kalerkantho

হাইকোর্টেও জামিন মিলল না মিন্নির

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাইকোর্টেও জামিন মিলল না মিন্নির

বরগুনায় প্রকাশ্যে  শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলার প্রধান সাক্ষী ও তাঁর স্ত্রী কারাবন্দি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে জামিন দেননি হাইকোর্ট। এ কারণে মিন্নির জামিনের আবেদন ফিরিয়ে নিয়েছেন তাঁর আইনজীবী।

বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি মো. মোস্তাফুিজর রহমানের অবকাশকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার মিন্নির জামিনের আবেদন ফেরত দেন। ফলে হাইকোর্টের অন্য কোনো বেঞ্চে জামিন আবেদন শুনানির জন্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকছে।

গত ৩০ জুলাই বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত মিন্নির জামিনের আবেদন খারিজ করায় সেই আদেশের পর হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হয়েছিল।

আদালত থেকে বেরিয়ে মিন্নির পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না সাংবাদিকদের বলেন, আবার জামিনের চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, ১৬৪ ধারায় দেওয়া মিন্নির জবানবন্দি চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হবে। জবানবন্দি না পেলে আদালতের আশ্রয় নেওয়া হবে।

মিন্নির জামিন চেয়ে গতকাল শুনানিতে জেড আই খান পান্না বলেন, ২৬ জুন হত্যাকাণ্ড ঘটে। এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) হয় ২৭ জুন। আর ১৬ জুলাই মিন্নিকে ডেকে নেওয়া হলো পুলিশ লাইনে। সেদিনই তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পরদিন ১৭ জুলাই আদালতে তুলে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ১৬৪ ধারায় মিন্নির জবানবন্দি নেওয়ার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁকে কারাগারে নেওয়ার সময় পুলিশ তাঁর মুখ চেপে ধরে বলে পত্রপত্রিকায় এসেছে। কারাফটক থাকতে একটি ১৯ বছরের মেয়েকে পুলিশ লাইনে নিয়ে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে? এটা সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার লঙ্ঘন। মিন্নির কাছ থেকে জোর করে অবৈধভাবে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। আদালতে তাঁর পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াতে পারেননি। এ জন্য কোর্টও কোনো পদক্ষেপ নেননি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা আছে, আসামির সহযোগিতার জন্য আইনজীবী লাগবে। তিনি আরো বলেন, এজাহারভুক্ত চার মূল আসামি ধরার ক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই।

এ সময় কালের কণ্ঠসহ দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জেড আইন খান পান্না বলেন, ‘আমরা একজন নারী হিসেবে জামিন চাচ্ছি।’

তখন মিন্নি পক্ষের আরেক আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, ‘টিভি, পত্রপত্রিকায় হত্যাকাণ্ডের চিত্র এসেছে। এর পেছনে আবার ষড়যন্ত্র কিসের? একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীকেই আসামি করা হয়েছে। এই মামলাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে এবং কিছু লোককে বাঁচাতে মিন্নিকে আসামি করা হয়েছে।’

এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজউদ্দিন ফকির দাঁড়ালে আদালত বলেন, ‘১৮ দিন পরে এক নম্বর সাক্ষীকে আসামি কেন করলেন?’ জবাবে মমতাজউদ্দিন ফকির বলেন, ‘ঘটনার অন্তরালে অনেক ঘটনা রয়েছে।’ আদালত বলেন, ‘তার (মিন্নি) বিরুদ্ধে কিছু কি আছে?’

মমতাজউদ্দিন ফকির বলেন, ‘১৫ জনের জবানবন্দি আছে। এর মধ্যে চারজন মিন্নির নাম বলেছে। এ ছাড়া নয়ন বন্ডের (প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন) সঙ্গে মিন্নির আগে বিয়ে হয়েছিল।’ এ সময় তিনি কাবিননামা দাখিল করেন এবং বলেন, রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ের পরও গোপনে নয়ন বন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন মিন্নি।

আদালত বলেন, ‘এটা কার কথা? পুলিশের ফরোয়ার্ডিং?’

মমতাজউদ্দিন ফকির বলেন, ‘জি। এ ছাড়া ফোন কল রেকর্ড আছে। সিডি আছে।’ তিনি বলেন, ‘নিম্ন আদালত চারটি যুক্তিতে তাঁর (মিন্নি) জামিনের আবেদন খারিজ করেছেন। এগুলো হলো মামলার সিডি (কেস ডকেট, যেখানে ঘটনার আগে-পরে মিন্নির সঙ্গে নয়ন বন্ডের কথোপকথন), ভিডিও ফুটেজ (ভাইরাল হওয়া হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ), কাবিননামা (নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির বিয়ে) ও ১৬৪ ধারার জবানবন্দি (মিন্নি ও অন্য আসামির)।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘আইনে (৪৯৭ ধারা) জামিনের ক্ষেত্রে নারীরা সুবিধা পাবেন বলে বলা আছে।’

মমতাজউদ্দিন ফকির বলেন, ‘মামলা তদন্তাধীন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নেই এখানে।’

মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, ‘উনারা (রাষ্ট্রপক্ষ) পুলিশের কথা বলেছেন। আমরা জনগণের কথা বলছি।’ এ সময় পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন আদালতে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি মানুষের সহানুভূতি মিন্নির পক্ষে।’

তখন আদালত বলেন, ‘নারী—এই বিবেচনায় জামিন পেতে পারেন। তবে সে জন্য ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি লাগবে। সেটা আছে কি?’

জেড আই খান পান্না বলেন, ‘না। পুলিশ দেয়নি। অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়া পর্যন্ত ওটা দেবে না।’

আদালত বলেন, ‘১৬৪ ধারা জবানবন্দি না দেখে (পর্যালোচনা না করে) কিছু দেওয়া যাবে না।’

জেড আই খান পান্না বলেন, ‘আমি (মিন্নি) পালিয়ে যাব না।’

আদালত বলেন, ‘আমরা রুল (কেন জামিন দেওয়া হবে না মর্মে) দিই। এর মধ্যে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি নিয়ে আসুন। এরপর জামিনের আবেদনের ওপর শুনব।’ জবাবে জেড আই খান পান্না বলেন, ‘সে তো নারী। এই যুক্তিতেই জামিন হতে পারে।’ তখন আদালত বলেন, ‘১৬৪ ধারায় জবানবন্দি লাগবে। অন্যথায় আবেদন ফেরত নিতে পারেন।’ এরপর জেড আই খান পান্না জামিনের আবেদন ফেরত নেন।

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে স্ত্রীর সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। ডিভিওতে দেখা যায়, মিন্নি তাঁর স্বামীকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

রিফাত খুনের ঘটনায় তাঁর বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। এরপর ২ জুলাই মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। গত ১৩ জুলাই রিফাতের বাবা সংবাদ সম্মেলন করে ছেলের হত্যাকাণ্ডের জন্য পুত্রবধূকে দায়ী করে তাঁর গ্রেপ্তার দাবি করেন। এরপর ১৬ জুলাই সকালে মিন্নিকে পুলিশ লাইনে ডেকে নিয়ে টানা ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই দিন রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই গত ১৯ জুলাই আদালতে নিয়ে মিন্নির কাছ থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়। ওই দিন মিন্নির বাবা আদালত প্রাঙ্গণে চিৎকার করে বলেন, ‘সবই শম্ভু বাবুর (স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু) খেলা। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতেই মিন্নিকে ফাঁসানো হচ্ছে।’

মিন্নির আইনজীবীরা গত ২১ জুলাই ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেন। মিন্নিকে ওই দিন আদালতে হাজির করার আবেদন করা হলে সে আবেদনও খারিজ করে দেন আদালত। এরপর ৩০ জুলাই বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত মিন্নির জামিনের আবেদন খারিজ করা হয়। এ অবস্থায় হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়।

 

 

মন্তব্য