kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

বৃষ্টি ভোগান্তি মাথায় নিয়েই ঈদ যাত্রা

► প্রবল বৃষ্টিতে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা
► ভিড়ে নেতিয়ে পড়েছে ডেঙ্গুমুক্ত ঈদ যাত্রা কর্মসূচি

পার্থ সারথি দাস   

৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বৃষ্টি ভোগান্তি মাথায় নিয়েই ঈদ যাত্রা

বাড়ি যাওয়ার পথে বৃষ্টি খানিকটা বিড়ম্বনায় ফেললেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। রাজধানীর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

বুধবার রাত সাড়ে ১০টায় গাবতলী থেকে ঈগল পরিবহনের বাসে দুই সন্তানসহ খুলনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল রাহেলা বেগমের। কিন্তু গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে জানতে পারেন, উত্তাল পদ্মায় ফেরি চলছে ধীরে। তাঁদের নিয়ে যে বাসটি যাত্রা করার কথা ছিল সেটি দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে আটকা পড়েছে। বাসটি গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ফিরে এলে রাহেলা বেগম নির্ধারিত সময়ের ১০ ঘণ্টা পর খুলনার উদ্দেশে রওনা দেন।

গাবতলী বাস টার্মিনালে গতকাল দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীর সংখ্যা বেড়েই চলছিল। কারণ তুমুল বৃষ্টিতে বাইপাইল, সাভারসহ বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজটে ফিরতি বাস আটকে ছিল।

এর পরও গতকাল প্রবল বৃষ্টি মাথায় করেই রাজধানীর সব বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঈদে বাড়ি ফেরা যাত্রীর ঢল নামে। ঈদুল আজহার আগে সর্বশেষ কর্মদিবস শেষে গতকাল বিকেল থেকে এই ভিড় ছিল উপচে পড়া। অপেক্ষার প্রহর গুনে, প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে বাসে, ট্রেনে উঠতে হয়েছে বাড়ি ফেরা মানুষকে। সদরঘাটে রাতের লঞ্চ ধরতে ভিড় উপচে পড়ছিল বিকেল থেকেই।

বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং রেলস্টেশনে যেতে বাসা থেকে রওনা হয়ে মিরপুর-১, মিরপুর-১২, পল্লবী, কালশী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রচণ্ড যানজটে আটকা পড়ে যাত্রীরা। অনেকে গণপরিবহন না পেয়ে হেঁটেই গন্তব্যে ছুটতে থাকে। গতকাল দুপুর আড়াইটায় টেকনিক্যাল মোড়ে বৃষ্টিতে ভিজেই গন্তব্যে ছুটছিলেন নাবিল আহমেদ। তিনি জানালেন, পটুয়াখালী যাওয়ার বাস ছাড়বে ৩টায়। এর আগেই পৌঁছতে হবে টার্মিনালে। মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় ক্রমে বাড়তে থাকে। এসব টার্মিনালে পৌঁছতে যাত্রীদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয় বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে।

এদিকে বকেয়া বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাসের দাবিতে দুপুর ১২টা থেকে তৈরি পোশাককর্মীরা মিরপুর ১ নম্বরে সড়ক অবরোধ করলে মিরপুর ১০ নম্বর, গাবতলী, টেকনিক্যাল মোড়, শাহ আলী মাজার থেকে গণপরিবহন ঘুরে চলাচল শুরু করে। এতে একদিকে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট, অন্যদিকে দেখা দেয় তীব্র গণপরিবহনসংকট। সন্ধ্যায় শ্রমিকরা রাস্তা ছাড়লে পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। কোরিয়ান মল্লিক টাওয়ারের জারা জিন্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস দিতে দেরি করায় গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে অবরোধ করে। এতে দুর্ভোগে পড়তে হয় ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষকে।

কমলাপুর রেলস্টেশনে ঈদে বাড়ি ফেরা যাত্রীদের দুর্ভোগ শুরু হয় রাজশাহীগামী ধূমকেতু ট্রেনের তিন ঘণ্টা বিলম্ব যাত্রার মধ্য দিয়ে। পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস ছাড়ার কথা ছিল সকাল ১০টায়। সেটি ছাড়ে আড়াই ঘণ্টা দেরিতে। কমলাপুর রেলস্টেশনে এ ট্রেনে ঈশ্বরদী যেতে অপেক্ষা করছিলেন মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি জানালেন, ১৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনটি টিকিট কিনেছিলেন। আর এখন দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছেন, অথচ ট্রেন কখন ছাড়বে তা কেউ বলতে পারছে না।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে তিনটি রুটে বিশেষ ট্রেনসহ গতকাল ঈদের যাত্রী পরিবহন করে ৫৫টি ট্রেন। এসব ট্রেনে বাড়িমুখো হয় অন্তত ৬০ হাজার যাত্রী। তবে প্রায় সব যাত্রীকে রেলস্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে।

গতকাল বিকেল ৪টা ১৪ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস আত্রাই রেলস্টেশনের কাছাকাছি অবস্থান করছিল। তখন পর্যন্ত ট্রেনটির বিলম্ব ছিল চার ঘণ্টা ১৪ মিনিট। ঢাকার কমলাপুর থেকে ট্রেনটি ছাড়ে তিন ঘণ্টা ১০ মিনিট দেরিতে। ওই ট্রেনের যাত্রী শীষ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মহাসড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ভয় থেকে রেহাই পেতে দেরিতে হলেও ট্রেনে যাচ্ছি। তবে ভিড়ের মধ্যে ট্রেনে উঠতে সীমাহীন কষ্ট হয়েছে।

কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩১টি ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়। প্ল্যাটফর্মে তখন অপেক্ষায় ছিল তারাকান্দিমুখী যমুনা, আখাউড়াগামী তিতাস কমিউটার, কিশোরগঞ্জগামী এগারসিন্ধুর। কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক আমিনুল হক কালের কণ্ঠকে জানান, ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে ফিরতে ট্রেনগুলোর বিলম্ব হচ্ছে বাড়তি যাত্রীর চাপে। ফলে ঢাকা থেকে ট্রেন ছাড়তে দেরি হচ্ছে।

সোমবার ও মঙ্গলবার জোরালো থাকলেও বুধবার থেকে ঈদ যাত্রার আগে বাস ও ট্রেনে মশা নিধন অভিযান নেতিয়ে পড়ে। আর গতকালও এ ক্ষেত্রে শৈথিল্য পরিলক্ষিত হয়েছে। গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে বিকেলে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলোয় মশার ওষুধ স্প্রে করতে দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে বেশির ভাগ যাত্রীর অভিযোগও নেই। কারণ ভিড় ঠেলে গাড়িতে উঠতেই তাদের ত্রাহি অবস্থা। 

কমলাপুর রেলস্টেশনে পঞ্চগড়গামী একতা ট্রেনটি ছাড়ে ১২টা ৫০ মিনিটে। ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে আসে ১২টা ২০ মিনিটে। এ সময় হুড়মুড় করে যাত্রীদের উঠতে দেখা গেছে। জানা যায়, বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে আগেই যাত্রীদের একটি অংশ উঠে পড়েছে। এ অবস্থায় মশা মারার ওষুধ স্প্রে করতে দেখা যায়নি রেলকর্মীদের। একতা এক্সপ্রেসের অ্যাটেনডেন্ট মো. শাহজাহান জানান, মশা মারার ওষুধ স্প্রে করা সম্ভব হয় না ট্রেন লেট হওয়ার কারণে।

আজও ঝরবে বৃষ্টি, ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত বহাল গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে গতকাল দিনভর ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব জেলায় বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে ঢাকায় ১০২ মিলিমিটার। দুপুর থেকে টানা বৃষ্টিতে ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। জলজটের কারণে দেখা দেয় তীব্র যানজট। আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে তা প্রবল অবস্থায় রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় থাকায় আজও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হবে। বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, গত মঙ্গলবার বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ থেকে গভীর নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার পর বুধবার বিকেল ৪টা নাগাদ ভারতের উত্তর ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করে অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। মৌসুমি নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে স্থল নিম্নচাপ আকারে ভারতের মধ্যপ্রদেশ ও তত্সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরো পশ্চিম উত্তর পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাবে। অবশ্য মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় থাকায় ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রামমহ দেশের প্রায় সব এলাকায় বৃষ্টি ঝরবে আজও।

আবহাওয়া কর্মকর্তা বজলুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থল মৌসুমি নিম্নচাপটি ভারতের মধ্যপ্রদেশ ও তত্সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। আমরা চারটি সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সর্তকতা সংকেত বহাল রেখেছি। সমুদ্রবন্দরের ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আজ শুক্রবার দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি হবে। গতকাল মাইজদি কোর্টে ৫৮ মিলিমিটার, ফেনীতে ৫৭ মিলিমিটার ও গোপালগঞ্জে ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।’ 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা