kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

কাশ্মীর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে

► আর রাজ্য নয়, কাশ্মীর ও লাদাখ নামে দুটি অঞ্চল
► মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লাহ গ্রেপ্তার
► কারফিউ জারি
► ভারতের ‘অবৈধ পদক্ষেপ’ মোকাবেলায় সব কিছু করা হবে : পাকিস্তান

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কাশ্মীর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে

জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা দমাতে জম্মুর রাস্তায় সেনাদের সতর্ক পাহারা। ছবি : এএফপি

জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা বাতিল করে দিয়েছে ভারত। সাত দশকের ইতিহাস পাল্টে প্রেসিডেন্টের নির্দেশ জারির মধ্য দিয়ে ভারত সরকার বাতিল করে দিল সংবিধানের ৩৭০ ধারা, যা জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা দিয়েছিল। পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীর থেকে লাদাখকে বের করে তৈরি করা হয়েছে নতুন এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যার কোনো বিধানসভা থাকবে না। থাকছে না জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদাও।

কাশ্মীর এখন থেকে পরিচিত হবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে। তবে তার বিধানসভা থাকবে।

সরকারের এ সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিরোধী দল কংগ্রেস। সংবাদ সম্মেলন করে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম একে ‘ভারত ভাঙনের শুরু’ হিসেবে অভিহিত করেন। এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ভারত নিজেকে কাশ্মীরের ‘দখলদার বাহিনীতে’ পরিণত করল বলে মন্তব্য করেছেন উপত্যকার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। তাঁকে এবং কাশ্মীরের আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে ওমর আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়ছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রথম সারির আরো কয়েকজন নেতা।

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত সরকারের এই কঠোর অবস্থানে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে পাকিস্তান। এক বিবৃতিতে গতকাল সোমবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভারতের এই ‘অবৈধ পদক্ষেপ’ মোকাবেলায় সম্ভব সব কিছু করবে তারা।

কাশ্মীর ইস্যুতে মোদি সরকারের এই অবস্থান আকস্মিক কিছু নয়। বেশ কয়েক দিন থেকেই এর আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। সম্প্রতি উপত্যকায় দফায় দফায় আধাসামরিক সেনা সংখ্যা বাড়ায় ভারত (গতকাল পর্যন্ত কাশ্মীরে এক লাখ ৮০ হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের খবর পাওয়া গেছে)। এর পরই আসে অমরনাথে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের কাশ্মীর ছাড়ার নির্দেশ। একই সঙ্গে অন্য রাজ্যের যেসব শিক্ষার্থী কাশ্মীরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছিল তাদেরও সরে যেতে বলা হয়। রবিবার গভীর রাতে গৃহবন্দি করা হয় রাজ্যের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লাহকে। পরে গতকাল তাদের গ্রেপ্তার করে শ্রীনগরের একটি গেস্টহাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তার করা হয়েছে বেশ কয়েকজন প্রথম সারির নেতাকেও। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাজ্জাদ লোন ও ইমরান আনসারি। এ ছাড়া উপত্যকার ইন্টারনেট সংযোগ আংশিক এবং টেলিফোন পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশসহ জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। ৭০ লাখ জনগোষ্ঠীর এ উপত্যকায় রবিবার মধ্যরাত থেকে সান্ধ্য আইন বলবৎ রয়েছে। 

৩৭০ ধারা বাতিলের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল বেশ কয়েক দিন থেকেই। গত রবিবার বিশেষ বৈঠকে বসেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালসহ জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গতকাল সকালে এ নিয়ে ফের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে বৈঠক হয়। এর পরই রাজ্যসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পড়ে শোনান প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ স্বাক্ষরিত নির্দেশ। বলা হয় এই নির্দেশ তাত্ক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। এই নির্দেশে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়। ১৯৫০ সলে প্রণীত ভারতীয় সংবিধানের এই ধারাবলেই কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়। ‘কাশ্মীর রিঅর্গানাইজেশন বিল’ নামের এই নির্দেশনায় বলা হয়, এখন থেকে জম্মু ও কাশ্মীর হবে দিল্লি ও পুদুচেরির মতোই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। নিজস্ব সংবিধান, নিজস্ব পতাকা আর থাকবে না তাদের। কাশ্মীরের বিধানসভার ধাঁচও হবে এই দুই অঞ্চলের মতোই। আর কাশ্মীর ভেঙে বের করে আনা লাদাখ পরিচালিত হবে চণ্ডিগড়ের আদলে। তাদের বিধানসভা থাকবে না। কাশ্মীর ও লাদাখ পরিচালনা করবেন দুজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর। প্রেসিডেন্টের নির্দেশের অর্থ হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা বা নিম্নকক্ষ লোকসভায় ভোটাভুটির আর কোনো সুযোগ রইল না।   

বহুল আলোচিত ৩৭০ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা ও বিশেষ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সংবিধানের ধারাগুলো অন্য সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও জম্মু কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। এই  অস্থায়ী সংস্থান (‘টেম্পোরারি প্রভিশন’) অনুযায়ী প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ ও যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে জম্মু-কাশ্মীরে হস্তক্ষেপের অধিকার ছিল না দিল্লির। এমনকি কোনো আইন প্রণয়নের অধিকার ছিল না কেন্দ্র বা পার্লামেন্টের। এই ধারা অনুসারে, কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাও বিশেষ সুবিধা পেত। স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া অন্য রাজ্যের কেউ সেখানে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে পারত না। চাকরির ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

মোদি সরকারের এ সিদ্ধান্তের পর পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে একাধিক টুইট করেন কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। তিনি এই নির্দেশকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করে বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে ভারত কাশ্মীরে অবৈধ দখলদারে পরিণত হবে।’ তিনি গতকালের দিনটিকে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য ‘কৃষ্ণতম দিন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি আরো বলেন, ‘কেন্দ্রের পরিকল্পনাটা এখন স্পষ্ট। রাজ্যের মানুষকে ভয় দেখিয়ে জম্মু-কাশ্মীর দখল করতে চাইত তারা। কাশ্মীরকে যে কথা দেওয়া হয়েছিল, তা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ভারত।’ ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ও কাশ্মীরের আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এক টুইটে বলেন, ‘এটা একটা হতাশাজনক সিদ্ধান্ত। কাশ্মীরের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হলো।’ এই দুই নেতাই এখন গ্রেপ্তার। 

তীব্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কংগ্রেসের তরফ থেকেও। প্রাথমিকভাবে রাজ্যসভাতেই হট্টগোল শুরু করেন কংগ্রেস সদস্যরা। পরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সংবিধানের ইতিহাসে আজ (গতকাল) কালো দিন। এটা যদি জম্মু-কাশ্মীরের সঙ্গে করা যায়, তা হলে দেশের অন্য রাজ্যগুলোর প্রতিটির সঙ্গেই করা যেতে পারে।’

তবে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টিসহ বহুজন সমাজ পার্টি, বিজু জনতা দল, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, এআইএডিএমকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ‘ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিজেপির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অরুণ জেটলি।

তবে বিজেপি সরকারের এ সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ভারতের পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী পাকিস্তান। কাশ্মীরের অন্যতম দাবিদার পাকিস্তান। হিমালয় কোলের এই উপত্যকা নিয়ে এরই মধ্যে দুই দফা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ করেছে এই দেশ দুটি। গতকাল ভারতের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা দেওয়ার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলে, ‘ভারত সরকারের কোনো একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে কাশ্মীরের বিতর্কিত মর্যাদার পরিবর্তন আসবে না। কারণ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কশ্মীরকে বিতর্কিত হিসেবেই বিবেচনা করে। এই আন্তর্জাতিক বিতর্কের একটি পক্ষ হিসেবে পাকিস্তান এই অবৈধ পদক্ষেপের মোকাবেলায় সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে।’ পাকিস্তানের  পররাষ্ট্রসচিব গতকাল ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করে কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর দেশের তীব্র ক্ষোভের কথা উল্লেখ করেন।  

এরই মধ্যে পার্লামেন্টের বিরোধী দলগুলো যৌথ অধিবেশনের ডাক দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার সেই অধিবেশন বসার কথা। পাশাপাশি কাশ্মীর ইস্যু মোকাবেলায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি, পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের প্রধান শাহবাজ শরিফসহ সব বিরোধীদলীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার বাতিল করে দিয়ে নির্বাচনের বেঁধে দেওয়া তিন লক্ষ্যের একটি বিজেপি পূরণ করল। আজ মঙ্গলবার থেকে অযোধ্যা মামলার দৈনন্দিন শুনানি শুরু হবে সুপ্রিম কোর্টে। বিজেপির বিশ্বাস, অতি দ্রুত সেই শুনানি শেষ হবে এবং অযোধ্যায় মন্দির প্রতিষ্ঠা করার সব বাধা দূর হবে। বাকি থাকল শুধু অভিন্ন দেওয়ানি বিধি।

কাশ্মীর এই মুহূর্তে থমথমে। তবে বিষয়টির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক জ্যেষ্ঠ আমলা ওয়াজাহাত হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘কাশ্মীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হবে। এমনিতেই পুরো উপত্যকা অস্থির হয়ে আছে; এই সিদ্ধান্ত সেই পরিস্থিতিকে আরো অবনতির দিকে ঠেলে দেবে।’ তিনি মনে করেন, এর মধ্যে দিয়ে কাশ্মীরের জনমিতি পাল্টে দেওয়ার কথা ভাবছে বিজেপি। বিশেষ মর্যাদার সুবিধা তুলে নেওয়ার পর কাশ্মীরে অন্য রাজ্য থেকে বিশেষ করে হিন্দুদের এনে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করা হবে, যা উপত্যকার জন্য চরম বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু।

মন্তব্য