kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

রিফাত-মিন্নি ‘বিরোধ’ শুধুই জবানবন্দিতে

এস এম আজাদ, বরগুনা থেকে ফিরে   

২৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রিফাত-মিন্নি ‘বিরোধ’ শুধুই জবানবন্দিতে

দেশব্যাপী আলোচিত বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মিন্নি বলেছেন, বন্দুকযুদ্ধে নিহত আসামি নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ হেলালের মোবাইল ফোনসেট ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রিফাত শরীফ। ওই ফোনটি ফিরিয়ে দিতে মিন্নিকে দিয়ে রিফাতকে চাপ দেয় নয়ন। রিফাত এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মিন্নিকে মারধর করেন। মিন্নি এরপর নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করে রিফাত শরীফকে ‘শিক্ষা’ দিতে বলেন।

তবে হেলালের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বড় ধরনের ঝগড়ার ঘটনা ঘটেনি বলে কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করেছেন মিন্নি ও রিফাতের মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা বলছেন, তেমন বড় কিছু হলে সবাই জানত। নয়নের মা-ও আগে রিফাত-নয়নের মধ্যে এমন বিরোধের কথা শোনেননি বলে জানান। আর হেলালের স্ত্রী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বোন দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে প্রকাশ্যেই হেলালের মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন রিফাত। হেলালের মায়ের অনুরোধে ওই দিনই পৌর মার্কেটে ফোনটি ফেরত দেন। এ নিয়ে নয়ন ও মিন্নিকে জড়িয়ে কোনো বিরোধের কথা মিথ্যা বলে তাঁরা দাবি করছেন।

গত ১৯ জুলাই (শুক্রবার) বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সিরাজুল ইসলাম গাজীর খাসকামরায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন মিন্নি। ওই জবানবন্দিতে হেলাল নামের এক যুবকের মোবাইল ফোন ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে মিন্নির সঙ্গে রিফাতের ঝগড়া এবং তাঁকে মারধরের পর ‘শিক্ষা’ দেওয়ার তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।

গতকাল সোমবার নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বক্তব্য প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, “জুনের ৩ তারিখে নয়ন বন্ড গ্রুপের সদস্য হেলালের মোবাইল ফোনসেট জোর করে নিয়ে যান রিফাত শরীফ। এ নিয়ে নয়নের সঙ্গে রিফাতের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নয়ন বন্ড মিন্নিকে বলে, ‘রিফাতকে ফোন ফিরিয়ে দিতে বল। না হলে পরিস্থিতি খারাপ হবে।’ হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে রিফাতকে মিন্নি বলেন, ‘তুমি হেলালের ফোন ফেরত দাও।’ এ কথা শুনে রিফাত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির যোগাযোগ আছে কি না জানতে চেয়ে মিন্নিকে প্রচণ্ড মারধরও করেন রিফাত। পরদিন নয়ন বন্ডের কাছে রিফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন মিন্নি। তিনি রিফাতকে শিক্ষা দিতে বলেন। এরপর নয়ন বন্ড তাঁকে শিখিয়ে দেন, কোথায় কিভাবে রিফাতকে নিয়ে হাজির থাকতে হবে।”

নয়নের নামেই রেজিস্ট্রেশন করা কোনো মোবাইল ফোনে মিন্নির সঙ্গে নয়নের কথা হয় বলেও জবানবন্দির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মোবাইল ফোন নিয়ে ঝগড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে হত্যা মামলার বাদী ও নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমন কিছু মোরা শুনি নাই। এই রকম অইলে জানতাম। মোবাইল টোবাইল কিছু না। মাইয়াডাই শেষ করছে!’

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোর কেঁদে বলেন, ‘দুই মাসও অইলে না বিয়া হইছে। নতুন জামাই আমার ঘরে আইয়ে। এমন কিছু অইলে আমরা টের পাইতাম। মোরা তো বুঝাইতাম। ওর জন্যই তো রিফাতের লগে বিয়া অইছে। সব কিছুরই সমাধান আছে। মোর মাইয়ারে ফাঁসানোর জন্য এই সব বলানো অইছে।’

পৌর শহরের মাইঠা এলাকার বাসায় গেলে মিন্নির মা মিলি বেগম কেঁদে বলেন, ‘মোর ছোট মোইয়াডার হয়তো কিছু ভুল ছিল। এহন এমপির পোলাসহ প্রভাবশালীদের বাঁচাইতে ওরে কৌশল কইরা ফাঁসাইয়া দিছে। ওর মতেই আমরা রিফাতের সাথে বিয়া দিছি। কোনো ঝামেলা হইলে আমরা টের পাইতাম।’

এদিকে পশ্চিম কলেজ রোড এলাকায় নয়ন বন্ডের বাসায় গেলে তার মা শাহিদা বেগম কলেন, ‘মিন্নি যহন রিফাতরে বিয়া করলো, যহন ঝামেলা হওয়ার কথা আছিলে তখন হয় নাই, এখন একটা মোবাইল ফোন নিয়া ঝামেলা? মোর কানে এমন কিছুই আহে নাই।’ তিনি যোগ করেন, ‘মাইনসের (মানুষের) ধারে হুনছি, রিফাতের মা জানত কিছু। এই কারণে নাকি সে ঘটনার দিন বেয়ানে (সকাল) ছেলেরে যাইতে বাধা দিছেলে।’

লবণগোলা এলাকায় রিফাত শরীফদের বাড়িতে গিয়ে রিফাতের মা ডেইজি বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না এই বিষয়ে আমরা কিছুই জানতাম না। আমি ছেলেরে বাধা দিছি, শরীর খারাপ দেইখা। ও বলছিল, বের হইবে না। আবার বের হয়ে গেছে। মিন্নি কেন ওরে শিক্ষা দিবো? বলতো, আমরা ওরে স্বাধীন করে দিতাম...।’ মিন্নির প্রায় সমবয়সী রিফাতের একমাত্র ছোট বোন ইসরাত জাহান মৌ ছিলেন তাঁদের খুবই ঘনিষ্ঠ। জানতে চাইলে মৌ বলেন, ‘এখন যা দেখছি আর শুনছি, তা আগে কখনোই টের পাই নাই। বাসায় বা কোথায় মোবাইল ফোন নিয়ে ঝগড়া-মারামারি শুনি নাই। তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছোটখাটো কথা-কাটাকাটি তো হয়। এমন শুনছি।’ ডেইজি বেগম ও ইসরাত জাহান মৌ দাবি করেন, মোবাইল ফোন নিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না তা তাঁরা জানতে পারেননি। তবে যেকোনো কারণে মিন্নি খুনিদের সঙ্গী হয়েছেন বলে তাঁরা জেনেছেন। আগের বিয়ে গোপন করে আবার বিয়ে করা এবং বিয়ের পরও নয়নের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণেই মিন্নি খুনে জড়িত বলে বিশ্বাস করেন তাঁরা!

অন্যদিকে হেলাল নামের যে যুবকের মোবাইল ফোন নিয়ে ঘটনা বলে প্রচার পেয়েছে, তাঁর ঠিকানা শনাক্ত করে বাসায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। পশ্চিম বরগুনা এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিসের কাছে বাসা ওই যুবকের। তাঁর বাবার নাম দুলাল শিকদার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী দুলাল এখন স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন। হেলাল ঢাকা থেকে কাপড় এনে বিক্রি করেন বলে জানায় স্বজনরা। বাসায় গিয়ে কথা হয় হেলালের স্ত্রী মোসাম্মৎ মনিকা ও বড় বোন পারুল বেগমের সঙ্গে। তাঁরা দাবি করেন, হেলালের সঙ্গে মোবাইল ফোন নিয়ে মিন্নি ও নয়নকে জড়িয়ে যে বিরোধের কথা বলা হয়েছে তা সঠিক নয়। এটা হেলালের সঙ্গে রিফাতের একক কোনো বিরোধ ছিল, যা এক দিনেই মিটে গেছে। পারুল বলেন, ঘটনার (হত্যাকাণ্ডের) দুই দিন আগে ২৪ জুন তাঁর সঙ্গে থাকা অবস্থায় হেলালের রিকশা থামিয়ে রিফাত তাঁর মোবাইল ফোনটি নিয়ে যান। ওই সময় রিফাতের মোটরসাইকেলে মিন্নিও ছিলেন। ওই দিন হেলালের মা মিনারা বেগম ফোন করে অনুরোধ করলে বিকেলে পৌর মার্কেট এলাকায় এসে মোবাইল ফোন ফেরত দিয়ে যান রিফাত। বিষয়টি হেলাল ও তাঁর পরিবার নয়ন বন্ডকে জানায়নি বলেও দাবি করেন পারুল ও মনিকা।

মিন্নির স্বীকারোক্তি ও পরিকল্পনার অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন গতকাল বলেন, ‘স্পর্শকাতর মামলায় তদন্তাধীন বিষয় আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। তদন্তে মিন্নির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া এবং সে ব্যাপারে স্বীকার করায় তাঁকে গ্রেপ্তারের কথা জানালেও গণমাধ্যমে এসপির বক্তব্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

মন্তব্য