kalerkantho

বিশাল হারে হোয়াইটওয়াশ

নোমান মোহাম্মদ, কলম্বো থেকে   

১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশাল হারে হোয়াইটওয়াশ

তামিম ইকবাল থেকে মাহমুদ উল্লাহ। অবিমৃশ্যকারিতা থেকে হঠকারিতা। দায়িত্বহীনতা থেকে বোধহীনতা। এবং সিরিজ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে শ্রীলঙ্কায় এসে বাংলাদেশের ০-৩ ব্যবধানে হেরে যাওয়া।

বাংলাদেশের ক্রিকেট-সূর্যকে অ্যান্টার্কটিকার নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য আর কী চাই!

অথচ ৫০ ওভারে প্রয়োজন ছিল মোটে ২৯৫ রান। তাহলেই কিছুটা মুখরক্ষা। তাহলেই জয়ীর বেশে না হলেও অন্তত জয়ের রেশ নিয়ে দেশে ফেরা। কাজটি কঠিন হয়তো, তবে অসম্ভবের চৌকাঠে মাথা কুটে মরার মতো কিছুতেই নয়। কিন্তু ব্যাটসম্যানরা যদি অমন আত্মহত্যার মিছিলে যোগ দেন, তাহলে কারোই কিছু করার থাকে না। ৩৬ ওভারে ১৭২ রানে অলআউট হয়ে কাল বাংলাদেশ তাই হেরে যায় ১২২ রানে।

কী জঘন্য সব আউট যে হন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা! কী অপ্রয়োজনীয়! তামিম ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই মারতে যান পেসার কাসুন রাজিথাকে। অফ স্টাম্পের বাইরের তাড়া করা বলে নেই কোনো ফুটওয়ার্ক। উইকেটরক্ষক কুশল পেরেরার ক্যাচ হয়ে ফেরেন ২ রানে। বিশ্বকাপের আট ম্যাচে এক ফিফটির পর শ্রীলঙ্কা সফরের তিন ম্যাচে তামিমের স্কোর ০, ১৯ ও ২।

দ্বিতীয় উইকেটটিও প্রথমটির মতোই অপ্রয়োজনীয়। এক বছর পর জাতীয় দলের একাদশে ফেরা এনামুল হক পর পর দুই বলে মারেন বাউন্ডারি। এরপর ফ্লিক করতে গিয়ে টাইমিংয়ের গড়বড়ে তুলে দেন ক্যাচ। তাঁর প্রত্যাবর্তনের গল্প ১৪ রানে থেকে যায় অণুগল্প হয়ে। মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে রানের ধারাবাহিকতা বিশ্বকাপজুড়ে। এ সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেও ৬৭ ও ৯৮*। সেই তিনিও কাল আউট কী দৃষ্টিকটুভাবে! শরীরের অনেক বাইরে থাকা দাসুন শানাকার বলে চালাতে গিয়ে প্রথম স্লিপে ক্যাচ দেন মুশফিক (১০)। এই পেসারের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে পুল করতে গিয়ে ফাইন লেগে মৃত্যুঘণ্টা বাজে মোহাম্মদ মিঠুনের (৪)।

এবং মাহমুদ উল্লাহ। জাতীয় দলে এক যুগের বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছেন। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে তিন শর ওপর ম্যাচ খেলা সারা। তবু ২৯৫ রান তাড়া করতে নেমে ৬০ রানে চার উইকেট পড়ে গেলে ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ কেমন হওয়া উচিত, গুলিয়ে ফেলেন মাহমুদ উল্লাহ। তাইতো শানাকার অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের বলটি তাড়া করতে যান। স্লিপ থাকলেও গা করেন না। তাঁর ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় পেছনে। ঝাঁপিয়ে এক হাতে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন কিপার পেরেরা। কিন্তু সেটি তো আর মাহমুদ উল্লাহর হঠকারিতার দায়মুক্তি নয়।

দায়মুক্তি নেই এই পঞ্চকের কারো। প্রথম পাঁচ উইকেটের পাঁচটিই তো এড়ানো যেত। কোনোটিতেই ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার চেয়ে বোলারদের কৃতিত্ব বেশি নয়। তামিম থেকে মাহমুদ উল্লাহ—প্রত্যেকের যেন বাড়ি ফেরার তাড়া। যেন আজ সকালের ফ্লাইটে নয়, কাল রাতে প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম থেকেই সরাসরি বিমানবন্দরে পৌঁছতে হবে।

এসবের যোগফলে ২০ ওভারে ৮৬ রানে পাঁচ উইকেট হারানোর পর ম্যাচে আর কিভাবে থাকে বাংলাদেশ!

নিজেকে কিছুটা দুর্ভাগা ভাবতে পারেন সৌম্য সরকার। বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ১০ ম্যাচে তাঁর ফিফটি ছিল না। কাল একাদশে ফেরা এনামুলকে জায়গা দিতে তিন নম্বরে নেমে যেতে হয়। এরপর সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মিছিলেও খেলেন ৮৬ বলে ৬৯ রানের ঝকঝকে ইনিংস। পাঁচটি চার ও এক ছক্কায় ঠিকরে বেরোয় রাজসিকতা। অন্যদের ব্যর্থতা যেন আরো প্রকট তাতে। আরো বেশি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তাইজুল ইসলামের ইনিংসে। ৯ নম্বরে নেমে ২৮ বলে অপরাজিত ৩৯ রান করেন তিনি, পাঁচটি চার এবং এক ছক্কার মালায়। যদিও দলে তাঁর দায়িত্ব মূলত বোলার হিসেবে।

মূলত ব্যাটসম্যান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্তরা যে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছেন আগেই!

সে পলায়নপর মনোবৃত্তি বাংলাদেশের বোলিং-ফিল্ডিংয়েও। যথারীতি নির্বিষ বোলিং। ওয়ার্মআপে ইনজুরির দোহাই দিয়ে মুস্তাফিজুর রহমানকে একাদশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হলেও কাল আসলে বাদ দেওয়া হয়েছে এই বাঁহাতি পেসারকে। ক্যারিয়ারে এই প্রথম ফর্মের কারণে একাদশ থেকে ছিটকে গেলেন মুস্তাফিজ। তাতেও কি বোলিংয়ে ধার ফেরে! পরিবর্তন হয়নি শিশুতোষ ফিল্ডিংয়ের ছবিটাও। অর্ধ-পূর্ণ মিলিয়ে কালও গোটা পাঁচেক ক্যাচ পড়েছে। ইনিংস সর্বোচ্চ ৮৭ রান করা অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজই তো জীবন পান দুবার। ৩১ রানের সময় শফিউল ইসলামের বলে মুশফিকুর রহিম ফেলেন ক্যাচ; এরপর ৬৩ রানের সময় মেহেদী হাসান মিরাজের বলে সাব্বির রহমান।

তবু ৪০ ওভার শেষে শ্রীলঙ্কার রান তিন উইকেটে ১৮৮-র বেশি নয়। কিন্তু শেষ ১০ ওভারে তো তুলে নেয় ১০৬ রান। এ ঠিক শফিউল ইসলামের মতোই। নিজের প্রথম সাত ওভারে মাত্র ২৭ রান দেন ওই পেসার। শেষ তিন ওভারে ৪১ রান দেওয়ায় অবিন্যস্ত হয়ে যায় তাঁর বোলিং বিশ্লেষণ। ঝড়ের পাখির মতো আলুথালু হয়ে যায় বাংলাদেশও। অবশ্য তামিমের দলের আলাদা করে আর এলোমেলো হওয়ার বাকিই বা ছিল কী!

নেই বলেই প্রথম ওয়ানডেতে মাঠের লাসিথ মালিঙ্গার বিদায়ী ম্যাচে পারেনি। উপলক্ষহীন দ্বিতীয় ম্যাচেও না। কাল মাঠের বাইরে থাকা নুয়ান কুলাসেকারার বিদায়ী খেলায়ও ব্যর্থ লাল-সবুজ।

শ্রীলঙ্কা সফরের এই বাংলাদেশ তাই হতে পারে ক্রিকেট পাঠশালার দারুণ এক উদাহরণ। কিভাবে ক্রিকেট খেলতে হবে, সে পাঠে নয়। কিভাবে ক্রিকেট খেলা উচিত নয়, সে উদাহরণে!

 

মন্তব্য