kalerkantho

কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ

২০০১-এর পর ঢাকায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো উদ্যোগ নেই

মেহেদী হাসান ও শাখাওয়াত হোসাইন   

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ

প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার লার্ভা খুঁজে বের করতে তৎপর প্রশিক্ষিত বাহিনী। লার্ভা ধ্বংস করার কাজে নিয়োজিত ১৬টি র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম। ভবনে বা আঙিনায় পানি জমা থাকলেই জরিমানা। হাসপাতালে বা রক্ত পরীক্ষাগারে ডেঙ্গু রোগীদের খোঁজ নিয়ে নিয়ে তাদের বাড়ি গিয়ে মশা ধ্বংস করার ব্যবস্থা আছে প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতার। তাই প্রায় একই ধরনের আবহাওয়া ও পরিবেশ থাকা সত্ত্ব্বেও ঢাকার মতো ডেঙ্গুর এত বিস্তার হয়নি কলকাতায়।

বাংলাদেশে দুই দশক আগে শনাক্ত হয়েছে ডেঙ্গু। তারও আগে পাওয়া যায় ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশার লার্ভা। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলকাতায় এডিস মশা পাওয়ার পর সেখানে কয়েক বছর ধরে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঢাকায় তা হয়নি। ২০০০ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর তা চলেছিল এক বছর। তখন এই মশা নিয়ন্ত্রণেও এসেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ তেমন কোনো ভূমিকাই রাখেনি।

এমন পরিস্থিতিতে কলকাতার মশা মারার অভিজ্ঞতা নিতে আগামীকাল রবিবার কলকাতার ডেপুটি মেয়র অনিক ঘোষসহ তাঁর পুরো মশক নিয়ন্ত্রণ দলের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মেয়র আতিকুল ইসলাম গতকাল শুক্রবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, অনিক ঘোষের আগামীকাল ঢাকায় আসার কথা থাকলেও তা বাতিল করা হয়েছে। তবে ভিডিও কনফারেন্সে তিনি যুক্ত হবেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা’র গুরুত্বপূর্ণ চারটি অস্ত্র হলো পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশক ও জনগণকে সম্পৃক্তকরণ। ঢাকায় এতদিন কেবল কীটনাশক দিয়েই মশা মারার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে কীটনাশক দিয়ে মশা মারার ব্যবস্থাটি ছিল পুরোপুরি কিউলেক্স মশাকেন্দ্রিক। এই পদ্ধতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, ‘‘আমরা সমন্বিত প্রক্রিয়ায় মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে গত মাসে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকও হয়েছিল। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা কোনো ‘রেসপন্স’ পাচ্ছি না।’’

জানা গেছে, সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কাজটি সিটি করপোরেশন এত দিন করেনি। গত মাসে বৈঠক করলেও অন্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে তেমন সাড়া পায়নি। তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর জনগণকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা শুরু করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।

অন্যদিকে মশার ওষুধের নমুনা পরীক্ষাও করা হয় মূলত কিউলেক্স মশার দিকে দৃষ্টি রেখে। মশা বা মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতন্ত্র কোনো গবেষণা বা পরীক্ষা নেই। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা স্ব উদ্যোগে কোনো গবেষণা করি না। তবে সিটি করপোরেশন মশার ওষুধের স্যাম্পল (নমুনা) পাঠালে আমরা শুধু ওই স্যাম্পলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করি।’

বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন। তাঁরা বলেছেন, বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মশক নিধনের যে কার্যক্রম চালু আছে তা মূলত কিউলেক্স মশা দমনে সক্ষম। এই পদ্ধতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এমনকি সিটি করপোরেশনগুলোতে মশক নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞও নেই। মশক নিয়ন্ত্রণে যাঁরা কাজ করেন তারা এডিস মশা চেনেন না, দমনেও অভিজ্ঞতা নেই।

মশার প্রজাতিগুলোর মধ্যে মূলত চারটি বিভিন্ন রোগের জীবাণু বহন করে। বাহক ওই প্রজাতিগুলো হলো—অ্যানোফিলিস, কিউলেক্স, এডিস ও হেমাগোগাস।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপনি যাকে মারতে চান তার দিকে বন্দুক তাক না করে যদি গুলি চালান তাহলে অন্যরা মারা যাবে। মশার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটিই। এডিস মশা মারতে গেলে ঠিক তার বাসস্থান লক্ষ্য করে কাজ করতে হয়। এটি ঢাকায় করা হচ্ছে না। এখানে মশক নিয়ন্ত্রণ অভিযান পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ কিউলেক্স মশাকেন্দ্রিক।’ তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের যে প্রচেষ্টা তা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অকার্যকর। ঢাকা শহরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কোনো কার্যক্রম নেই। এ কারণে এডিস মশা বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকা শহরে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে কার্যক্রম নেওয়া হয় সেটি শুধু কীটনাশকনির্ভর। কীটনাশক স্প্রে করা হয় ড্রেন, ডোবা ও রাস্তার ধারে। এগুলো কিউলেক্স মশার আবাসস্থল। অন্যদিকে এডিস মশার আবাসস্থল হলো মানুষের বাড়ি, বাড়ির চারপাশ ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন শুধু একটি অস্ত্রই ব্যবহার করে, সেটি হলো কীটনাশক। বাকি তিনটি অস্ত্রই (পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ও জনগণকে সম্পৃক্তকরণ) তারা ব্যবহার করে না। যদি চারটি অস্ত্রই ব্যবহার না করা হয় তবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ হবে না।

কবিরুল বাশার আরো বলেন, সিটি করপোরেশনের প্রশিক্ষিত দলই নেই যারা এডিস মশার লার্ভা বা পূর্ণাঙ্গ এডিস মশা চিনতে পারে। তারা কোথায় জন্মায় সেটিই হয়তো সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মীরা জানেন না। তাঁরা শুধু ড্রেন, ডোবা, নর্দমাই চেনেন। সেই জায়গাগুলোতেই তাঁরা মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমগুলো চালান। তিনি বলেন, ২০০০ সালে ঢাকায় এডিস মশা নজরদারির একটি টিম ছিল ১৪ জনের। তারা বাড়ি বাড়ি যেত। তারা এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব কোন জায়গায় কেমন আছে সে অনুযায়ী সেই মশাগুলো ল্যাবরেটরিতে নিয়ে সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হতো। ঘনত্ব নির্ধারণ করে সিটি করপোরেশনকে তথ্য দেওয়া হতো। সেই তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন তাদের কার্যক্রম চালাত। তখন পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। অথচ কলকাতা সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে অনেকটাই সফল হয়েছে।

এদিকে মশক বিশেষজ্ঞ ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, যথাসময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। প্রতিরোধ ব্যবস্থা গত মার্চ-এপ্রিল মাসে নিলেও পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাত না। তিনি বলেন, যথাসময়ে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব ছিল। কীটনাশকের ক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে কখন, কোথায়, কিভাবে তা প্রয়োগ করা হবে তার ওপর। যখন মাত্রা বেড়ে গেছে তখন এটি প্রয়োগ করলে তা যথার্থ ফল দেবে না।

ড. মো. আবদুল লতিফ বলেন, মশা নিয়ে তাঁদের গবেষণা বা সতর্কবার্তা সিটি করপোরেশনগুলো আমলে নেয় না। তাঁরা গবেষণা করে তা প্রকাশ করেন। সিটি করপোরেশন ইচ্ছা করলে সেগুলো থেকে তথ্য নিতে পারে। তবে সিটি করপোরেশনগুলোতে এমন লোক নেই যাঁরা কীটপতঙ্গ সম্পর্কে বোঝেন। সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে কীটপতঙ্গ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রাখা জরুরি।

 

মন্তব্য