kalerkantho

এক অঙ্কে ব্যাংকঋণের সুদ

প্রজ্ঞাপনের বদলে চিঠি

জিয়াদুল ইসলাম   

১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রজ্ঞাপনের বদলে চিঠি

ঋণের এক অঙ্কের সুদহার বাস্তবায়নে আপাতত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো সার্কুলার জারি করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক চাচ্ছে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতেই ঋণের সুদহার কমে আসুক। এরই অংশ হিসেবে ঋণ ও আমানতের সুদহার কমানোর পরামর্শ দিয়ে সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আবারও চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ঋণের এক অঙ্কের সুদহার বাস্তবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হলো। 

গত বছরের জুলাই থেকে ব্যাংকের মালিকরা ঋণে সর্বোচ্চ ৯ এবং আমানতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ (নয়-ছয়) কার্যকরের ঘোষণা দেন। কিন্তু গত এক বছরেও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি তাঁরা। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ আগস্ট বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে বেসরকারি ৪০টি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘নয়-ছয়’ সুদহার বাস্তবায়নে শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বলছে, ‘নয়-ছয়’ সুদহার বাস্তবায়নে আপাতত সার্কুলার জারি করা হচ্ছে না। চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ঋণ ও আমানতের সুদহার বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকরা সরকারের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাঁদের আবারও নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ এ প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তাঁরা সরকার থেকে বেশ কিছু সুবিধাও নিয়েছেন। তাই সরকারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নয়-ছয় সুদহার বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আপাতত কোনো সার্কুলার জারি করা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও বেসরকারি ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নয়-ছয় সুদ বাস্তবায়ন নিয়ে সার্কুলার করবে কি করবে না, সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয়। তবে ঋণ ও আমানতের সুদহার কমানোর পরামর্শ দিয়ে ঈদের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমাদের একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

সূত্র জানায়, গত ৭ আগস্ট সব বেসরকারি ব্যাংকের এমডিদের বরাবর ওই চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, আমানত ও ঋণ বা বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুদহার হ্রাসের বিষয়ে অনতিবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আপনাদের পরামর্শ দেওয়া হলো। চিঠিতে ২০১৮ সালের ২ আগস্ট বর্তমান সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ঘোষিত ঋণ বা বিনিয়োগের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ এবং তিন মাস বা তার বেশি কিন্তু ছয় মাসের কম মেয়াদি আমানতের সুদহার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ বাস্তবায়নের বিষয়ে যে মতৈক্য হয়েছিল, সেই উদ্ধৃতিও তুলে ধরা হয়েছে।

এ বিষয়ে আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, নয়-ছয় সুদহার বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সার্কুলার না করার পেছনে অবশ্যই কারণ রয়েছে। সুদহার যখনই বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করে দেবে, তখন তা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সহজভাবে না নিয়ে এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়েও নিতে পারে। তা ছাড়া এটি জোর করে কমানো সম্ভব নয়। কারণ মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়া যায় না। চাহিদা এবং জোগানের ভিত্তিতেই সুদহার নির্ধারিত হয়। জোগান রেট তথা আমানতের সুদ যদি ৬ শতাংশ হয়, তবে চাহিদা তথা ঋণের সুদহারও ৯ শতাংশ করা সম্ভব। কিন্তু এখন ৬ শতাংশে কেউ আমানত রাখছে না। এমনকি সরকারি আমানতও ৬ শতাংশে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, ১০০ কোটি টাকার একটি আমানত রাখতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিলামের আয়োজন করে। ওই নিলামে সর্বোচ্চ সুদ প্রদানকারী ব্যাংককেই বেছে নেওয়া হচ্ছে। কাজেই আমানতের সুদ যতক্ষণ পর্যন্ত সহজলভ্য না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ঋণের সুদহারও ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

গত মাসে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায়ও ব্যাংকের এমডিরা দাবি করেন যে ৯ শতাংশে ঋণ বিতরণ করতে হলে তার আগে ৬ শতাংশে আমানত প্রয়োজন। সরকারি আমানত পেলে পর্যায়ক্রমে নয়-ছয় সুদ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সরকারি সংস্থার আমানত ৬ শতাংশে পেতে হলে আগেই ৯ শতাংশ সুদহার কার্যকর করতে হবে।

এর আগে গত জুলাই মাসে বিএবির ঘোষণা অনুযায়ী ঋণ ও আমানতের সুদহার হ্রাস করার পরামর্শ দিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের এমডিদের কাছে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

মন্তব্য