kalerkantho

নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের মসলায় সিসা!

বাংলাদেশিদের রক্তে সিসার উপস্থিতি মাত্রাতিরিক্ত

শওকত আলী   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের মসলায় সিসা!

যুক্তরাষ্টের নিউ ইয়র্ক শহরে বসবাসকারী বাংলাদেশি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তে পাওয়া গেছে উচ্চ মাত্রার সিসা। নিউ ইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড মেন্টাল হাইজিন (ডিওএইচএমএইচ) দীর্ঘ ১০ বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের রক্তে উচ্চমাত্রার এই সিসার উপস্থিতির জন্য বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা মসলাকেই চিহ্নিত করেছে। ডিওএইচএমএইচের তাগিদের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশে এ ব্যাপারে অনুসন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)।

বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়া ডিওএইচএমএইচের চিঠির সূত্রে জানা যায়, নিউ ইয়র্ক শহর থেকে ২০০৮-২০১৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের মসলার ২৭৫টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে ডিওএইচএমএইচ। তাতে ৭৩ শতাংশ নমুনায় উচ্চ মাত্রার সীসার উপস্থিতি ধরা পড়ে। এর মধ্যে হলুদের গুঁড়ায় পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি সিসা, ২০০০ পিপিএম। এ ছাড়া দারচিনির গুঁড়ায় ৮৮০ পিপিএম, জিরায় ৫৭০ পিপিএম, কারিতে ৫৩০ পিপিএম, সাধারণ মসলায় ২২০ পিপিএম ও গুঁড়া মরিচে ১২০ পিপিএম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মসলায় গড়ে যে পরিমাণ সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে তা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক গুণ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিওএইচএমএইচ তাদের গবেষণার অংশ হিসেবে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি ৮৫ শিশু ও ৩২ জন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির রক্ত পরীক্ষা করে। শিশুদের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৪৯ মাইক্রোগ্রাম ও পূর্ণবয়স্কদের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৩৬ মাইক্রোগ্রাম সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। অন্যদিকে স্থানীয় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তে সিসার পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে দুই মাইক্রোগ্রামেরও কম পাওয়া গেছে। সীসাযুক্ত মসলাগুলো নিয়মিত খাওয়ার কারণেই বাংলাদেশিদের রক্তেও সিসার মাত্রা বেড়ে গেছে এবং তা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ডিওএইচএমএইচ কর্তৃপক্ষ নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট দপ্তরে গত ৭ মার্চ এই চিঠি পাঠায়। এ চিঠির সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গত ১৭ জুন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে (বিএফএসএ) তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। 

বিএফএসএ বিষয়টি তদন্ত করার জন্য একটি কমিটি করেছে। এই কমিটি এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। এই কমিটি সমস্যার উৎস খুঁজে বের করার কাজ করছে। কমিটি বাংলাদেশের বাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের মসলার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার কাজ শুরু করেছে।

বিএফএসএর সদস্য মো. মাহবুব কবির (অতিরিক্ত সচিব) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর আমরা কাজ শুরু করেছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলেই সত্যিকার অবস্থাটা বোঝা যাবে। আমরা আগে দেখার চেষ্টা করছি মসলাগুলোতে সিসা আছে কি না এবং তার উৎস কোথায়।’

বাংলাদেশে যারা মসলা প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাত করে তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে একটি কম্পানিই নিউ ইয়র্কে মসলা রপ্তানি করছে, যার পরিমাণ খুবই সামান্য। কম্পানিটি কয়েকটি ধাপে পরমাণু শক্তি কমিশন থেকে পরীক্ষা করে তবেই মসলা রপ্তানি করে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান মসলা রপ্তানি করত, কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের হলুদে মাত্রাতিরিক্ত সিসার অস্তিত্ব ধরা পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০১৩ সালে সে দেশ থেকে ওই হলুদ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। এর পর থেকে ওই প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে তাদের মসলা রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিউ ইয়র্কে ভারত ও পাকিস্তান থেকে প্রচুর পরিমাণে মসলা রপ্তানি হয়। ভারতের সান, রাজা এবং পাকিস্তানের মেহরান ব্র্যান্ডের মসলার চাহিদা নিউ ইয়র্কে সবচেয়ে বেশি। এই মসলাগুলোতে ক্ষতিকর রং ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। 

ডিওএইচএমএইচ বলছে, শরীরে মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতির প্রভাব দ্রুত দূর করা সম্ভব নয়। প্রতিরোধ করাটাই একমাত্র কার্যকরী উপায়। নিউ ইয়র্ক শহরে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয়দের সিসার বিষয়ে সচেতন করার জন্য সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠান সেখানে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে। অতিরিক্ত মাত্রার সিসার কারণে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হয় এবং এই ঝুঁকি থেকে বের হতে বা ঝুঁকিতে না পড়তে কী করতে হবে তা জানানো হচ্ছে। বাংলাদেশিদের সচেতন করার জন্য নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সহযোগিতাও নিচ্ছে তারা।

মসলার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহৃত কিছু উপাদান (হেলথ রেমিডি), কমসেটিকস ও সিঁদুরে ক্ষতিকর মাত্রায় সিসা ধরা পড়েছে বলেও জানা গেছে, যার বেশির ভাগই ভারত ও পাকিস্তানের পণ্য।   

নিউ ইয়র্কে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাসীদের এই সিসার বিষয়ে সতর্কতামূলক নোটিশ জারি করেছে ডিওএইচএমএইচ। সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ফেসবুক, টুইটার, এসএমএস, ই-মেইলের মাধ্যমে জানানোর পাশাপাশি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা