূল্য পান। কিন্ত তাতে আপত্তি তুলেছেন ট্যানারি মালিকরা। গতকাল বুধবার জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবী জানিয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশন। একই সাথে আগামী শনিবার থেকে কাঁচা চামড়া কেনার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

তবে সরকারের কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্তেও চামড়ার বাজারের এই ধস ঠেকানো যাবে না বলেই সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা । তাঁরা বলছেন, কমপক্ষে ঈদের দুই সপ্তাহ আগেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। আবার এই পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি’র অভিযোগ, কাঁচা চামড়ার দাম নামিয়ে দিয়ে ‘পাশের দেশে পাচার’ করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আর এর পেছনে রয়েছে ‘ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার সিন্ডিকেট’।

গতকাল বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদক ও সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম কমার পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশিও বলেন, ‘ঈদের আগে ট্যানারি মালিক ও চামড়া ব্যবসায়ীদের নিয়ে সভা করে আমরা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা লক্ষ্য করলাম ঈদের দিন কোরবানির পশুর চামড়ার এমন কমে আসলো যা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। যখনই আমরা ভালো কিছু করার চেষ্টা করি, কথনই কিছু ব্যবসায়ী পরিকল্পিতভাবে তার সুযোগ নেয়।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের নিজস্ব ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেন্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রতি বছরই এ সিন্ডিকেট কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এ কারসাজি করে। তার পরেও সরকার আগে থেকে কেন সর্তক হয় না।’

পোস্তার কাঁচা চামড়ার আড়তদার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে লাভের আশ্বাস পেয়েই আমরা কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করি। এবারে আমরা কোন ধরনের আশ্বাস পাইনি। এমন পরিস্থিতিতে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করলে আমাদের লোকসান হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া অনেক টাকা বকেয়া আছে। ট্যানারির মালিকরা আমাদের টাকা না দিয়ে সরাসরি নিজেদের মানুষ দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করছে। এসব কারণে বাজারে এমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’

বিটিএ শনিবার থেকে কাঁচা চামড়া কিনবে: গতকাল সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের (বিটিএ) নিজস্ব কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সংগঠনের সভাপতি শাহীন আহমেদ কাঁচা চামঁড়া রফতানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান। এ সময়ে তিনি বলেন, ‘আগামী ২০ আগস্ট থেকে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করবেন।” শাহিন আহমেদ এরপর বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০ আগষ্ট থেকে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত কিছুক্ষণ আগে পরিবর্তন করেছি। বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠক হল এতক্ষণ। আমরা আগামী শনিবার ১৭ আগষ্ট থেকে কাঁচাচামড়া কিনব।”

রপ্তানির সুযোগে এখনই সুফল মিলবে না: রপ্তানির জন্য ব্যাংকে এলসি খোলা থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়ে প্রস্তুত নিতে হলে সর্ব নিম্ন সাত থেকে দশ দিন প্রয়োজন হয়। ঈদের পরদিন মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জরুরি সভা করে কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমোদন দেয়া হয়। গত সোমবার ঈদের দিন থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ শুরু হয়েছে। সংগ্রহকারীদের কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের প্রস্ততি থাকে না। তারা কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে দেন। রপ্তানি করতে হলে কাঁচা চামড়া নূন্যতম ১৫ দিন সংরক্ষণ করতে হবে। এ প্রস্তুতি না থাকায় সংগ্রহকারীরা সরকারের দেওয়া রপ্তানির আদেশের সুবিধা নিতে পারবে না।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এদেশের চামড়া সংগ্রহকারীদের চামড়া সংরক্ষণের কোন প্রস্তুতি নেই। তারা কিনে দ্রুত ছেড়ে দেয়। তাই চামড়া জমিয়ে রেখে রপ্তানি করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’

পাচারের আশংকা: এদিকে কোরবানির পশুর চামড়া কেনা বেচা নিয়ে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের এ সুযোগ প্রতিবেশি দেশ ভারতে চামড়া পাচার হয়ে যেতে পারে আশংকা করছেন চামড়া খাতের সংশ্লিষ্টরা। শূল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোরবানির ঈদের আগেই সীমান্ত এলাকায় চামড়া পাচারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গোপন গোয়েন্দা সূত্রে আমরা জেনেছি, ভারতের বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু জবাই নিষিদ্ধ করেছে। এতে ভারতে প্রায় তিন হাজার ট্যানারিতে চামড়ার সংকট হয়েছে। এসব ব্যবসায়ীদের অনেকে সীমান্ত এলাকায় আগে নিজস্ব প্রতিনিধি পাঠিয়ে চামড়া পাচারের ব্যবস্থা করে রেখেছে। দেশের ব্যবসায়ীরা চামড়া না কেনার সুযোগ তারা দাম কিছুটা বাড়িয়ে পাচার করে নিয়ে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

মন্তব্য