kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

ডেঙ্গু পরীক্ষায় সংকট বানানো!

তৌফিক মারুফ   

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডেঙ্গু পরীক্ষায় সংকট বানানো!

শিশু হাসপাতালে জায়গা হয়নি। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুটিকে নিয়ে স্বজনদের যাত্রা অন্য কোনো হাসপাতালের উদ্দেশে। গতকাল তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকার রায় সাহেব বাজার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে নোটিশ ঝুলছে—রি-অ্যাজেন্ট সংকটের কারণে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ। ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে গিয়ে সেখান থেকে গত দুই দিন ধরেই ফিরে যাচ্ছে রোগীরা। অন্যদিকে মহাখালীর মেট্রোপলিটন হাসপাতালেও গতকাল পরীক্ষা করাতে গিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে রোগীদের। বরিশালের বেশ কয়েকটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে খোঁজ নিতে গেলে বলা হয়—ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার উপকরণ নেই, তাই পরীক্ষা হচ্ছে না। ময়মনসিংহে কোনো কোনো বেসরকারি ক্লিনিকেও একই সংকটের কথা জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংকটের কথা যতটা বলা হচ্ছে ততটা আসলেই নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করা হচ্ছে।

এদিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব গত মাসের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠছে চলতি মাসের প্রথম দুই দিনেই। গত দুই দিনে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা পৌঁছে গেছে তিন হাজার ৪০৫ জনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হারে বাড়তে থাকলে চলতি মাসের শেষে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জুলাই মাসে যা উঠেছিল ১৫ হাজার ৬৪৩ জনে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু ভাইরাস পরীক্ষার উপকরণের। সরকারি-বেসরকারি অনেক হাসপাতালেই পর্যাপ্ত উপকরণ নেই। ফলে পরীক্ষা করতে গিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে কিংবা এখানে ওখানে ঘুরে ঘুরে হন্যে হতে হচ্ছে রোগীদের। এতে করে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি উদ্বেগ।

জানা গেছে, ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে গত তিন-চার দিন দিন ধরে উপকরণ না থাকার অজুহাতে পরীক্ষা বন্ধ রেখেছে বিভিন্ন হাসপাতাল। তবে বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর পরীক্ষার উপকরণ না থাকার বিষয়টিকে কৃত্রিম সংকট বলে অভিযোগ তুলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেই।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা) ডা. আমিনুল ইসলাম গতকাল শুক্রবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপকরণের সংকট আছে ঠিক, তবে যতটা বলা হচ্ছে এত সংকট হওয়ার কথা নয়। আমার মনে হচ্ছে একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ নিচ্ছে। কারণ যেদিন সরকারিভাবে ডেঙ্গুর চারটি পরীক্ষার ফি হ্রাসকৃত হারে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে তার পরদিন থেকেই আমরা সংকটের কথা শুনতে পারছি। বিশেষ করে আগের দিন যে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তাদের পর্যাপ্ত উপকরণ থাকার কথা জানতাম সেসব প্রতিষ্ঠানও ওই দিন বিকেল থেকেই বলতে শুরু করেছে তাদের উপকরণ শেষ হয়ে গেছে। বিষয়টি আমরা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং র্যাবকে জানিয়েছি। সে অনুসারে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো যার যার মতো উদ্যোগও নিচ্ছে।’

অন্যদিকে ডায়াগনস্টিক রি-এজেন্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ কে এম কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব ক্ষেত্রেই অসাধু কিছু বিষয় থাকতে পারে, তবে আমরা সবাইকে জানাতে চাই এমন কোনো তৎপরতা কারো চোখে ধরা পড়লে কিংবা অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দিতে হবে। সেই সঙ্গে কেউ যদি সরকার নির্ধারিত ফির বেশি আদায় করে, সেটাও ধরিয়ে দেওয়া উচিত।’

ওই ব্যবসায়ী নেতা কারিগরি দিক তুলে ধরে বলেন, ‘প্রতি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা হাসপাতাল-ক্লিনিকে যদি ডেঙ্গুর কোনো টেস্টই না করতে পারার কথা বলে, তাহলে বুঝতে হবে সেই প্রতিষ্ঠান ঠিক বলছে না বা অসৎ কোনো কিছু আছে। কারণ এনএস-১-এর উপকরণ ঘাটতি আছে। কিন্তু ডেঙ্গু শনাক্তকরণের জন্য এনএস-১-ই একমাত্র মাধ্যম নয়, কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) থেকে চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে উপসর্গ ধরতে পারেন এবং চিকিৎসা শুরু করে দিতে পারেন। আর আমি খুবই নিশ্চিতভাবেই জানি যে দেশে সিবিসি টেস্টের উপাদান-উপকরণের কোনো সংকট নেই।’

রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমানও বলেন, ‘অন্য কোনো উপায় না থাকলে সিবিসি করেও উপসর্গগুলোর চিকিৎসা শুরু করা যায়, এতে খুব একটা সমস্যা হয় না। সিবিসিটা সিরিজ করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এবার যেভাবে একই সঙ্গে এনএস-১, আইজিজি, আইজিএম ও সিবিসি করতে দেওয়া হচ্ছে, সেটা ঠিক হচ্ছে না। এগুলোর প্রতিটি পরীক্ষার আলাদা ক্যারেক্টার আছে, সময়সীমা আছে, সেগুলো অনুসরণ না করলে ভালো রেজাল্ট আসবে না।’

প্যাথলজির অধ্যাপক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরো পরিস্থিতিই জটিল হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গু টেস্ট ও উপকরণ ঘিরেও শুরু হয়েছে নানা রকমের বাণিজ্য। এ ক্ষেত্রে যেভাবে উপকরণ সংকটের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে এত সংকট হওয়ার কথা নয়। এর পেছনে কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা তো থাকতেই পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোথাও এর নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না যে কত প্রয়োজন আছে আর কত ঘাটতি আছে। যে যার সুবিধামতো বলে যাচ্ছে, আবার বাণিজ্যের সুযোগও নিচ্ছে।’

ডেঙ্গু এনএস-১ পরীক্ষার উপকরণ সংকট মোকাবেলার বিষয়ে এ কে এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘সরকার আমাদের জরুরি ভিত্তিতে যে সুবিধা দিয়ে দিয়েছে, সেটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি পাওনা। আমরাও এর সদ্ব্যবহার করব। আমরা এরই মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে উপকরণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে কালকের মধ্যেই (আজ) প্রায় ৩০ লাখ উপকরণ ঢাকায় পৌঁছবে। আর আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় এক কোটি উপকরণ এসে যাবে। ফলে সাময়িক এ সংকট নিয়ে উদ্বেগের খুব একটা কারণ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগে আমরা একটি এনএস-১ টেস্টের উপকরণের দাম নিতাম ৪৫০ টাকা করে। এখন সরকার আমাদের ভ্যাট, ট্যাক্সসহ আরো কিছু ক্ষেত্রে যে ছাড় দিয়েছে, তাতে আমরা মাত্র ৩০০ টাকায় একেকটি উপকরণ দিতে পারছি। এর পরও ল্যাবগুলো প্রতিটি টেস্টে ২০০ টাকা লাভ করতে পারবে।’

অন্যদিকে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দুই দফা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছি, তাদের সব চাহিদা পূরণ করা হয়েছে। এর পরও কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করবে বলে আমার কাছে মনে হয় না। তবু আমরা সেদিকেও নজর রাখছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, কোনো কোনো চক্র দুইভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। একদিকে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো, অন্যদিকে আমদানিকারকরা। এ ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা কিন্তু সংকটের তীব্রতা দেখিয়ে বা এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে এরই মধ্যে সরকারের কাছ থেকে অনেকগুলো ব্যাবসায়িক সুবিধা নিয়ে নিল। অন্য সব ক্ষেত্রেও যে এমনটা হচ্ছে না, তা বলা যাচ্ছে না। আর আমদানিকারকরা যে সংকটের কথা বলছিল মাত্র এক দিনের মধ্যে এখন তারা এত বিপুলসংখ্যক উপকরণ কিভাবে আনছে? সরকার যত সুবিধা দিক না কেন, যে দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে সেখানে তো কিছুটা হলেও সময় লাগার কথা। তার মানে এর পেছনেও কোনো কিছু আছে কি না, সেটা দেখা দরকার।

ঢাকা বাইরে খোঁজ নিতে গেলে বরিশাল নগরের সাউথ অ্যাপোলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক ইদ্রিস মিয়া সবুর বলেন, ‘যে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়া যায়, তা হলো এনএস-১। আর সেই পরীক্ষা করার ডিভাইস আমাদের নেই। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমাদের কাছে ১০টি স্টিক ছিল। আমরা ১০ জনের টেস্ট করাতে পেরেছি। কিন্তু ডিভাইস না থাকার কারণে শুক্রবার টেস্ট করাতে পারিনি।’

ময়মনসিংহের স্বদেশ প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামসুদ্দোহা মাসুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিন দিন ধরে এনএস-১-এর উপকরণ সংকট থাকায় ডেঙ্গু পরীক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ২৩৫ জন। গতকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিল ছয় হাজার ৫৮২ জন। এর মধ্যে ঢাকার ৩৫টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি চার হাজার ৬১৩ জন। বাকি এক হাজার ৯৬৯ জন অন্যান্য বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। গতকাল নতুন করে রোগী ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৬৮৭ জন। আর এই সময় পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৪ জন।

 

মন্তব্য