kalerkantho

নিম্নচাপে সাগর উত্তাল

শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ফেরি চলাচল বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ফেরি চলাচল বন্ধ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা কর্মকর্তা (সেকশন অফিসার) পুলক চন্দ্র ঘরামির বাড়ি উপকূলীয় জেলা পিরোজপুরে। ঈদের ছুটিতে ক্যাম্পাস বন্ধ হয়েছে মঙ্গলবার। মাকে দেখতে গতকাল বুধবার সকালে রওনা হন বাড়ির উদ্দেশে। বিপত্তিটা ঘটে মাওয়া ঘাটে গিয়ে। লঞ্চ, ফেরি ও স্পিডবোট বন্ধ। বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। নদীতে প্রচণ্ড ঢেউ থাকায় লঞ্চ, ফেরি, স্পিডবোট বুধবার সকাল থেকেই বন্ধ ছিল। পুলকের মতো অসংখ্য যাত্রী গতকাল মাওয়া ও আরিচা ঘাট থেকে মন খারাপ করে ফিরে আসেন। দিনভর দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। মৌসুমি গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে সমুদ্র উপকূলবর্তী পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালীতে বঙ্গোপসাগর থেকে নিরাপদ স্থানে সরে এসেছে মাছধরা ট্রলারগুলো। তবে রাঙ্গাবালীতে ট্রলারডুবিতে মারা গেছেন এক জেলে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ রুট পদ্মার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে প্রবল স্রোত ও উন্মাতাল ঢেউয়ের কারণে। এই রুটে লঞ্চ-স্পিডবোটসহ অন্যান্য নৌযান চলাচলও বন্ধ রয়েছে।

আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তর বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া মৌসুমি নিম্নচাপটি বুধবার সকালে গভীর নিম্নচাপে রূপ নেয়। গভীর নিম্নচাপটি ধীরে পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ভারতের উত্তর ওড়িষা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে দুপুরের পর থেকে। বুধবার মধ্যরাতে তা উপকূল অতিক্রম করেছে। গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। এই কারণে চারটি সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় ১৯ জেলায় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে এক থেকে দুই ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হবে। তবে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অবশ্য উপকূলজুড়ে এমন উত্তাল পরিস্থিতির কোনো প্রভাব এখনো পড়েনি ঢাকা-বরিশাল নৌ রুটে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা নৌ বন্দরে কোনো সংকেত নেই। আর ঢাকা-বরিশাল রুটে যেহেতু বড় লঞ্চ চলাচল করে, তাই এখানে এই আবহাওয়ায় কোনো সমস্যা নেই।’

আবহাওয়া কর্মকর্তা আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাওয়া ও আরিচা ফেরিঘাট কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে লঞ্চ, ফেরি ও স্পিডবোট ছাড়ার অনুমতি দেওয়া যায় কি না। আমরা তাদের বলেছি সব বন্ধ রাখতে। কারণ, সাগর উত্তাল। নদীতে প্রচণ্ড ঢেউ আছে। বাতাসও রয়েছে। গভীর নিম্নচাপটি মধ্যরাতে উপকূল অতিক্রম করলেও তার প্রভাব রয়ে গেছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ আবহাওয়ার উন্নতি ঘটতি পারে। তারপর ফেরি, লঞ্চ ছাড়া যেতে পারে।’

এদিকে আবহাওয়া অফিস জানায়, গতকাল সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৭৫ মিলিমিটার। এ ছাড়া টেকনাফে ৫২ মিলিটার ও সাতক্ষীরায় ৪৩ মিলিমিটার। ঢাকায় হয়েছে ১৩ মিলিমিটার। দেশের সব জেলাতেই গতকাল বৃষ্টি হয়েছে। আজও হতে পারে। গতকাল দিনাজপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, মৌসুমি গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট ঝোড়ো হাওয়ায় পটুয়াখালীর কলাপাড়ার সব নদ-নদী ও সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠেছে। সাগর উত্তাল হয়ে পড়ায় কুয়াকাটাসংলগ্ন গভীর বঙ্গোপসাগর থেকে সব মাছধরা ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মৎস্য বন্দর আলীপুর ও মহিপুরের শিববাড়িয়া নদীতে আশ্রয় নিয়েছে। দুর্যোগের কারণে আন্ধারমানিক, রাবনাবাদ, সোনাতলা নদীসহ সব নদ-নদীর পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মৎস্য বন্দর আলীপুর ও মহিপুরের শিববাড়িয়া নদীর দুই তীরে হাজারো মাছধরা ট্রলার সারিবদ্ধ হয়ে নোঙর করে আছে। এফবি ফয়সাল ট্রলারের মাঝি শাহ জালাল বলেন, ‘তিন দিন পর আবার সাগরে গিয়ে ইলিশ শিকার করার পর গত ৫ আগস্ট আবার সাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় ট্রলার নিয়ে তীরে ফিরে আসি।’

রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, বৈরী আবহাওয়ায় উত্তাল বঙ্গোপসাগরে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ও ছোটবাইশদিয়া  ইউনিয়নে দুটি জেলে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআণ্ডা গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে ফরহাদ হোসেন (২৫) নামে এক জেলের মৃত্যু হয়। গতকাল বুধবার দুপুরে গভীর বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবির ঘটনা দুটি ঘটে।

মুন্সীগঞ্জ ও শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, বৈরী আবহাওয়ায় পদ্মা নদী উত্তাল হয়ে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে ফেরি, লঞ্চ, স্পিডবোটসহ সব নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে ঘাট এলাকায় দীর্ঘ যানজটে চরম দুর্ভোগের মুখে আছে যাত্রী ও শ্রমিকরা। ঢাকামুখী গরু বোঝাই অসংখ্য ট্রাকও আটকে পড়ায় অনেক গরু অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময় আটকে পড়ায় কাউসার মিয়া নামে এক গরু ব্যবসায়ীর ৬০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গরুর মৃত্যু হয়েছে। আরো অনেকের গরুই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া ঢেউয়ের তোড়ে একটি গরুবাহী ট্রলারের তলা ফেটে গেলে ট্রলারটি একটি চরে নিরাপদে তুলে দেন চালক। তাঁর বুদ্ধিমত্তায় বেঁচে যায় প্রায় ৬০টি গরু। বিআইডাব্লিউটিসিসহ একাধিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই বৈরী আবহাওয়ায় শিমুুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটের পদ্মা নদী উত্তাল হয়ে উঠলে নৌযান পারাপারে বিলম্ব হচ্ছিল। ঢেউয়ের তোড়ে শিমুলিয়ার তিনটি ঘাটই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এদিকে বুধবার সকাল ৬টা থেকে সীমিত আকারে ফেরি চলাচল শুরু করে। লৌহজং টার্নিংয়ের বিকল্প সরু চ্যানেল দিয়ে পারাপারে দীর্ঘ সময় লাগছিল। কিন্তু নদী ফের উত্তাল হয়ে পড়ায় বুধবার সকাল ১১টা থেকে আবারও সব ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় বিআইডাব্লিউটিসি। অনেক ব্যবসায়ী গরু নিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে ঢাকায় রওনা করেছে। মাগুরার গরু ব্যবসায়ী ইয়াকুব মিয়া বলেন, ‘আমাদের গরুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আমরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

বিআইডাব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের এজিএম নাসির চৌধুরী জানান, পদ্মার স্রোত এতটাই প্রমত্ত হয়ে পড়েছে যে কোনো ফেরি ঘাট থেকে ছাড়ার পর পর তা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল। বৃহস্পতিবার থেকে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের রওনা হওয়ার কথা। তাই এ রকম চলতে থাকলে এখানে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে।

মাওয়া ট্রাফিক জোনের টিআই হিলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, ফেরিসহ সব নৌযান বন্ধ থাকায় ঘাটের তিনটি পার্কিং ইয়ার্ডই পারাপারের অপেক্ষায় থাকা গাড়িতে পরিপূর্ণ রয়েছে। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাবিরুল ইসলাম খান দুপুরে শিমুলিয়া ঘাট পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘যাত্রীদের দুর্ভোগ হলেও আমরা কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে পারি না। যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা আগে। নদী নৌযান চলাচলের উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত ফেরিসহ সব নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বিআইডাব্লিউটিসি ও বিআইডাব্লিউটিএকে।’

সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী ২ জাহাজডুবি

এদিকে, চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ঝড়ের কবলে পড়ে কুতুবদিয়া দ্বীপের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে আড়াই হাজার মেট্রিক টন সিমেন্ট ক্লিংকারসহ (কাঁচামাল) এমভি টিটু-১৮ এবং এমভি টিটু-১৯ নামের দুটি লাইটার জাহাজ ডুবে গেছে। তবে বুধবার দুপুরের এ ঘটনায় উভয় জাহাজের নাবিকদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রতিটি জাহাজে আড়াই শ টন ক্লিংকার ছিল।

গতকাল বুধবার দুপুরে কুতুবদিয়ায় অবস্থানরত মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে লাইটার জাহাজ দুটি ক্লিংকার নিয়ে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। লাইটার দুটির ঢাকার মুক্তারপুরে শাহ সিমেন্ট কারখানার ঘাটে যাওয়ার কথা ছিল। জাহাজ দুটি একদিকে কাত হয়ে ডুবে যায়।

আবুল খায়ের গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্টের মালিকানাধীন লাইটার দুটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ার পর বাংলাদেশ নৌবাহিনী সদস্যরা একটি জাহাজের ১০ জন নাবিককে উদ্ধার করেন। এ ছাড়া মালিকপক্ষ বিশেষ একটি হেলিকপ্টার দিয়ে অন্য জাহাজের নাবিকদের উদ্ধার করে।

 

মন্তব্য