kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

উদ্বেগ ভীতি শঙ্কায় দেশ

সরকার বলছে ষড়যন্ত্র ► ভিন্নমত বিশিষ্টজনদের

বিশেষ প্রতিনিধি   

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উদ্বেগ ভীতি শঙ্কায় দেশ

ছেলেধরা গুজবে পিটিয়ে মানুষ হত্যার আতঙ্ক, দেশজুড়ে ডেঙ্গুভীতির সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ১ আগস্ট ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে যুবলীগের এক অনুষ্ঠানে চলতি শোকের মাস আগস্টেই দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা ব্যক্ত করে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। তিনি যখন এই সতর্কবার্তা দেন, ঠিক তার ১১ দিন পর পবিত্র ঈদুল আজহা পালন করবে দেশের মানুষ।

তিন বছর আগে প্রায় একই সময়ে রাজধানীর সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানের কূটনৈতিক জোনে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ২২ জন নিহত হয়, যার বেশির ভাগই ছিল বিদেশি। ওই হামলা ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস জঙ্গি হামলা। তখন সরকার দাবি করে, দেশকে অস্থিতিশীল, সরকারকে কোণঠাসা করে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতেই ওই হামলা চালানো হয়। ওই হামলার পর ঢাকাসহ সারা দেশের অর্ধশতাধিক স্থানে অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তার করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের। ওই মামলার বিচার চললেও ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল, তা প্রকাশিত হয়নি।

তাই ঠিক ঈদের আগে নতুন করে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায়ের পবিত্র উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষ শিকড়ের টানে বাড়ির উদ্দেশে ঈদ যাত্রা শুরু করেছে। এই সময় গুজব-আতঙ্ক, ধর্ষণ-বিকৃতি, ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে’ গুজব এবং দেশজুড়ে ডেঙ্গুর ভয়ের সঙ্গে নতুন করে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা গুমট পরিস্থিতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

তবে এই উদ্বেগ-আতঙ্ক-অস্বস্তিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে সরকার, যদিও এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কারা রয়েছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে পারেনি এখনো। অন্যদিকে দেশের বিশিষ্টজনরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকেই এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। তাই সব কিছুর আগে দরকার দেশে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।

এর আগে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড, নারী ও শিশু ধর্ষণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি, মধ্যযুগীয় বর্বরতায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে মানুষ হত্যা এবং শেয়ারবাজারে দরপতনে মানুষের মাঝে চরম হতাশার জন্ম দেয়। এসব সমস্যায় দেশের মানুষ যখন উৎকণ্ঠিত ও শঙ্কিত, সেই পরিস্থিতিতে বিদেশে অবস্থান করেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন। সাম্প্রতিক ছেলেধরা গুজবে কান না দেওয়া এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ভয়াবহ ডেঙ্গু মোকাবেলার জন্য সবাইকে সচেতন হওয়ার কথা বলেন।

সরকারের পক্ষ থেকে সব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এর উদ্দেশ্য দেশকে অস্থিতিশীল করা। কিন্তু কারা এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না দায়িত্বপ্রাপ্তরা। ফলে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা থেকেই যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চলছে। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, জঙ্গি উত্থানে বিশ্বাস করে তারাই গুজব ছড়াচ্ছে এবং জঙ্গি হামলার অপচেষ্টা করছে। অতীতেও তারা এই ধরনের অপচেষ্টা চালিয়েছে। এর কারণ তারা সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চায়। তিনি দাবি করেন, সরকার অবশ্যই ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করবে। তারা কেউই পার পাবে না।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এ মাসে (আগস্ট) কিন্তু বিপদেরও আশঙ্কা আছে। সতর্ক থাকতে হবে। স্যাবোটাজের আশঙ্কা আছে। জঙ্গিবাদের আশঙ্কা আছে। আমাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়। তারা জানে, একজন শেখ হাসিনাকে শেষ করে দিতে পারলে আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক প্রতিরোধ মোর্চার এক অনুষ্ঠানে বলেন, মতিঝিলে হেফাজত নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছিল, সেটিরও একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। এখনো যে গুজবগুলো হচ্ছে, সেগুলোও কিন্তু রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি অপপ্রচারের পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ গত সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদের এক আলোচনাসভায় বলেন, বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে, এটি বিএনপির ভালো লাগছে না। এ জন্য দেশে তারা নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা দেশে গুজব ছড়াচ্ছে। তারা প্রথমে পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে, ছেলেধরা নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে, তারপর হারপিক আর ব্লিচিং পাউডার নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে, এখন প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

এ মাসে জঙ্গি হামলার আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বরাবরই জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে আমাদের সব ইউনিট কাজ করছে। জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড থেমে নেই। তাই সব সময় আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়।’

ডেঙ্গুর প্রকোপ, ছেলেধরা গুজব আর শেয়ারবাজারে দরপতনের ঘটনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই আমাদের উদ্বেগ বাড়ে। অন্য দেশেও যে দুর্যোগ আসে না, তা কিন্তু নয়। সেসব দেশে প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকে। আমাদের দেশে তা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে আর প্রতিকার হয় না।’ তিনি বলেন, ডেঙ্গুর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। আগেকার ডেঙ্গু প্রকোপের পর যদি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে এ অবস্থার মুখোমুখি হতে হতো না। ছেলেধরা গুজব সম্পর্কে তিনি বলেন, গুজব বলে সব কিছুতে পার পাওয়া যাবে না। এ জন্য সামাজিক সচেতনতা দরকার। সামাজিক সচেতনতার জন্য সব কিছুর আগে দরকার ন্যায়বিচার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের কাছে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, বিচার হয় না বলেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। তিনি বলেন, এ দেশের মানুষ গুজবে বিশ্বাস করে। তবে এই গুজবকে সরকার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখলেও তা মানতে রাজি নন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এসব প্রতিরোধে সবার আগে দরকার ন্যায়বিচার। 

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার ঘাটতির ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তারা মনে করে, অপরাধীকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হলে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীর পক্ষ নেয় এবং মানুষ হয়রানির শিকার হয়। এ অবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে পেশাদারি ফিরিয়ে আনা এবং জবাবদিহি তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

মন্তব্য