kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

চার নেতার ছত্রচ্ছায়ায় রমরমা ক্যাসিনো

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চার নেতার ছত্রচ্ছায়ায় রমরমা ক্যাসিনো

ঢাকার স্পোর্টস ক্লাবগুলো ঘিরে কয়েক দশক ধরে রমরমা জুয়ার আসর বসানো হচ্ছে। তবে বছর চারেক আগে এই জুয়ার আসরগুলোকে ক্যাসিনোতে উন্নীতকরণ শুরু হয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় রাজধানীজুড়ে ক্যাসিনোর বিস্তার ঘটে। ওই নেতারাই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ক্যাসিনো পরিচালনা করে আসছিলেন। ঢাকার নামিদামি বেশ কয়েকটি ক্লাব, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমনটা জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূলত রাজধানীর মতিঝিল থানার বিভিন্ন এলাকার স্পোর্টস ক্লাবগুলোয় জুয়ার আসরকে ক্যাসিনোতে উন্নীত করার মূল উদ্যোক্তা হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্বাবধানেই ক্যাসিনো যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। এ কাজে সম্রাটের সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সদ্য বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো খোলা ও সেগুলো পরিচালনায় যুক্ত হন আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন নেতাও। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মোমিনুল হক সাঈদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সম্পাদক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্রাট যুবলীগের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। ২০১৬ সালের দিকে ঢাকায় তাঁর ক্যাসিনো কালচার শুরুর ঘটনা সবার জানা। কিন্তু নগদ অর্থের লোভে সবাই এত দিন মুখ খোলেননি। যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে সম্রাট অর্থ ও লোকজন দিয়ে সহযোগিতা করতেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একজন সহসভাপতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকার ক্লাবগুলোতে জুয়া খেলা চললেও ক্যাসিনো ছিল না। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী নেতারা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ক্যাসিনোর বিস্তার ঘটিয়েছেন।’

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ২০১৮-১৯ মেয়াদে কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি। এ ক্লাবে দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাসিনো পরিচালনা করা হয়।

মোল্লা কাওছার ক্লাবে তেমন যাতায়াত করতেন না। ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রণ করতেন কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদ। গত বুধবার ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে র‌্যাব অভিযান চালায়। ওই ক্লাব থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও ১০ লাখ টাকাসহ বিপুল পরিমাণ মদের বোতল উদ্ধার করা হয়। পাশের ইয়ংমেনস ক্লাবে অভিযানের খবর পেয়ে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সবাই পালিয়ে যায়। ওই ক্লাবের অন্যতম নিয়ন্ত্রক মোমিনুল হক সাঈদ মতিঝিল এলাকার ভয়ংকর ত্রাস হিসেবে পরিচিত। টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে মাদক কারবার—সবই নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া নিয়ন্ত্রণ করতেন ইয়ংমেনস, আরামবাগ ও মেরিনার্স ক্লাবসহ আরো কয়েকটি ক্লাব। তবে তাঁর গুরু ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। এসব ক্লাবের ক্যাসিনো থেকে সম্রাট প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা পেতেন। খালেদকে যুবলীগের রাজনীতিতে অগ্রভাগে আসার সুযোগ করে দেন সম্রাট। খালেদ একসময় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনির দল ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার। এরপর মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনের অস্ত্রবাজ হিসেবে এলাকার মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি। যুবলীগ দক্ষিণের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কূটচালে তারেকের হাতে ২০১৪ সালে খুন হন রিয়াজ আহমেদ মিল্কী। আবার তাঁদের সহযোগিতায় র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন তারেক। তারেক ও মিল্কীর অবর্তমানে ফাঁকা মাঠে নেতা বানানো হয় খালেদকে। ইসমাইল হোসেন সম্রাটের সহযোগিতায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন খালেদ মাহমুদ।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, ইসমাইল হোসেন সম্রাট সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনটি ক্যাসিনো। এগুলো হচ্ছে—মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, ব্রাদার্স ক্লাব ও বনানী এলাকার গোল্ডেন ঢাকা। এ ছাড়া মতিঝিল এলাকার ফুটবল ক্লাব আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, সোনালী অতীত, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ক্লাব ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ ছিল সম্রাটের হাতে। ওই ক্লাবগুলো মতিঝিল থানার এক কিলোমিটারের মধ্যে। স্থানীয় কতিপয় যুবলীগ নেতার মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হতো।

যুবলীগের একটি সূত্র জানায়, ইসমাইল হোসেন সম্রাটের হাত ধরে যুবলীগের রাজনীতি ও অপরাধজগতে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পেলেও এক বছর ধরে খালেদ নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। এরই মধ্যে তাঁর নিজস্ব বাহিনীও গড়ে উঠেছে। তবে এখনো সম্রাট থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। রাজধানীর মুগদা, শাহজাহানপুর, মতিঝিল, সবুজবাগ, খিলগাঁও ও রামপুরা এলাকার সব কটি সরকারি দপ্তরের টেন্ডারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল খালেদের হাতে।

ক্যাসিনো থেকে টেন্ডারবাজি পর্যন্ত খালেদের হয়ে নিয়ন্ত্রণ করতেন গোড়ান এলাকার কাউন্সিলর আনিসুর রহমান, যুবলীগ দক্ষিণের সদস্য খায়রুল, উজ্জল রাজু ও রইস। তাঁদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল খালেদ বাহিনী।

অপরাধজগতের নানা দিকেই বিচরণ যুবনেতাদের। টেন্ডারবাজি, মাদক কারবার থেকে ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করতেন দক্ষিণ যুবলীগের নেতারা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ক্রীড়া পরিষদ, রেল ভবন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, যুব ভবন, কৃষি ভবনসহ সরকারি দপ্তরগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ যুব ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের হাতে। একাধিক সূত্র জানায়, ক্যাসিনোর আয় থেকে শুরু করে টেন্ডারসহ নানা খাত থেকে আসা টাকার ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ক্যাশিয়ার ছিলেন যুবলীগ দক্ষিণের সহসভাপতি আরমান। তাঁর কাছেই বিভিন্ন খাতের টাকা জমা হতো। সম্রাটের নির্দেশেই ওই অর্থ খরচ হতো নানা পথে।

এ ছাড়া ইসমাইল হোসেন সম্রাটের হয়ে ক্যাসিনো থেকে টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া দেখাশোনা করেন ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মতিঝিল এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইদ, সহসভাপতি সোহরাব হোসেন স্বপন, সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী সরোয়ার হোসেন বাবু, সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মাকসুদ, সহসভাপতি মুরসালিন, মনির হোসেন, মনা ও রানা। যুবনেতাদের হয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন টেন্ডার শফি বা শিবির শফি এবং বিআইডাব্লিউটিএর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন মনির হোসেন।

গত বছরের শেষ দিকে সিঙ্গাপুরে ইসমাইল হোসেন সম্রাটের চীনা বান্ধবী সিন্ডি লির জন্মদিনে বড় আকারের একটি পার্টির আয়োজন করেন সম্রাট। জাঁকজমকপূর্ণ ওই পার্টিতে যোগ দিতে সিঙ্গাপুরে যান সম্রাটের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত যুবলীগ দক্ষিণের সহসভাপতি আরমান। সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল হক সাঈদ, শেখ সোহেল ও সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস মিজানুর রহমান।

সিঙ্গাপুরে ওই পার্টিতে যোগ দেওয়া গ্রুপটিই মূলত বাংলাদেশে ক্যাসিনোর প্রধান হোতা। তারা দেশে ক্যাসিনোর নিন্ত্রয়ক হলেও সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও দুবাইতে গিয়ে নিয়মিত জুয়া খেলত বলে যুবলীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন। 

মতিঝিলকেন্দ্রিক ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনো ছাড়াও রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর  ও উত্তরা এলাকায় দুটি ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করেন একজন আওয়ামী লীগ ও একজন যুবলীগ নেতা। ধানমণ্ডির কলাবাগান ক্লাবের ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করতেন সম্রাট। একসময় কলাবাগান এলাকার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বিরোধের কারণে ওই ক্যাসিনো বন্ধ হয়ে যায়। পরে ক্লাবটির সভাপতি ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুল আলম ফিরোজসহ ধানমণ্ডির স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ওই ক্যাসিনো চালু করেন। রাজধানীর উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে একটি ক্যাসিনো পরিচালনা করেন ঢাকা উত্তর যুবলীগের নেতা সরোয়ার হোসেন। মিরপুরের রূপনগর ও দুয়ারীপাড়া এলাকায় একাধিক স্থানে জুয়ার আসর বসিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। 

রাজধানীর মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্রে দীর্ঘদিন ধরে হাউজিসহ নানা জুয়া খেলা হতো। পরে  ক্লাবটিকে ক্যাসিনোতে উন্নীত করা হয়। ক্লাবটি পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা