kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি চলছেই

তছলিমার ওপর বর্বরতা নিঃশ্বাস থামা পর্যন্ত

► সিরাজের হাতে তখনো মেয়ের জন্য কেনা চুড়ি ও লিপস্টিক
► বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে নিহত আরো ২, বেশি আক্রান্ত প্রতিবন্ধীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



তছলিমার ওপর বর্বরতা নিঃশ্বাস থামা পর্যন্ত

গণপিটুনিতে নিহত মায়ের ছবি শিশু তুবার হাতে। সে জানে মা তাকে স্কুলে ভর্তি করাবেন বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। তাহলে কেন আজ তার মা নেই। এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? ছবি : সংগৃহীত

সন্দেহেরবশে তাছলিমা বেগম রেনুকে নেওয়া হয় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে। প্রধান শিক্ষক তাঁকে ঠিকানা লিখতে বলেন। তিনি লিখতেও শুরু করেন। ঠিক তখনই শতাধিক ব্যক্তি সেখানে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে তাছলিমাকে বাইরে বের করে আনে। এরপর লাঠি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। কেউ কেউ লাথি মারতে থাকে। কেউ ব্যস্ত থাকে মোবাইল ফোনে ভিডিও করতে। এই ব্যস্ততা তাদের ততক্ষণই চলতে থাকে, যতক্ষণ তাছলিমার নিঃশ্বাস ছিল।

রাজধানীর উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে এমনই ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গত শনিবার সকালে। ছেলেধরা সন্দেহে রেনুকে এভাবে হত্যা করে উচ্ছৃঙ্খল জনতা।

নিষ্ঠুরতার পাল্লায় সমান ‘পারদর্শিতা’ দেখিয়েছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি আলআমিন নগরের হুজুগে জনতাও। তারা ছেলেধরা সন্দেহে এমন একজনকে হত্যা করে, যিনি একজন বাক্প্রতিবন্ধী; যিনি বহুদিন পর নিজের মেয়েকে একটিবার স্পর্শ করতে রাস্তায় অপেক্ষা করছিলেন; যিনি ১০০ টাকা ধার করে মেয়ের জন্য চুড়ি আর লিপিস্টিকও সঙ্গে নিয়েছিলেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর ‘আধুনিক’ মানুষ সেই বাবাকে আবিষ্কার করে ছেলেধরা হিসেবে; আর বিচার হিসেবে নিয়ে নেয় ‘বাবার’ প্রাণটা।

বাড্ডার ঘটনায় নিহত তাছলিমার স্বজনরা জানায়, উচ্চশিক্ষিত এই নারী অনেক প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করেছেন। গত শুক্রবার রাতে তাছলিমা তাঁর মাকে বলেন, মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দেবেন। সে কারণে তিনি শনিবার সকালে স্কুলে গিয়েছিলেন ভর্তির তথ্য জানার জন্য। কিন্তু আর বাসায় ফেরা হয়নি তাঁর। যে তুবাকে ভর্তির জন্য গিয়েছিলেন সেই তুবা এখন একা। এমন খবর জানার পরও গতকাল পর্যন্ত তুবার বাবা দেখতে আসেননি।

তাছলিমার ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু জানান, তাছলিমা ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ থেকে অনার্স এবং তিতুমীর সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স করেন। এরপর তিনি চাকরিতে যোগ দেন। একসময় স্বামীর সঙ্গে তাছলিমা বাড্ডা এলাকায় বাস করতেন। বছর দুয়েক আগে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর ঢাকার মহাখালী এলাকায় থাকা শুরু করেন। সেখানে তাছলিমার মা, বোন ও ভাগ্নের সঙ্গে থাকতেন তিনি। তাছলিমা সব শেষ আড়ংয়ে চাকরি করতেন।

এদিকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ বেগম জানান, তিনি তাঁর কক্ষে বসে কাজ করছিলেন। এমন সময় দুজন অভিভাবক এক নারীকে নিয়ে আসেন। তাঁরা এসে জানান, এই নারী দুই রকম ঠিকানা বলছেন। তখন তিনি তাছলিমাকে বলেন কোথায় থাকেন? নাম-ঠিকানা লেখেন। ওই সময় বাইরে থেকে কে বা কারা ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে দেয়। লোকজন আসছে বুঝতে পেরে কলাপসিবল গেটে তালা দেওয়া হয়। উত্তেজিত জনতা তালা ভেঙে ওপরে চলে আসে।

এ ব্যাপারে বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টিম পাঠানো হয় স্কুলে। পুলিশ গিয়ে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে তাছলিমাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। তিনজনকে আটক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সিদ্ধিরগঞ্জে নিহত বাক্প্রতিবন্ধী সিরাজ ভাড়া থাকতেন ৫নং ওয়ার্ডের সাইলো এলাকার ঠিকাদার মোহর চানের বাড়িতে। কাজ করতেন রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন থানার মুগিয়া বাজার এলাকায়। তাঁর বাবার নাম আ. রশিদ মণ্ডল। সিরাজের ভাই আলম হোসেন জানান, প্রায় ১০ বছর আগে শামসুন্নাহারের সঙ্গে বিয়ে হয় সিরাজের। ছয় বছরের এক মেয়ে আছে তাঁদের। প্রায় বছরখানেক তাঁর স্ত্রী আব্দুল মান্নান নামে এক ব্যক্তিকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। এরপর সিরাজকে ডিভোর্স দেন। এ অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে মেয়ের সন্ধান করতে থাকেন সিরাজ। সম্প্রতি তিনি জানতে পারেন তাঁর স্ত্রী-সন্তান মিজমিজি আলআমিন নগর এলাকায় থাকে। গত শনিবার সকালে তিনি কন্যা সাদিয়াকে দেখার আশায় ওই এলাকায় যান। যাওয়ার আগে একজনের কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার করে মেয়ের জন্য চুড়ি আর লিপস্টিক কেনেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাঁকে দেখে ফেলেন তাঁর স্ত্রীর বর্তমান স্বামী আব্দুল মান্নান। এরপর তিনি ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে দিলে প্রাণ যায় সিরাজের।

বাড্ডা কিংবা সিদ্ধিরগঞ্জের মতো ছেলেধরা গুজবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে গণপিটুনির ঘটনা। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে আরেকজন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া বাগেরহাটের চিতলমারী, নওগাঁর মান্দা, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, ময়মনসিংহের গফরগাঁও, নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও সুনামগঞ্জে গণপিটুনির আলাদা ঘটনায় আহত হয়েছে ২৩ জন। গণপিটুনিতে আক্রান্ত অধিকাংশই মানসিক ভারসাম্যহীন। এদিকে সাভারে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে এক নারী নিহত হওয়ার ঘটনায় ৮০০ জনের নামে মামলা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

মৌলভীবাজার : কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা-বাগান এলাকায় গত শনিবার রাতে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অচেনা এক ব্যক্তি (৫০) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গতকাল রবিবার ৩০০ থেকে ৪০০ জন অচেনা ব্যক্তিকে আসামি করে কমলগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়েছে।

দেওড়াছড়া চা-বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি সুবোধ কুর্মী জানান, দেওড়াছড়া চা-বাগান এলাকায় স্থানীয় লোকজন সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে ওই ব্যক্তির কাছে নাম-পরিচয় জানতে চায়। পরিচয় জিজ্ঞেস করার পর অসংলগ্ন কথাবার্তায় ছেলেধরা সন্দেহে তাঁকে শ্রমিকরা চা বাগান অফিসে নিয়ে যায়। পরে শতাধিক শ্রমিক গণপিটুনি দিয়ে তাঁকে গুরুতর আহত করে। একপর্যায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ১২টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

চিতলমারী (বাগেরহাট) : ছেলেধরা সন্দেহে চিতলমারীর সদর বাজারের বোয়ালিয়া ভ্যানস্ট্যান্ডে গতকাল বহিরাগত পাঁচ যুবককে গণপিটুনি দিয়েছে স্থানীয় জনতা। এ সময় পাঁচ যুবকের সঙ্গে থাকা একটি প্রাইভেট কার পুলিশ জব্দ করে। চিতলমারী থানার পরিদর্শক মীর শরিফুল হক জানান, জনতা সন্দেহভাজন পাঁচ যুবক ও একটি প্রাইভেট কার আটক করে পুলিশে দিয়েছে। আটক যুবকরা এলাকায় বেড়াতে এসে ভুল-বোঝাবুঝির কারণে জনতার রোষানলে পড়েছেন। তাঁরা হলেন রুবেল মিয়া (২৮), রাসেল মুন্সি (২৮), রুবেল মুন্সী (২৮), আব্দুর রহমান (৪৭) ও ফরিদ আহম্মেদ (২৯)।

মান্দা (নওগাঁ) : মান্দার কুসম্বা ইউনিয়নের বুড়িদহ এলাকায় গতকাল সকালে ছেলেধরা সন্দেহে ছয় মৎস্যজীবীকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন নওগাঁ সদরের খাগড়া গ্রামের ছকিমুদ্দীনের ছেলে সাদ্দাম হোসেন, রফাত আলী মণ্ডলের ছেলে তাসলাম হোসেন, ভোলা মণ্ডলের ছেলে সাইফুল ইসলাম, মোবারক আকন্দের ছেলে আব্দুল মজিদ আকন্দ ও মনসের আলীর ছেলে আনিসুর রহমান এবং ফারাদপুর গ্রামের মন্টুর ছেলে রেজাউল করিম।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলে ছেলেধরা সন্দেহে আলাদা ঘটনায় দুজনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার রাতে টাঙ্গাইল শহরের শান্তিকুঞ্জ মোড় এলাকায় এক বৃদ্ধকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে কান্দিলা বাজারে গতকাল রবিবার সকালে গণপিটুনির শিকার যুবকও মানসিকভাবে অসুস্থ।

কুমিল্লা : কুমিল্লায় ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীসহ চারজনকে গণপিটুনি দিয়েছে স্থানীয়রা। রবিবার দুপুরে আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের দুতিয়াদিঘীরপাড় ও মাঝিগাছা এলাকায় আলাদা দুটি ঘটনা ঘটে। রবিবার দুপুরে এক নারীসহ তিনজন আমড়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে যান। এ সময় তাঁরা চৈতী নামের এক ছাত্রীকে ডাক দেন। এতে ওই শিশুটি ভয় পেয়ে ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার শুরু করলে এলাকাবাসী আনোয়ার হোসেন, আব্দুস সালাম ও রত্না বেগমকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এর আগে সকালে সদর উপজেলার মাঝিগাছা এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে আরিফ (৩০) নামে আরেকজনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়।

কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) : কলমাকান্দার খারনৈ ইউনিয়নের বাউশাম বাজারে গত শুক্রবার রাতে ছেলেধরা সন্দেহে ভবঘুরে নারী মাহফুজা বেগমকে (৫০) পিটিয়ে গুরুতর আহত করছে স্থানীয়রা। ওই নারী কুমিল্লার দাউদকান্দির মালাখোলা গ্রামের মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী।

সুনামগঞ্জ : তাহিরপুরের বড়দল উত্তর ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামে গত শনিবার রাতে গলাকাটা ও ছেলেধরা সন্দেহে এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়েছে গ্রামবাসী। ওই ব্যক্তি নদীর পারে বসা ছিলেন। এ সময় গ্রামের কিছু যুবক তাঁকে ধরে মানিগাঁও চকবাজারের কাছে নিয়ে এলোপাতাড়ি লাথি, ঘুষি দিতে দিতে গুরুতর আহত করে।

আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ) : আড়াইহাজারের মসজিদ  এলাকায় গতকাল রবিবার সকালে ছেলেধরা সন্দেহে এক বৃদ্ধাকে (৬৫) পিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে  এলাকাবাসী। 

গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) : গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় গতকাল ছেলেধরা সন্দেহে আল মামুন (২৭) নামে মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। আহত যুবক মামুন চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের ব্যাংক কর্মকর্তা মুছলেম উদ্দিনের ছেলে।

দিনাজপুর : চিরিরবন্দরে গতকাল রবিবার দুপুরে ছেলেধরা সন্দেহে মিরু মিয়া (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে এলাকাবাসী।

সাভার (ঢাকা) : সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে গত শনিবার গণপিটুনিতে অচেনা এক নারীর নিহতের ঘটনায় ৭০০ থেকে ৮০০ জন অজ্ঞাতপরিচয়কে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত ওই নারীর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) : কেন্দুয়ায় ছেলেধরা ও গলাকাটা গুজবের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময়ের আয়োজন করা হচ্ছে।

কেরানীগঞ্জ : ছেলেধরা সন্দেহে গণধোলাইয়ে আহত ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাত সোয়া ৮ টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অজ্ঞাত ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

 

মন্তব্য