kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

জঙ্গলে শ্রমিকদের সঙ্গে এক রাত

‘বৈধ হওয়ার জন্য টাকা দিয়েছিলাম কমলের কাছে কিন্তু পুরোটাই মেরে দিয়েছে সে। শেষমেশ পুলিশের ভয়ে এখানে এসে উঠেছি।’

হায়দার আলী, মালয়েশিয়া থেকে ফিরে   

২৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জঙ্গলে শ্রমিকদের সঙ্গে এক রাত

কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাং এলাকায় গত বছরের ৮ অক্টোবর দুপুরে রসনা বিলাস রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখা যায়, এখানে বসে আলাপ করছেন দুই বাংলাদেশি শ্রমিক। একজন বলছেন, তিনি ৯ মাস ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এক দালালকে ১০ হাজার রিঙ্গিত দিয়েছেন ভিসা করার জন্য; কাজ হয়নি। অন্যজন তখন দেশের বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান আর মা-বাবার কষ্টের কথা বলেন।

পাশে বসে তাঁদের কথোপকথন শোনার পর এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিয়ে আলাপে শরিক হন এই প্রতিবেদক। একপর্যায়ে জানা গেল, এফকেআর ম্যানুফ্যাকচারিং কম্পানি ও ভূমি কনস্ট্রাকশনের মালিক কমল চন্দ্র দাসের কাছে অসহায় হয়ে আছেন তাঁরা। আরো অন্তত ৩০০ শ্রমিকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এক কমলের প্রতারণার কারণে। অনেক শ্রমিকের কাছ থেকে বৈধকরণের নামে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছেন তিনি।

এই দুই শ্রমিক হলেন গোপালগঞ্জের এনায়েত হোসেন এবং চট্টগ্রামের সুমন কান্তি দাস। তাঁদের সঙ্গে অল্প সময়েই ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়। পরদিনই তিনজন রওনা হলাম কুয়ালালামপুর শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের এক জঙ্গলে; যেখানে রাতের বেলা লুকিয়ে থাকেন একদল বাংলাদেশি শ্রমিক। সঙ্গ নিলেন আরেক শ্রমিক মনিরুজ্জামান।

কুয়ালালামপুর টু সেরামবাং সড়কের পাশেই পাম বাগান আর জঙ্গল। সড়কের পাশ থেকে নেমে টর্চের আলো ফেলে হাঁটা শুরু। একটু এগোতেই পাওয়া গেল আরেকজনকে, নাম দিলু। তিনি আছেন আমাদের অপেক্ষায়। সেখান থেকে আরেকটু ভেতরে ঢুকতেই গা ছমছম করে ওঠে। ১০ মিনিট হাঁটার পর পাওয়া গেল বসবাসের স্থান। প্লাস্টিকের কাগজ দিয়ে বানানো তিনটি ঝুপড়িঘর, ১৬ জন শ্রমিক থাকেন গাদাগাদি করে। কয়েকজন কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে এসেই ঘুমিয়ে পড়েছেন।

সুমন কান্তি কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘বৈধ হওয়ার জন্য টাকা দিয়েছিলাম কমলের কাছে। কিন্তু পুরোটাই মেরে দিয়েছে সে। শেষমেশ পুলিশের ভয়ে এখানে এসে উঠেছি। দিনের বেলায় শহরের বিভিন্ন বিল্ডিংয়ে শ্রমিকের কাজ করলেও রাতে এসে ঘুমাই জঙ্গলে। পুলিশের ধরপাকড় চলছে। এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে একরকম আতঙ্ক নিয়েই এখানে ১৬ জন থাকছি।’

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের হেলচিয়া ইউনিয়নের নোয়াকান্দি গ্রামের মান্নান মিয়ারও একই অবস্থা। কমল চন্দ্র দাসের এফকেআর কম্পানির নামে প্রফেশনাল ভিসায় মালয়েশিয়ায় এলেও এখন তিনি অবৈধ হয়ে আছেন। বৈধ হতে প্রায় ১২ হাজার রিঙ্গিত দিলে পুরো টাকাই মেরে দেন কমল।

মান্নান মিয়া বলেন, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে আসছিলাম, তা গিলে খেয়েছে দালালরা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাব কী, নিজের জীবন নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছি। সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রাতে ঘুমাই জঙ্গলে।’

কথা হয় সুনীল দাস, আবদুল মান্নান, গোলাপ মিয়া, আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। শেষ সম্বল জমিটুকু বেচে বৈধ হওয়ার জন্য কমলের হাতে সাড়ে ১০ হাজার রিঙ্গিত তুলে দিয়েছিলেন সুনীল। কিন্তু টাকা নিয়েই কমল লাপাত্তা। টাকা পাঠাতে না পারায় দেশের বাড়িতে সুনীলের স্ত্রী, দুই মেয়ে, এক ছেলে ও মা-বাবার না খেয়ে থাকার জোগাড়।

আবদুল মান্নানও তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ করে কমলের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় আসেন। কথা ছিল, শুরুতেই তাঁর ভিসা হবে পাঁচ বছর মেয়াদি। কিন্তু তা তো হয়ইনি, উল্টো আরো ১০ হাজার রিঙ্গিত জলে গেল।

গোলাপ মিয়ার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নিয়েও আট মাস বৈধকরণ করেনি কমল। আরো এক লাখ টাকা দিলে বৈধতা হবে—এমন প্রতিশ্রুতির পর তিনি সেটাও দেন; কিন্তু কাজ হয়নি।

দিলু মিয়া বলেন, ‘আমরা দিনভর পরিশ্রম করে রাতে থাকি জঙ্গলে, সুখের দেখা পাই না। আর আমাদের টাকায় দালালরা থাকে বড় বড় দালানে। ওই সব দালালই আমাদের মতো শ্রমিকদের সর্বনাশ করে দিচ্ছে।’

দালালদের প্রতারণায় অবৈধ হয়ে পড়া এই শ্রমিকরা দিনে লুকিয়ে-চুরিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলেও রাতে পুলিশের ভয়ে জঙ্গলের ডেরায় এসে ঘুমান; কিন্তু ঘুমাতে হয় পালা করে। সাতজন যখন ঘুমান, দুজন জেগে থাকেন সাপ-জীবজন্তু-পোকামাকড় পাহারায়। বরিশালের আগৈলঝড়ার আল আমিন বলেন, ‘সাপের ওষুধ এনে চারপাশে ছিটিয়ে আর মশা থেকে বাঁচতে সারা গায়ে মলম লাগিয়ে ঘুমাই।’ মান্নান মিয়া বলেন, ‘দেশে আমার বাড়ির গরুটাও এর চেয়ে ভালো ঘরে থাকে।’

পায়ের চিহ্ন দেখিয়ে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মাস তিনেক আগে কাজ শেষ করে এখানে আসার পথে সাপ কামড় দেয়। কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় দ্রুত ড্রেসিং করে, ওষুধ খেয়ে ভালো হই। দালাল কমলের প্রতারণায় পড়ে আমাদের আজ এই দশা।’

আরো কয়েকজন শ্রমিকের মুখ থেকে এলো কমলের প্রতারণার ভয়াবহ সব ঘটনা। এর মধ্যে একজন বাদশা মিয়া। তাঁর ঘটনাটি হৃদয়বিদারক। এই প্রতিবেদক মালয়েশিয়ায় বাদশা মিয়াদের মানবেতর জীবন দেখে এসে এর পেছনে আরো কারা দায়ী—অনুসন্ধান চালানোর সময়ই খবরটি আসে—বাদশা মিয়া আর নেই। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করি মালয়েশিয়ায়। বাদশার সহকর্মীদের অন্তত ছয়জন এবং তাঁর পরিবারের তিন সদস্যের একই কথা—দিনবদলের আশায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতারিত হয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়ার দুঃখকষ্টের ধকল সইতে না পেরেই মারা গেছেন বাদশা মিয়া।

মন্তব্য