kalerkantho

দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রী

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজ স্থান থেকে ভূমিকা রাখুন

► গুজবে কান দেবেন না, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না
► দুধ বিতর্কের পেছনে কারসাজি কি না সন্দেহ সরকারপ্রধানের

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩১ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজ স্থান থেকে ভূমিকা রাখুন

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে যার যার অবস্থানে থেকে সক্রিয় হওয়ার এবং মশার বংশবিস্তার রোধে বাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার লন্ডন থেকে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকায় আওয়ামী লীগের বিশেষ জরুরি বৈঠকে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বিএসটিআই নিবন্ধিত পাস্তুরিত দুধে ‘মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান’ থাকার অভিযোগের পেছনে আমদানিকারকদের কারসাজি আছে কি না, সেই সন্দেহও প্রকাশ করেছেন তিনি।

ডেঙ্গু প্রসঙ্গে দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সবাইকে আহ্বান করব, নিজের ঘরবাড়ি, আশপাশের রাস্তাঘাট যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, সে ব্যাপারে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সবাই যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, তাহলে আমরা এখান থেকে রক্ষা পেতে পারব।’

বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বিশেষ জরুরি বৈঠকের শুরুতেই দলের সভাপতি শেখ হাসিনা টেলিকনফারেন্সে বলেন, ‘ইদানীং একটি উপদ্রব দেখা দিয়েছে—ডেঙ্গু। ডেঙ্গু জ্বরটা যখন শুরু হয়, তখন আমরা দেখেছি, বিশেষ করে শহর এলাকায়, ঢাকা শহরে এর বিস্তার ছিল। তবে এটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সামনে কোরবানির ঈদের সময় মানুষ বাড়িতে যাবে। যারা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে বা যাদের শরীরে এই বীজটা রয়ে গেছে, তারা আবার নিজ নিজ এলাকায় গেলে পরে সেখানে যদি মশা কামড় দেয়, তাহলে হয়তো অন্য কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।’

সে জন্য সবাইকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার নিজ নিজ ঘরবাড়ি, কাপড়চোপড় যেগুলো অলনায় ঝোলানো থাকে, বাক্সে বা আলমারিতে থাকে; সেগুলো পরিষ্কার রাখা, ঘরের সকল কোনা, সব কিছু পরিষ্কার করে রাখা।’

এডিস মশা বংশ বিস্তার করে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে। সে কারণে বৃষ্টির পানি যেন কোথাও জমে না থাকে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এডিস মশা বেশির ভাগ সময় পায়ের দিকে কামড়ায়। সে কারণে পা ঢেকে রাখতে হবে, ঘুমানোর সময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে।’

ডেঙ্গুর বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সহযোগী সংগঠনকে আহ্বান জানাব, আমাদের কর্মীরাও যেন মাঠে নেমে পড়ে।’

ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী থেকে শুরু করে সব ধরনের সংগঠকে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এয়ারকন্ডিশনের পানি, ফ্রিজের পানি, ফুলের টব বা ফুলদানির পানিসহ টায়ার, ভাঙা হাঁড়িতে পানি জমে থাকে। সবাইকে পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া দরকার।’

পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকার দুই মেয়রের সঙ্গে কথা বলে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সকলকে বলব, মশা যেন ডিম পাড়তে না পারে, মশার লার্ভা যেন তৈরি না হয়, বংশ বিস্তার করতে না পারে। এটা প্রত্যেকটি মানুষকে নিজেকেই করতে হবে, এটাই বাস্তবতা।’

সাংবাদিকদেরও এ বিষয়ে সচেতন থাকার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়, সে জন্য নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। পাশাপাশি এটাও দেখতে হবে যে সকলে যেন সাবধান থাকে। কর্মস্থলে মশা যেন কামড়াতে না পারে, বংশ বিস্তার করতে না পারে।’

‘গুজবে কান দেবেন না’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দয়া করে কেউ গুজবে কান দেবেন না এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না, বরং যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের পুলিশে সোপর্দ করুন।’ তিনি বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গুজব ছড়িয়ে একজন মাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল, আজ সেই মায়ের শিশুটির কী অবস্থা? কাজেই সকলের কাছে আমার আবেদন, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। যদি আপনারা কাউকে দোষী মনে করেন, তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার দরকার নেই, বরং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিন।’

শেখ হাসিনা বলেন, তদন্তে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। গুজব শুনে কোনো নিরপরাধ মানুষকে মেরে ফেলা গর্হিত কাজ, এটা হত্যাকাণ্ডের শামিল। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে জনগণকে বিভ্রান্ত না করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কাছে আমার একটা অনুরোধ, প্রকৃত ঘটনা না জেনে সংবাদ পরিবেশন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না।’

‘দুধ নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করলে আইনগত ব্যবস্থা’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি লক্ষ করলাম, হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই, দুধ পরীক্ষা করে একজন বলে দিল যে দুধ ব্যবহারযোগ্য নয়। সঙ্গে সঙ্গে রিট করা হয়। সে কারণে বলে দেওয়া হয়, পাঁচ সপ্তাহ দুধ ব্যবহার করা যাবে না বা পাস্তুরিত করা যাবে না।’

সরকার যখন দুধের খামার করে গ্রামের মানুষকে স্বনির্ভর হতে উৎসাহিত করছে, পাশাপাশি দেশের চাহিদা মিটিয়ে খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে জোর দিচ্ছে, তখনই হঠাৎ একেকটা তথ্য দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির পথে কেন বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে—সেই প্রশ্ন রাখেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এখানে আমার মনে হচ্ছে আমদানিকারক যারা, তাদের কোনো কারসাজি আছে কি না, এটাও দেখা উচিত বা তারা কোনোভাবে উৎসাহিত করছে কি না।’

দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি নিয়ে ‘গুজব ছড়িয়ে’ রপ্তানিকাজে সমস্যা সৃষ্টি করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যারা এই বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত দেন, তাঁদেরও ভাবা উচিত, ভেবে দেখা উচিত যে হঠাৎ একটা কথা বলে গুজব ছড়িয়ে আমাদের রপ্তানিকাজে সমস্যা সৃষ্টি করা, দেশের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাক...এই আতঙ্ক সৃষ্টি করা বা দেশে উৎপাদিত পণ্যের মান সম্পর্কে কথা বললে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। কাজেই এসব বিষয় ভালোভাবে জেনে তথ্য নিয়ে ব্যবস্থা করা উচিত। তবে গুজব যারা ছড়াবে বা এ ধরনের মিথ্যা তথ্য দিয়ে যারা বিভ্রান্ত করবে, তাদের ওপর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দুধে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে যেসব বক্তব্য এসেছে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা মনে রাখতে হবে, আমরা গ্রামের মা-বোনদের, মেয়েদের, গ্রামের মানুষকে উৎসাহিত করছি, সারা বাংলাদেশে দুধের খামার গড়ে তুলছি। আমরা খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছি। আমরা মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘দুধ একটা পুষ্টিকর খাদ্য; আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা যেন এই দুধটা খেতে পারে, আমাদের দেশের মানুষও যেন এই দুধ ব্যবহার করতে পারে তার ব্যবস্থা আমরা করছি। আমাদের খাদ্যদ্রব্য এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য যথাযথভাবে যাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, সে জন্য আমরা উন্নত মানের পরীক্ষাগার করে দিয়েছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রতিটি খাদ্যপণ্য যাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষা করে বাজারজাত করা হয়, সে ব্যবস্থা সরকার করে দিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে একজন প্রফেসর তাঁর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একটা কথা ছড়িয়ে দিয়ে, এই যে একটা রিট করা এবং একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে আসা...এর প্রকৃত ফলাফলটা কী হবে সেটা তো কেউ চিন্তা করেন না। কারণ এই যে দুধটা বিক্রি করে যে মানুষটা তার জীবিকা নির্বাহ করে, গরুর দুধ বিক্রি করে ওই গরুর খাবার জোগাড় করা হয়। যাঁরা এই খামার করেছেন, যাঁরা গরু পালন করছেন, যাঁদের কাছ থেকে দুধ কেনা হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচনেও আমরা মানুষকে গরু কিনে দিই। এই মনুষগুলো যদি দুধটা বিক্রি করতে না পারে, অর্থ জোগাড় করতে না পারে তাহলে গরুকেই বা কী খাবার দেবে, আর নিজেরাই বা কিভাবে চলবে। এই বাস্তবতাটা চিন্তা করা একান্তভাবে দরকার।’

দেশে যেসব বিদেশি দুধ আমদানি করা হয়, সেগুলোও পরীক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি না, যিনি আমাদের দেশের দুধ পরীক্ষা করেছেন, তিনি এই বিদেশ থেকে আমদানীকৃত গুঁড়া দুধগুলো পরীক্ষা করেছেন কি না। আমার তো মনে হয় তিনি এটা কখনো করেন নাই। আমি অনুরোধ করব, তিনি যেন যে দুধগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে, বাজারজাত করা হচ্ছে, প্যাকেটজাত করা হচ্ছে, সেগুলো যেন পরীক্ষা করে দেখেন। আমরা আমদানিনির্ভর থাকতে চাই না। আমরা স্বনির্ভর হতে চাই।’

গরুর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে দুধে তা থাকতেই পারে—এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি গরু যদি রোগাক্রান্ত হয়, তাহলে তাকে তো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াতেই হয়, তার দুধে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যেতেই পারে। কোনো মা যদি অসুস্থ হয়, কেউ যদি অ্যান্টিবায়োটিক নেয়, তাহলে মায়ের দুধেও অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যেতে পারে। সেটা নিশ্চয় শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়।’

শেখ হাসিনা বলেন, বাজার থেকে কেনা দুধের প্যাকেটে মেয়াদ লেখা থাকে, কত দিন তা ভালো থাকবে। প্রিজারভেটিভ দেওয়া হয় বলেই তা ভালো থাকে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা