kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

তড়িঘড়ি করে মিন্নির জবানবন্দি, বাবার দাবি জবরদস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল   

২০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



তড়িঘড়ি করে মিন্নির জবানবন্দি, বাবার দাবি জবরদস্তি

বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে তড়িঘড়ি করেই জবানবন্দি দেওয়ানোর অভিযোগ উঠেছে। পাঁচ দিনের রিমান্ডের আদেশ হলেও দুই দিন পরই গতকাল শুক্রবার তাঁকে গোপনে বরগুনার বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এরপর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দাবি করেছেন, নির্যাতন ও জোরজবরদস্তি করে তাঁর মেয়ের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়।

জানা যায়, দুপুর ২টার দিকে অতি গোপনে মিন্নিকে আদালতে নেওয়া হয়। আদালত থেকে তাঁকে বের করা হয় সন্ধ্যা ৭টার দিকে।

কিন্তু মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির বলেছেন, গতকাল বিকেল ৫টার দিকে মিন্নিকে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করা হয়। মিন্নি ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরপর আদালত তাঁকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘পাঁচ দিনের জন্য হেফাজতে নেওয়া হলেও মিন্নির কাছে আমাদের যা জানার ছিল তা জানা হয়ে গেছে। তাই শুক্রবারই তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে তিনি কী বলেছেন সে সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন বলেছেন, তাঁর মেয়েকে আদালতে তোলা হয়েছে সেই সংবাদ শুনে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তিনি আদালত প্রাঙ্গণে ছুটে আসেন।

জানা যায়, আদালত প্রাঙ্গণে মিন্নির বাবা চিৎকার করে বলছিলেন, তাঁর মেয়ে অসুস্থ, গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে একজন পুলিশ সদস্য তাঁর বাসায় গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র নিয়ে এসেছেন। আজকে (শুক্রবার) জোরজবরদস্তি ও নির্যাতন করে তাঁর মেয়ের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

মোজাম্মেল হোসেন আরো বলেন, ‘আমার মেয়ে জীবন বাজি রেখে তার স্বামীকে রক্ষা করতে গেছে। এটাই তার অপরাধ? এ সবকিছুই শম্ভু বাবুর (স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু) খেলা। তাঁর ছেলে সুনাম দেবনাথকে সেভ করার জন্য আমার মেয়েকে বলি দেওয়া হচ্ছে।’

পরে মোজাম্মেল হোসেন মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রভাবশালীদের চাপের কারণেই আমি মেয়ের পক্ষে কোনো আইনজীবী দিতে পারিনি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর একতরফা শুনানি শেষে আদালতের বিচারক মিন্নির বিরুদ্ধে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি বিভিন্ন মিডিয়ায় আসার পর ঢাকার একদল আইনজীবী আমার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে আইনি সহায়তা প্রদানের বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু আইনি লড়াইয়ের আগেই পুলিশ প্রশাসন আমার মেয়েকে চাপ প্রয়োগ করে দুই দিনের মধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে।’

বরগুনার সাংবাদিকরা বলছেন, রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিটি গ্রেপ্তার কিংবা আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পুলিশ প্রশাসন তাদের আগেভাগেই জানাত। এমনকি মিন্নিকে আসামি শনাক্তের কথা বলে যখন তাঁর বাসা থেকে নিয়ে আসা হয়, তখনো পুলিশ বিষয়টি সাংবাদিকদের জানিয়েছিল। কিন্তু মিন্নিকে গতকাল দুপুরের দিকে আদালতে হাজির করা হয় অতিগোপনে।

সাংবাদিকরা বলছেন, সন্ধ্যার দিকে মিন্নিকে যখন আদালত থেকে বের করা হচ্ছিল, তখন তাঁকে পুলিশের দুজন নারী সদস্য ধরে ছিলেন। মিন্নিকে যখন পুলিশ পিকআপে তোলার চেষ্টা করছিল, তখন সাংবাদিকদের মিন্নি কিছু একটা বলার জন্য চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পাশে থাকা নারী পুলিশ সদস্য তখন মিন্নির মুখ চেপে ধরেন। সাংবাদিকরা মিন্নির দিকে এগিয়ে গেলে তাঁদের সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরা সরিয়ে দেন।

মিন্নিকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রথম দিন বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন দাবি করেন, রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা তাঁর স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি স্বীকার করেছেন। গ্রেপ্তারের আগে জিজ্ঞাসাবাদে মিন্নি এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। রিফাত শরীফ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি রাশিদুল হাসান রিশান ওরফে রিশান ফরাজীকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানাতেই জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন পুলিশ সুপার।

পুলিশ সুপার আরো বলেন, মামলার আসামি টিকটক হৃদয়ের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মিন্নি এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতেন। শুরু থেকে এ হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিল, তাদের সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটাতে যা যা প্রয়োজন, হত্যাকারীদের সঙ্গে মিন্নি সব ধরনের মিটিং করেছেন। মিন্নি নিজেও এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন বলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আগে ও পরে খুনিদের সঙ্গে মিন্নির কথোপকথনও হয়েছে। মিন্নি স্বীকার করেছেন বলেই পুলিশ বিষয়গুলো আদালতের কাছে তুলে ধরে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য রিমান্ড আবেদন করেছে। আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রিফাতকে স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নি প্রাণপণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তিনি বারবার চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। এ ঘটনার ভিডিও ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। ওই দিন রাতে রিফাত শরীফের বাবা আবদুল দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামি করে যে মামলাটি করেন, তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকেই।

গত ১৩ জুলাই মিন্নির শ্বশুর তাঁর ছেলের হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি মিন্নির গ্রেপ্তার দাবি করেন। এরপর আলোচনা নতুন দিকে মোড় নেয়। পরদিন ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে মানববন্ধন হয়। যেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা সুনাম দেবনাথও ছিলেন।

তবে শ্বশুর অভিযোগ তোলার পর মিন্নি তা অস্বীকার করে পাল্টা বলেছিলেন, দুলাল শরীফ ষড়যন্ত্রকারীদের প্ররোচনায় পড়ে তাঁকে জড়িয়ে বানোয়াট কথা বলছেন।

এরপর গত মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে মিন্নিকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে পুলিশ লাইনসে নিয়ে যায়। প্রায় ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৯টার দিকে তাঁকে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। সোয়া ৯টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত হত্যার সঙ্গে প্রাথমিকভাবে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাঁকে আমরা এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করেছি।’

তবে ওই দিন রাতেই মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, তাঁর মেয়েকে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি আরো দাবি করেন, মূল ঘটনা আড়াল করার জন্য মিন্নিকে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

এর পরদিন বুধবার পুলিশ মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের হেফাজতে চেয়ে আদালতে আবেদন করে। বিচারক শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তবে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। মিন্নির বাবা অভিযোগ করেন, একটি মহলের চাপে তাঁর মেয়ের পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াতে সাহস করেননি।

মিন্নিকে জড়িয়ে অশালীন ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

জানান, রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশালীন ভিডিও প্রকাশে জড়িতদের বিরুদ্ধে ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে মামলা করার প্রস্ততি চলছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এই মামলা করা হবে। মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট, আইনজীবী ফারুকসহ ঢাকার একদল আইনজীবী এই মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে এই মামলা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন অ্যাডভোকেট মো. ফারুক আহম্মেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা সাইবার ট্রাইব্যুনালের মামলা করব।’

বরগুনার আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানোর কারণে ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ইব্রাহিম খলিল, ব্লাস্টের প্রতিনিধি, মো. ফারুক আহম্মেদসহ ৪০ সদস্যের একটি আইনজীবী প্রতিনিধিদল আগামী মঙ্গলবার বরগুনা যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। ওই দিন রিমান্ড শেষে মিন্নিকে আদালতে হাজির করার দিন ছিল। কিন্তু পাঁচ দিনের রিমান্ডের দুই দিন পরই মিন্নিকে গতকাল ১৬৪ ধারা জবানবন্দি দিতে আদালাতে পাঠানো হয়। জবানবন্দি দেওয়ার পর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এই অবস্থায় আইনজীবীরা বরগুনায় যাবেন কি না, সে বিষয়ে আগামীকাল রবিবার সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরা। তবে তাঁরা বরগুনায় যান আর নাই যান ঢাকায় সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

রিশান ফরাজী পাঁচ দিনের রিমান্ডে বরগুনা প্রতিনিধি জানান, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ৩ নম্বর আসামি রিশান ফরাজীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল দুপুরে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে রিশান ফরাজীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বরগুনা থানার পরিদর্শক মো. হুমায়ুুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, রিশান ফরাজীকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের হেফাজতে (রিমান্ড) চেয়ে আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত আসামিসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১৩ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। দুজন এখনো রিমান্ডে রয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা