kalerkantho

পানির মান নয়, চাহিদা পূরণে ঝোঁক ওয়াসার

শাখাওয়াত হোসাইন   

২০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পানির মান নয়, চাহিদা পূরণে ঝোঁক ওয়াসার

আগে ঢাকা শহরের পানির ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে হবে, মানের দিকটা পরে দেখা যাবে—এই নীতিতে চলছে ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম। একের পর এক পানি শোধন প্রকল্প নেওয়া হলেও পুরনো পাইপ বদলানোর কাজে গুরুত্ব কম। ফলে লাইনে পানি এলেও মান নিয়ে অসন্তুষ্ট গ্রাহকরা।

গত এক দশকে পানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা)। ২০০৮ সালে দৈনিক ২০৫ কোটি লিটার পানির চাহিদার বিপরীতে ঢাকা ওয়াসার উৎপাদন ছিল ১৭৬ কোটি লিটার। এখন দৈনিক ২৪০ কোটি লিটার চাহিদার বিপরীতে ২৫৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। তবে মানের ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে থাকার অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের। এ সত্ত্বেও ঢাকা ওয়াসার চলমান অধিকাংশ প্রকল্প উৎপাদনমুখী। মানের বিষয়টাতে আলাদা মনোযোগ নেই। পুরনো পানির লাইন পরিবর্তন করে উৎপাদিত পানির মান ঠিক রেখে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর বিষয়টি অনেকটাই উপেক্ষিত। পাশাপাশি আলাদা উৎস ও পদ্ধতিতে খাবার পানি সরবরাহের সক্ষমতা ও পরিকল্পনা কোনোটাই নেই ঢাকা ওয়াসার।

জানা গেছে, ১৯৬৩ সালে যাত্রা শুরু হয় ঢাকা ওয়াসার। গত এক দশকে পানির নতুন নতুন পাম্প স্থাপন এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো, অপচয় বন্ধ এবং রাজস্ব বহির্ভূত পানি কমিয়ে আনার দিকে মনোযোগ ছিল সংস্থাটির। সংস্থাটির মোটা অঙ্কের প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই এই চার লক্ষ্যনির্ভর। দীর্ঘদিনের পুরনো সংযোগ পাইপ পরিবর্তনের গতি মন্থর।

ওয়াসার সূত্র জানায়, ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির ৭৮ শতাংশ ভূ-গর্ভস্থ এবং মাত্র ২২ শতাংশ ভূ-উপরিভাগের উৎস থেকে আসে। এই ভূ-উপরিভাগের পানি উৎপাদন ৭০ শতাংশে নিয়ে যেতে চায় সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারের মাধ্যমে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি শোধনের ব্যবস্থা সম্পন্ন একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ের এই প্রকল্পে বরাদ্দ প্রায় চার হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া গন্ধার্বপুর ও পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দৈনিক যথাক্রমে ৪৫ ও ৫০ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন আরো দুইটি প্রকল্প চালু হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পের বরাদ্দ প্রায় তিন হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। বাকি প্রকল্পের ব্যয় সম্পর্কে জানা যায়নি।

এ ছাড়া ঢাকা পরিবেশগত টেকসই পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ভূ-উপরিভাগের আরো ৫০০ কোটি লিটার পানি পরিশোধন করার কথা। এই প্রকল্পের ব্যয় পাঁচ হাজার ২৪৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া সাভার উপজেলার তেঁতুলঝরা-ভাকুর্তা এলাকায় আরেকটি ওয়েলফিল্ড রয়েছে ঢাকা ওয়াসার। এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫৭৩ কোটি টাকা।

ঢাকা শহরের পানির লাইন সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের অর্থের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ‘ঢাকা পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ নামের এই প্রকল্পের ব্যয় তিন হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় এক লাখ ৫৬ হাজার ১৬১ সংযোগ সেবাসহ ১৬৬৮ কিলোমিটার পাইপলাইন পুনঃ সংস্কার করার কথা। কিন্তু প্রকল্পের কাজ চলছে ধীরগতিতে। এ কারণে পাইপলাইনের দূষণের কবল থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না ওয়াসার পানিকে। ঢাকায় ওয়াসার পানির পাইপলাইন পরিবর্তন করা হবে ১৪৫টি ডিস্ট্রিক্ট মিটারড এরিয়ার (ডিএমএ) মাধ্যমে। এ পর্যন্ত মাত্র ৫৫টি ডিএমএর লাইন পরিবর্তন হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ কখন শেষ হবে জানা নেই সংশ্লিষ্টদের।

মিরপুরের মনিপুর, মোহাম্মপুর, জুরাইন, দনিয়া ও কমলাপুর এলাকার পানি নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে নগরবাসী। বেশির ভাগ নাগরিক পানি বিশুদ্ধ করতে গ্যাস পোড়ানোর বিষয়টি স্বীকার করেছে। ফিল্টার থাকার পরও বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে পানি ফুটিয়ে পান করে তারা। কিছুদিন আগে পূর্ব জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমানের ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিবাদ আলোচনায় আসে। ওই আন্দোলনের পর কোনো ধরনের পরিবর্তন এসেছে কি না জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানির মান ঠিক করতে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে এখনো দেখা যায়নি। জুরাইন ও দনিয়া এলাকার পানির মান নিয়ে এখনো অসন্তোষ রয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে।’   

লন্ডনে পানির মান নিশ্চিত করার জন্য আলাদা দপ্তর রয়েছে। সেখানে বছরে পাঁচ লাখ নমুনার অণুজৈবিক ও রাসায়নিক পরীক্ষা করে পানির মান নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি পানির রং স্বাভাবিক কি না তাও দেখা হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উৎস থেকে পানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। কখনো কখনো গ্রাহকদের পানি ফুটিয়ে খেতে বলা হয়। পানির মান নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ থাকায় বোস্টনের একটি এলাকায় লাইন মেরামত না হওয়া পর্যন্ত বিনা মূল্যে বোতলজাত পানি বিতরণ করেছিল বোস্টন নগর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পানির মান ঠিক করতে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেয় না ঢাকা ওয়াসা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা ওয়াসার জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পানি লাইনে যাওয়ার পর মান নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা ঢাকা ওয়াসার নেই। পুরনো লাইন পরিবর্তন না হলে পানির মান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। পানির মান খারাপ হওয়ার জন্য বাড়ির মালিকরাও দায়ী।’

ওয়াসার তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে একজন নাগরিক ১৪০ লিটার পানি ব্যবহার করে। পুরো পানির মাত্র ৪-৬ লিটার খাওয়ার জন্য ব্যবহার করে একজন নাগরিক। এই খাবার পানিসহ তার ব্যবহারের পুরোটাই একই প্রক্রিয়ায় এবং অভিন্ন উৎস থেকে তৈরি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাবিতা রিজওয়ানা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়াসার সরবরাহ করা পানিই নিরাপদ ও পানযোগ্য করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে কলের পানি খাওয়া যায়। তবে ঢাকা ওয়াসার ওই অবস্থায় যাওয়ার জন্য পুরনো পাইপলাইন পরিবর্তন করতে হবে। বিভিন্ন স্থান থেকে পানির নমুনা নিয়ে পরীক্ষাও করতে হবে নিয়মিত।’

ভালোভাবে পরিশোধন এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা খাবার উপযোগী করা সম্ভব বলে জানান ওয়াসার কর্মকর্তারা। তবে আলাদা লাইন তৈরির বিষয়টি অনেক বেশি ব্যয়বহুল বলে মনে করেন ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) শহীদ উদ্দিন।

উন্নত শহরগুলোতে সরবরাহকৃত পানির মান প্রতিদিন পরীক্ষা করা হয়। কোনো কোনো শহরে পরীক্ষার ফলাফল গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ঢাকার ১১টি অঞ্চলের পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় বলে জানান ওয়াসার অণুজীব ও রসায়ন ল্যাবরেটরি বিভাগের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘পরীক্ষা আমরাও করি। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৫০টির মতো পরীক্ষা করা হয়। আমরা অতটা পারি না। তবু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা আমাদের ল্যাবে করা হয়। সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।’

ওয়াসার ওপর উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনা থাকায় কর্মকর্তারা মন্তব্য করার ব্যাপারে এখন সতর্ক। নাম পদবি প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি নন তাঁদের বেশির ভাগ। কবে নাগাদ উন্নত শহরের মতো ওয়াসার পানির মান গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত হবে—এ প্রশ্নের উত্তরে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘একসময় চাহিদা অনুযায়ী পানি উৎপাদন ও সরবরাহ ছিল ওয়াসার বড় চ্যালেঞ্জ। এখন পানির মান ঠিক রেখে সরবরাহ করা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।’

 

মন্তব্য