kalerkantho

শরিকদের এড়িয়ে চলার কৌশল বিএনপির

এনাম আবেদীন   

২০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শরিকদের এড়িয়ে চলার কৌশল বিএনপির

নানামুখী জটিলতার কারণে উভয় জোটের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় বিএনপি। এর বদলে যতটা সম্ভব এককভাবে কর্মসূচি পালনের কৌশল নিয়েছে দলটি। এভাবেই কৌশলে দুই জোটের কাছ থেকে আপাতত দূরে থাকতে আগ্রহী দলটি।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির এখনকার অবস্থান হলো জোট ভাঙাও নয়, আবার কার্যকর রাখাও নয়। গত ১৩ জুলাই দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে এককভাবে কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। আপাতত তিনটি বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করবে দলটি।

এদিকে একই দাবিতে (খালেদা জিয়ার মুক্তি) ২০ দলীয় জোটেরই অন্য তিনটি দলের সমন্বয়ে গঠিত ‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’ বিভাগীয় শহরে সমাবেশ কর্মসূচি পালন করছে। প্রথমে চট্টগ্রামে এবং গত ১৬ জুলাই সিলেটে সমাবেশ করেছে ওই মঞ্চ। দলীয় সূত্র মতে, মুখে নেতিবাচক কথা না বললেও এলডিপির সভাপতি ড. অলি আহমদের নেতৃত্বে আলাদা ওই তৎপরতা  বিএনপি খুব একটা ভালো চোখে দেখছে না। তাদের সন্দেহ, অলির ওই তৎপরতার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ আছে। তাই ২০ দলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দল বা ব্যক্তি যাতে অলির সঙ্গে না যায়, সেই লক্ষ্যে ভেতরে ভেতরে তৎপরতাও আছে বিএনপির।

সূত্র মতে, এমন তৎপরতার অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাগপা বিএনপিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে যে তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটেই থাকবে। জাগপার ওই চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। গত মঙ্গলবার তিনি জানান, ২০ দলে থাকার কথা জানিয়ে গত ১৬ জুলাই জাগপা চিঠি দিয়েছে।

নজরুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কাউকে জোর করে জোটে আনিনি, আবার কাউকে বেরও করে দিইনি। শরিকরা যার যার আদর্শ ও বিশ্বাস থেকেই জোটবদ্ধ হয়েছে। এখন কেউ যদি হতাশা থেকে বেরিয়ে যায়, সেটি তার বিষয়। আমরা তো কাউকে জোর করে আটকাতে পারব না।’ এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘বিএনপি তার দলীয় কর্মসূচি পালন করছে। এখানে এখনো কাউকে সম্পৃক্ত করা হয়নি এ কথা সত্য। তা ছাড়া প্রত্যেকের নিজের মতো কর্মসূচি পালনের অধিকার তো আছে। অলি সাহেবও করছেন। আমরা তো মানা করছি না।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আমরা দলীয়ভাবে কর্মসূচি পালন করছি এ কথা ঠিক। কিন্তু এ কারণে বলা ঠিক হবে না যে শরিকদের বাদ দিয়েই করছি। হয়তো আগামীতে অন্য কোনো কর্মসূচিতে তাদের সম্পৃক্ত করা হবে।’

২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ড. অলি আহমদ অবশ্য মনে করেন, দলীয় এবং এককভাবে বিএনপির কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ খুবই ভালো।’ তিনি বলেন, ‘যে যার মতো কর্মসূচি পালন করলে জোটও শক্তিশালী হবে, বিএনপিও শক্তিশালী হবে। তাঁর মতে, দলীয়ভাবে বিএনপির শক্তিশালী হওয়ার ও বিস্তার লাভ করার প্রয়োজন আছে।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না লন্ডন থেকে ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি এখন থেকে নিজেরা কর্মসূচি পালন করবে—এ কথা আমাদের জানায়নি। তবে দলটির মনোভাব দেখে সে রকমই মনে হচ্ছে। কারণ ঐক্যফ্রন্ট অনেক দিন থেকে প্রায় অকার্যকর হয়ে আছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আস্তে আস্তে জোট শরিকদের কাছ থেকে দূরে থাকার লক্ষ্য নিয়েই আগামীতে কর্মসূচি পালন করা হবে। সর্বশেষ বিএনপির এককভাবে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত সেই উদ্যোগেরই অংশ।’

বিএনপির এক নীতিনির্ধারক জানান, এখন থেকে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ঠিক করার পাশাপাশি নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তির ওপরই তাঁরা গুরুত্ব দেবেন। কারণ দুই জোট নিয়ে দুই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে কারো সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা যেমন কঠিন, তেমনি ভারসাম্য রক্ষা করে চলাও কঠিন। ফলে জোট রক্ষায় বিএনপি এখন আর ‘নার্সিংও করবে না, আবার ভাঙার মতো পরিস্থিতিও তৈরি করবে না।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে নিয়ামক ভূমিকা পালনকারী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত আগেও বিএনপি নিয়েছে। কিন্তু ভণিতা বা ভদ্রতার জন্য হলেও অন্তত ২০ দল বা ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠক করে আগে এনডোর্স করা হতো। কিন্তু এবার দেখছি সবাইকে বাদ দিয়ে তারা এককভাবে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এভাবে দলকে শক্তিশালী করতে পারলে ভালো। বিএনপির নেতারা বলছেন তাঁরা দল গোছাচ্ছেন। সে জন্যই নাকি শরিকদের সময় দিতে পারছেন না। বৈঠকও সে কারণে হচ্ছে না। আমার মনে হয়, ইচ্ছাকৃতভাবে শরিকেদের তারা দূরে ঠেলে দিতে চাইছে।

গত ছয় মাসে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক হয়েছে মাত্র একটি। গত ১০ জুন উত্তরায় আ স ম রবের বাসায় ওই বৈঠক হলেও তাতে যোগ দেননি ড. কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্না। অন্যদিকে গত ১৩ মে ও ২৪ জুন ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হলেও সেখানে জামায়াতসহ শরিক আরো দু-একটি দলের নেতা অনুপস্থিত ছিলেন। বিএনপি নেতাদের মতে, উভয় জোটই মূলত এখন অকার্যকর হয়ে গেছে। তা ছাড়া জোট রক্ষার আর কোনো প্রয়োজনীয়তাও এখন আর খুঁজে পাচ্ছেন না বিএনপির নেতারা। বিজেপি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে এ কারণেই জোটে রাখার চেষ্টা করেনি বিএনপি।

 

মন্তব্য