kalerkantho

হাসপাতালে অচলাবস্থা

ডেঙ্গু পরীক্ষার রি-এজেন্ট সংকট লোকবলও কম

তৌফিক মারুফ   

৩১ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডেঙ্গু পরীক্ষার রি-এজেন্ট সংকট লোকবলও কম

রি-এজেন্টের অভাবে সোমবার ডেঙ্গু শনাক্তকরণে এনএস-১ টেস্ট বন্ধ ছিল দেশের ঐতিহ্যবাহী ও ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো হাসপাতালের বারান্দায়ও ঠাঁই মিলছে না। ডেঙ্গু রোগীদের দিকে বেশি নজর দেওয়ার ফলে হাসপাতালগুলোতে অন্য রোগীদের চিকিৎসায়ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু মোকাবেলায় হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি এবং সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার হাসপাতালগুলোতে ফ্রি পরীক্ষার সুযোগে উপসর্গ ছাড়াও কৌতূহলী মানুষের রক্ত পরীক্ষার প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে রি-এজেন্টের সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া পরীক্ষার কাজে প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতিও চোখে পড়েছে বিভিন্ন হাসপাতালে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের মূল সময় এখনো প্রায় এক মাস বাকি। আগের রুটিন অনুসারে যতবার বাংলাদেশে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে ততবারই তা ছিল আগস্ট থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং এ থেকে মৃত্যু—দুই-ই বাড়ে। তবে আগের সব প্রাদুর্ভাবের সময়, ধরন ও রেকর্ড ছাপিয়ে এবার মৌসুমের শুরুতেই দেশজুড়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। এর আগে ঢাকার বাইরে সারা দেশে এমনভাবে আর কখনোই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়নি। এমন পরিস্থিতির আগাম পূর্বাভাস ও সতর্কতা দেওয়া ছিল খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেই। এমনকি গত মার্চ মাসে ঢাকায় এডিস মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণেও এমন আশঙ্কা করা হয়েছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে সতর্ক থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকেও প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল চিকিৎসকদেরও। পাশাপাশি নানাভাবে সচেতনতা ও প্রচার-প্রচারণাও চলতে থাকে। তবে এর ফাঁক গলেই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে এবং একই সঙ্গে গলদ থেকে যায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায়। বিশেষ করে আশঙ্কা অনুসারে যেমন আগেভাগে কোনো হাসপাতালে সেল বা আলাদা কোনো ওয়ার্ড চালু বা বাড়তি বেডের ব্যবস্থা রাখা হয়নি, তেমনি ডেঙ্গু পরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ-উপাদানও পর্যাপ্ত পরিমাণে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি কোনো হাসপাতাল। যার পরিণতিতে গত কয়েক দিনে ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ব্যবস্থাপনায় নানা দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে গিয়ে ফিরে আসছে কিংবা এক প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটতে হচ্ছে আরেক প্রতিষ্ঠানে। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করতে না পারায় মানুষকে ছুটতে হচ্ছে প্রাইভেট হাসপাতালে। আবার একসঙ্গে বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তির কারণে যেমন বেড সংকট তৈরি হয়েছে তেমনি বেশি পরিমাণে পরীক্ষার কারণে রি-এজেন্টের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যা নিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্বপ্রস্তুতিতে গলদ থাকার কারণেই এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে মানুষ।

যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা সম্পূর্ণ ফ্রি করে দেওয়ার ফলে যারা প্রাইভেট হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে সরকার নির্ধারিত হ্রাসকৃত ফি দিয়ে পরীক্ষা করাতে আর্থিকভাবে সচ্ছল—তারাও ফ্রি সুবিধা নেওয়ার আশায় সরকারি হাসপাতালে ভিড় করছে। এতেও এই বাড়তি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া যেদিন আমরা সরকারি হাসপাতালে ফ্রি আর বেসরকারিতে ফি কমিয়ে দিয়েছি, তার পরদিন থেকেই রি-এজেন্টের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে একটি চক্র। বিষয়টি আমরা এরই মধ্যে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে অবহিত করেছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যেই সংকট কেটে যাবে।’

বেড সংকটের ব্যাপারে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য আগাম আলাদা অবকাঠামো বা বাড়তি বেডের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তবু আগে থেকে আমরা প্রতিটি হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলাম। ঢাকায় কিন্তু এ কারণে শুরুর দিকে তেমন সমস্যা হয়নি। যখন রোগীর ঢল নামতে শুরু করে তখনই কোথাও কোথাও সংকট দেখা দেয়।’

ডেঙ্গু শনাক্তকরণ উপরকরণ সংকট বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) রুহুল আমিন জানান, পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েই আজ (গতকাল) ডেঙ্গু শনাক্তকরণের কিট এবং রি-এজেন্ট আমদানি ও সরবরাহ এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহূত প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি বৈঠক হয়েছে। এ বৈঠকের পরপরই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয় ডেঙ্গু শনাক্তকরণে ব্যবহার্য রি-এজেন্ট, কিট উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে এনবিআরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গুর পিক সিজন মোকাবেলার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এ জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি অন্যদের দায়িত্বপালন করতে হবে। কারণ পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে গেছে এবং সামনে যেতে পারে সেটা সামলে নেওয়া খুবই কঠিন।’

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আব্দুর রশিদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হঠাৎ বেশি রোগীর চাপে মজুদ থাকা রি-এজেন্ট শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে আজ (গতকাল ) আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে রি-এজেন্ট সংগ্রহ করেছি। আশা করছি সংকট থাকবে না।’

মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. খাইরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এখানে এখন যে পরিমাণ উপাদান-উপকরণ আছে তাতে আরো প্রায় আড়াই হাজার মানুষের ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা যাবে। তবে এখন বড় সংকট দেখা দিয়েছে জনবলের। কারণ একসঙ্গে এত রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয়সংখ্যক টেকনোলজিস্ট আমাদের নেই। তাই সময় বেশি লাগছে, তাতে মানুষ ধৈর্যহারা হচ্ছে।’

প্রায় একই কথা বলেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সফি আহম্মেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে তথ্য দিয়ে জানান, আজ (গতকাল) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ৯২ জনের পরীক্ষা করে মাত্র ১০ জনের ডেঙ্গু পজিটিভ পাওয়া গেছে। অন্যদের হয়তো জ্বর আছে; কিন্তু সেটা ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা অন্য কোনো কারণে হতে পারে।

এদিকে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টি সেন্টারে সরকার নির্ধারিত কম ফিতে পরীক্ষার সুযোগ নিয়ে বড় বড় হাসপাতালেও বাড়ছে ভিড়।

ল্যাব এইড হাসপাতালের মিডিয়া পরিচালক কামরুল হাসান লেনিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের অনেক সেন্টারেই রি-এজেন্টের সংকট দেখা দিয়েছে। রি-এজেন্ট কিনতে গিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও দামও বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে।’

এক মাসে ১৩ হাজার ১৮২ জন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুসারে, গতকাল সোমবার সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৩৩৫ জন। গত ৩০ দিনে (জুলাই মাসে) ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ১৮২ জন (আগের মাসে যা ছিল মাত্র ১৮৬৩ জন) এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় ১৫ হাজার ৩৬৯ জন। এর মধ্যে ১০ হাজার ৯৯৩ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। বাকি চার হাজার ৪০৮ জন বিভিন্ন হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিল। গতকাল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৯৭৪ জন আর ঢাকার বাইরের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৬১ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যালে—২২১ জন।

 

 

মন্তব্য