kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদূত বহিষ্কার বাণিজ্যও স্থগিত

কাশ্মীরে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভে নিহত ১, গ্রেপ্তার শতাধিক

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদূত বহিষ্কার বাণিজ্যও স্থগিত

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর এখন ভূতুড়ে নগরী। প্রতি ১০০ মিটার দূরত্বে তল্লাশি ফাঁড়ি। জনশূন্য সড়কে কাঁটাতারের বেড়া; সামনে-পিছে সশস্ত্র সেনা। পুরো শহর চষে বেড়াচ্ছে সাঁজোয়া যান। এক কাশ্মীরির ভাষায়, ‘এ যেন উন্মুক্ত কারাগার।’ নাকি ‘এ কোনো যুদ্ধরত নগরী?’ এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কারফিউ আর ১৪৪ ধারা আরোপিত শহরেই গতকাল বুধবার বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ করে কাশ্মীরিরা। ভূস্বর্গের বিশেষ স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত করার ভারতের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এসব রাস্তার বিক্ষোভ থেকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ গতকাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে শতাধিক কাশ্মীরিকে। প্রাণ হারিয়েছে একজন, বুলেটের আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ছয়জন।

ভারতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথম দিন থেকেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে পাকিস্তান। গতকাল দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) বৈঠকে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার পাশাপাশি সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারকে বহিষ্কার এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে নয়াদিল্লি থেকে ডেকে আনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এ ছাড়া পাকিস্তানের পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে গতকাল সর্বসম্মতিক্রমে ভারতের কাশ্মীর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে ‘একতরফা ব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসন দিয়ে ভারতের সংবিধানে যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ ছিল গত সোমবার রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এক অধ্যাদেশ জারি করে তা বাতিল করে দেন। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে কাশ্মীরে লক্ষাধিক সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি কারফিউ জারি করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় উপত্যকার ইন্টারনেট, মোবাইল ও টেলিফোন পরিষেবা। গতকাল পর্যন্ত তা বন্ধই ছিল। জরুরি যোগাযোগের জন্য পুলিশ প্রশাসনের হাতে দেওয়া হয় স্যাটেলাইট ফোন। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় প্রথম দুই দিন কাশ্মীরিরা বিমূঢ় হয়ে পড়লেও গতকাল থেকে একটু একটু করে পথে নামতে শুরু করেছে।

ভারতের এ সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে চীনও। কারণ কাশ্মীরের সঙ্গে তাদেরও সীমান্ত রয়েছে। ভারতের এ সিদ্ধান্ত তাদের সার্বভৌমত্বের পক্ষে হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারবে বলে মনে করছে তারা। এ কারণেই ভারত ও পাকিস্তান দুই পক্ষের প্রতিই সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে চীন।

তবে বিস্ময়করভাবে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। গত মঙ্গলবার পাকিস্তান কাশ্মীর ইস্যুটি ওআইসিতে তোলে। এ সময় আরব আমিরাত জানায়, তারা মনে করে ভারতের এ সিদ্ধান্ত কাশ্মীরিদের পক্ষে যাবে।

তবে আমিরাতের মতো করে বিষয়টি ভাবছে না খোদ কাশ্মীরিরা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের এ সিদ্ধান্তে খোদ কাশ্মীরেরও মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথম দুই দিন প্রায় স্থবির হয়ে ছিল তারা। গতকাল থেকে রাস্তায় নামতে শুরু করেছে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশকে পুলিশ ধাওয়া দিলে এক তরুণ ঝিলাম নদীতে ঝাঁপ দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সদস্য জানান, পরে ওই তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শ্রীনগরের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিক্ষোভে পুলিশ গুলি ছুড়লে বুলেটের আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ছয়জন।

রাষ্ট্রপতির ডিক্রি জারির আগেই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লাহকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে অবশ্য উপত্যকার শান্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বর্তমানে কাশ্মীরে অবস্থান করছেন। ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলে তাঁকে রাস্তায় নেমে সেনা সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে। সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই জানায়, অল্প কিছু পাথর ছোড়ার ঘটনা ছাড়া ‘কাশ্মীরের পরিস্থিতি শান্ত’।

তবে ভারত সরকারের দাবি করা এ ‘শান্তি’ কত দিন স্থায়ী হবে তা বলা মুশকিল। মেহবুবা মুফতির মেয়ে ইলতিজা জাভেদ বলছিলেন, ‘একটি রাজ্যে চিরকাল কারফিউ দিয়ে রাখা যায় না। আমি নিশ্চিত এ উপত্যকার মানুষ বিষয়টিকে ছেড়ে দেবে না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তাকর্মীর মধ্যেও দেখা গেল একই অনিশ্চয়তার সুর, ‘আমার জাতি কাশ্মীর ফুটছে। বিস্ফোরণ অনিবার্য। আমরা শুধু সময়টা জানি না। বিক্ষোভের বিস্ফোরণ ছাড়াই কারফিউ তুলে নেওয়া যাবে কি না আমি নিশ্চিত নই।’

ওই বিস্ফোরণের সুরই যেন পাওয়া গেল এক কাশ্মীরির কণ্ঠে। শ্রীনগরের বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আসিফ বলেন, ‘আমাদের পরিচয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা কখনোই নিজেদের ভারতের নাগরিক বলে মনে করিনি। এখন সরকারিভাবে একে ভারত বানানো হলো।’ কাশ্মীরিদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক একইভাবে বিদ্যমান। শাহ ফয়সাল নামে এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘গত ৭০ বছরের মধ্যে ভারত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা এটি। কেউ জানে না এবার কী ঘটবে।’

ভারতের কাশ্মীর সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে পাকিস্তানে। কাশ্মীরকে পাকিস্তান নিজের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করে। গত সাত দশকে কাশ্মীর নিয়ে দুই দফা লড়েছে দেশ দুটি। গতকাল প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এনএসসির বৈঠকে ভারতের নৃশংস, বর্ণবাদী প্রশাসনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি বিশ্বকে জানাতে সব কূটনৈতিক চ্যানেল উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি বলেন, ‘দিল্লিতে আমাদের হাইকমিশনার থাকবেন না। ভারতের দূতকেও তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে।’ এ ছাড়া ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সব চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। এ ছাড়া ভারতের সিদ্ধান্তকে ‘একতরফা এবং অবৈধ’ বলে অভিহিত করা হয়। আগামী ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে পাকিস্তান ‘কৃষ্ণ দিবস’ হিসেবে পালন করবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়। সেনাবাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। 

পাকিস্তানের পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে গতকাল ভারতের সিদ্ধান্তকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত একে তাদের ‘একতরফা’ সিদ্ধান্ত অভিহিত করে এই সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাস হয়। দেশটির সরকারি ও বিরোধীদলীয় আইন প্রণেতারা দাবি করেন, জাতিসংঘ কাশ্মীরকে বিতর্কিত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে। ভারতের সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের ওই অবস্থানের পরিপন্থী। একই সঙ্গে এটি সিমলা চুক্তিরও লঙ্ঘন। এ সময় পিপিপির সহসভাপতি জারদারি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান ট্র্যাজেডি’র মতো গুরুতর হয়ে উঠবে কাশ্মীর পরিস্থিতি। ইতিহাস বুঝতে হবে। কাশ্মীর নিয়ে লড়াই করতেই পিপিপির সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জাস্টিস (আইসিজে) বলেছে, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খারিজের মধ্য দিয়ে ভারত তাদের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। আইনের শাসন ও মানবাধিকারের ওপরও এটি বড় আঘাত। সূত্র : ডন, বিবিসি, এএফপি, সিএনএন, নিউজ এইটিন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা