kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

শিরোপায় রঙিন বসুন্ধরা কিংস

সনৎ বাবলা   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিরোপায় রঙিন বসুন্ধরা কিংস

শিরোপা আগেই নিশ্চিত করে ফেলেছিল বসুন্ধরা কিংস। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে গতকাল ট্রফি নিয়ে উল্লাস প্রিমিয়ার লিগের নতুন চ্যাম্পিয়নদের। ছবি : মীর ফরিদ

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চারদিকে শিরোপার আবহ। দর্শক-সমর্থক-টিম ম্যানেজমেন্টের গায়ে চ্যাম্পিয়ন দলের জার্সি, তাঁদের আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়েই শুরু হওয়া শিরোপা উৎসবের শেষটা রাঙিয়ে দিল বসুন্ধরা কিংস ড্র ম্যাচের আনুষ্ঠানিকতায়।

চট্টগ্রাম আবাহনীর সঙ্গে কালকের ম্যাচটি ছিল শুধুই এক আনুষ্ঠানিকতা। এর এক ম্যাচ আগেই নীলফামারীতে মোহামেডানের সঙ্গে ড্র ম্যাচে শিরোপা মুঠোবন্দি করে কিংসের উৎসবের শুরু। তারই পূর্ণতা মিলেছে কাল চট্টগ্রাম আবাহনীর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্রয়ে। এতে তারা সন্তুষ্ট নয়, জয় দিয়ে রাঙাতে চেয়েছিল শেষটাও। সবই কি আর চাওয়া মেনে হয়? শিরোপা মুঠোয় আসার পর সেরাদের মধ্যেও একাগ্রতার ঘাটতি হতে পারে। বসুন্ধরা কিংসের স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজোনের মনও একটু ভার, ‘শিরোপার আনন্দ আছে, তবে জিতে শেষ করতে পারলে খুব ভালো লাগত। হাই-প্রেসিং করে খেলেও আমরা জয়সূচক গোলটি বের করতে পারিনি। বৃষ্টিভেজা মাঠে খেলাও খুব কঠিন। এর পরও পুরো মৌসুমের দুর্দান্ত সাফল্যে কিংস হয়ে উঠেছে এ দেশের ফুটবলে নতুন শক্তি।’ নব শক্তির উন্মেষ ফেডারেশন কাপের রানার্স-আপ ট্রফিতে, এরপর স্বাধীনতা কাপ ট্রফিতে বসুন্ধরা কিংসের কিং হওয়া শুরু। কাল লিগ শিরোপা ট্রফির আলিঙ্গনে তারা হয়ে ওঠে এ মৌসুমের সেরা ফুটবল শক্তি।

এই কাদামাঠেও কাল শেষটা জয়ে রাঙানোর মতো খেলেছে কিংস। ১৭ মিনিটে মার্কোস ভিনিসিয়াসের গোলে দারুণ শুরু করেছিল তারা। সেটা দ্বিগুণ করতে পারতেন ড্যানিয়েল কলিনড্রেস, বক্সের সামনে থেকেও মতিন মিয়ার ক্রসে টোকা দিতে পারেননি এই কোস্টারিকান বিশ্বকাপার। বিরতির আগে কিরগিজ ডিফেন্ডার ড্যানিয়েল টেগোর পেনাল্টি গোলে ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে আনে চট্টগ্রাম আবাহনী। দ্বিতীয়ার্ধেও সব সুযোগ হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ড্রয়ে শেষ হয় তাদের লিগ অভিযান। ২৪ ম্যাচে ৬৩ পয়েন্ট নিয়ে লিগ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরে তারা। ৫৪ গোল করে খেয়েছে মাত্র ১৪ গোল! গোল কম খাওয়ার হিসাবেই তারা আসলে আবাহনীকে ছাড়িয়ে গেছে। ৫৮ পয়েন্ট নিয়ে রানার্স-আপ হওয়া আবাহনী ৬০ গোল করলেও হজম করেছে ২৮ গোল। গোল করে লিড ধরে রাখার সামর্থ্য কম আবাহনীর। তা ছাড়া লিগের দুটি ম্যাচেই তারা গতবারের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় আগেই। কিংসের কিরগিজ মিডফিল্ডার বখতিয়ার দুশোবেকভ মনে করেন ফিরতি লেগে আবাহনীকে হারানোটাই ছিল তাঁদের শিরোপার পথে বড় পদক্ষেপ, ‘বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আমার ফ্রি-কিক গোলে আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচটি জিতি। ওই ম্যাচ হেরে গেলে আমাদের জন্য শিরোপা কঠিন হয়ে যেত। ওই ম্যাচ জয়ে আমরা শিরোপার পথে এগিয়ে যাই অনেকখানি।’ তার আগে নীলফামারীতে প্রথম দেখায় তারা নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল গতবারের চ্যাম্পিয়নদের। সেই জয় দিয়ে আসলে তাদের মনে শিরোপা বিশ্বাসের সূচনা।

সেরাদের সম্মিলনে দল তৈরি করলেও তার ভেতরে শিরোপার বিশ্বাস সঞ্চার করাটা খুব জরুরি। টিম ম্যানেজমেন্ট, কোচ-কর্মকর্তারা মিলে এই কাজটি করেছেন খুব ভালোভাবে। তাই কোচ অস্কার ব্রুজোন এককভাবে কাউকে দিতে চান না এই কৃতিত্ব, ‘এটা একটি দলের সাফল্য, যেখানে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের পেছনে আছে কোচিং স্টাফ ও কর্মকর্তাদের দুর্দান্ত সাপোর্ট। নইলে প্রতিটি ম্যাচ একই স্পিরিটে খেলা যায় না, টানা জয়ের রেকর্ড করা যায় না। সবার ঐকান্তিক চেষ্টায় মৌসুমটি হয়েছে বসুন্ধরা কিংসের।’ টানা ১৪ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড গড়ে নতুন চ্যাম্পিয়নরা ভেঙেছে আবাহনীর ১১ জয়ের রেকর্ড। পুরো লিগে হেরেছে মাত্র একটি ম্যাচ, শেখ রাসেলের বিপক্ষে। এ ছাড়া তিনটি ড্র। শিরোপার প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকলে হয়তো শেষের দুটি ড্রও হতো না!

বসুন্ধরা কিংসের জন্ম মাত্র তিন বছর আগে। ২০১৬ সালে জন্ম নেওয়া এই দল গতবার চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ জিতে এবারই নাম লিখিয়েছে প্রিমিয়ারে। শুরুর বছরেই জায়ান্ট আবাহনীকে চ্যালেঞ্জ করে তিনটি শিরোপার দুটিই ঘরে নিয়ে কিংস হয়েছে অনন্য। স্টেডিয়ামপাড়ায় শুরু হয়েছে নতুন গুঞ্জনও—আবাহনীর দিন বুঝি ফুরিয়েছে! সেটা অবশ্য মনে করেন না কিংসের প্রেসিডেন্ট ইমরুল হাসান, ‘আবাহনীর অনেক ঐতিহ্য। আমরা মাত্র শুরু করেছি, পেশাদারিত্বের চর্চা করে আমরা এগোতে চাই। এবার যেমন কোনো কিছুরই ঘাটতি ছিল না দলে। প্রথমে ভালো খেলোয়াড় সংগ্রহ করেছি, ভালো কোচ এনেছি। এরপর ট্রেনিংয়ের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছি। এরপর দলে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি, যেন খেলোয়াড়রা একাট্টা হয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। এটাই হলো কিংসের সাফল্যের মূল রহস্য।’

তারা মৌসুমের শুরুতে আলোড়ন তোলে ড্যানিয়েল কলিনড্রেসকে এনে। এটাই ছিল সেরা হওয়ার পথে তাদের প্রথম বার্তা। এরপর তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছে নেতৃত্বের ভার, কোস্টারিকান এই নেতা দারুণ খুশি দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটিয়ে, ‘নতুন দলকে আমরা সবাই মিলে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছি। যেকোনো নতুন দলের জন্য এটা চ্যালেঞ্জিং, মাঠে খেলে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ জয় করেছি।’ তাই লিগের সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছেন এই বিশ্বকাপার। সেরা গোলদাতা শেখ রাসেলের রাফায়েল ওডোইন (২২ গোল)। সেরা গোলরক্ষক রাসেলের আশরাফুল ইসলাম রানা। সবচেয়ে কম গোল খাওয়া কিংসের আনিসুর রহমানের প্রতি যেন একটু অন্যায়ই করা হয়েছে। তবে সেরা কোচ কিংসের অস্কার ব্রুজোনই। পরের মৌসুমের চুক্তি সেরে এরই মধ্যে যিনি ঘোষণা করেছেন, ‘কেবল শুরু হয়েছে বসুন্ধরা কিংসের।’

সামনে যেন আরো অনেক সাফল্য অপেক্ষা করছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা