kalerkantho

বিশেষজ্ঞ মত

ফগার মেশিন দিয়ে উড়ন্ত মশা মারতে হবে

ড. কবিরুল বাশার

৩০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফগার মেশিন দিয়ে উড়ন্ত মশা মারতে হবে

অপরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে এডিস মশার সুন্দর একটা সম্পর্ক আছে। এডিস ইজিপটাই মশাকে গৃহপালিত মশা হিসেবে ধরা হয়। ইংরেজিতে একে ডমিস্টিক মসকিউটো বলা হয়। যে মশা ঘরের আশপাশে থাকতে পছন্দ করে, বিশেষ করে বাড়ির পাশে, বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে। ১৯৫৩ সালের পর চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই অসময়ের বৃষ্টি এডিস মশার বংশবিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। এডিস মশার ডিম ধানের বীজের মতো শুকনা অবস্থায় ছয় মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। নষ্ট হয় না। আগের বছরের ডিম অর্থাৎ গত বছরের অক্টোবর মাসে এডিস মশা যে ডিম ছেড়েছে চার মাস পর ফেব্রুয়ারিতে যখন অসময়ে বৃষ্টির পানি পেয়েছে তখন এডিস মশার গ্রুপ অব ইজিপটাই ঢাকা শহরে তৈরি হয়ে গেছে। এবার ডেঙ্গু যে মহামারি আকার ধারণ করেছে এর পেছনে ফেব্রুয়ারি মাসের বৃষ্টি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আর মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুনে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। অন্যদিকে এডিস মশার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ডেঙ্গু ভাইরাস সর্বত্র ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ঢাকাসহ দেশজুড়ে বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজের সাইটগুলোতে চৌবাচ্চা, ড্রামে রাখা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসেই বলেছিলাম, ‘এ বছর ডেঙ্গু অনেক বেশি হবে। এর একটি বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে। মার্চ-এপ্রিল মাসে যখন থেমে থেমে বৃষ্টি হলো, তখন এডিস মশার বিস্তার বা সংখ্যাটা বাড়তে থাকল। ডেঙ্গু ভাইরাস প্রতিবছরই কমবেশি ছিল। এবার এডিস মশার ঘনত্ব অনেক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।’

আমাদের যা করণীয়

আমাদের দেশে যখন পর্যন্ত না আমরা বিপদে পড়ি, তখন পর্যন্ত সক্রিয় হই না। এটি সব ক্ষেত্রেই। আগে থেকেই আমাদের এ নিয়ে একটা চূড়ান্ত পরিকল্পনা দরকার ছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যখন জানা গেল, ডেঙ্গু নিয়ে এ রকম একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, তখনই একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি ছিল। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি সিটি করপোরেশনের হাতে। জুন-জুলাই মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হলে তা কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে আগেই সিটি করপোরেশনের উচিত ছিল এ নিয়ে একটি চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা, কিন্তু তা করা হয়নি। আর সিটি করপোরেশনের এক্সপার্টাইজারেরও অভাব আছে। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য এনটোমোলজিস্ট বা কীটতত্ত্ববিদের দরকার। সিটি করপোরেশনে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই।

বর্তমান পরিস্থিতিটা একটা ক্রাইসিস। এই ক্রাইসিস পরিস্থিতিতে কমপ্লিট যুদ্ধে নামতে হবে। এই যুদ্ধে শুধু সিটি করপোরেশনের লোকই নয়, সর্বস্তরের জনগণকেও অংশ নিতে হবে। এডিস মশা যেহেতু বাড়িতে হয়, সেহেতু সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণকে কাজ করতে হবে। নগরবাসী সচেতন না হলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সিটি করপোরেশনকে ক্রাশ প্রগ্রাম নিতে হবে। যে মশা উড়ন্ত অবস্থায় আছে, যে মশা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করছে, সেগুলোকে মারতে হবে। আগে যেভাবে রাস্তা, ড্রেনে স্প্রে করা হতো সেখানে স্প্রে করলেই হবে না, মানুষের ঘরবাড়ির ভেতরে ঢুকে, বাড়ির চারপাশে স্প্রে করতে হবে। এভাবে ইনফেক্টেড মশাটা মারতে হবে। আর জনগণের কাজ হচ্ছে, প্রত্যেকে তার বাড়ির চারপাশে পরীক্ষা করে দেখবে। যদি ঘরে বা বাড়ির চারপাশে কোথাও পানি জমে থাকে, দেখতে হবে সেখানে পোকা হচ্ছে কি না। যদি পোকা হয় সেটা উল্টে দিতে হবে। যদি যেকোনো দিন সকাল বেলা নগরবাসী একযোগে আধাঘণ্টা সময় ব্যয় করে তার বাড়িটা একটু পরীক্ষা করে, তাহলে ফিফটি পারসেন্ট মশা ধ্বংস হয়ে যাবে এমনিতেই। আর সিটি করপোরেশন যদি উড়ন্ত মশা মারতে ক্রাশ প্রগ্রাম চালায়, দরকার হলে লোক ভাড়া করে, তাহলে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। আরো বেশি ফগার মেশিন কিনে উড়ন্ত মশা মারতে হবে।

ভাবনার বিষয় হলো, ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে ডেঙ্গু। কারণ এডিস মশা সব শহরেই আছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভাইরাস এক শহর থেকে আরেক শহরে নিয়ে যায়। সেখানে এডিস মশা রয়েছে। সবচেয়ে বড় ভাবনার বিষয়, সামনে ঈদে। এ সময় নানা শ্রেণি-পেশার লোকদের বড় একটা অংশ ঢাকা থেকে অন্য শহরে যাবে। ফলে এখনই সব মেয়রকে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। না হলে ঢাকা থেকে ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন শহরে গিয়ে ভাইরাস ট্রান্সপ্রিট করবে। কারণ সেখানেও এডিস মশা রয়েছে। সুতরাং দেরি না করে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। 

লেখক : কীটতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুলিখন : শুভ আনোয়ার

মন্তব্য