kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

এরশাদের মরদেহ

সকালে যাবে রংপুরে, বিকেলে দাফন ঢাকায়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সকালে যাবে রংপুরে, বিকেলে দাফন ঢাকায়

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের তৃতীয় জানাজা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল সোমবার বাদ আসর। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা জানাজায় অংশ নেন। এর আগে সকাল পৌনে ১১টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার টানেলে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। গত রবিবার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে সোমবার দুপুর ১২টায় সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের মরদেহ আনা হয় রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। প্রধান কার্যালয়ে এ সময় শোকের আবহ তৈরি হয়। বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আগত নেতাকর্মীদের অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। দলীয় কার্যালয়ের সমানে রাখা এরশাদের মরদেহে একে একে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এ সময় পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় মরদেহ হেলিকপ্টারযোগে রংপুরে নেওয়া হবে এবং বিকেলে ঢাকায় এনে সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। ১৪ জুলাই সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত সাবেক এই সেনাপ্রধান। ২৬ জুন রক্তের ক্যান্সার মাইডোলিস প্লাস্টিক সিনড্রোমে আক্রান্ত এরশাদ সিএমএইচে ভর্তি হন।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এইচ এম এরশাদের মরদেহ জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে আনা হয় জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে। সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণ প্লাজার টানেলে তা অনুষ্ঠিত হয়। সাবেক এই রাষ্ট্রপতির জানাজায় অংশ নেন রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। জানাজা শেষে তিনি কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। জানাজার আগে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার জীবনী পাঠ করে শোনান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এরশাদের কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব। বিদেশে অবস্থানরত স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের পরিবারের পক্ষে বক্তব্য দেন এরশাদপত্নী সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ ও এরশাদের ছোট ভাই জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের। রওশন এরশাদ সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য সবার কাছে দোয়া চান। জি এম কাদের বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি ভাইয়ের পক্ষে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান এবং দোয়া কামনা করেন।

আওয়ামী লীগের পক্ষে বক্তব্য দেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এরশাদ সেনাশাসক ছিলেন। তবে ইতিহাসে নজিরবিহীন যে সেনাশাসক থেকে তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন এবং টিকে ছিলেন। দুবার করে পাঁচটি আসনে জিতেছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রতিটি মানুষের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। মানুষ হিসেবে এরশাদ চমৎকার ছিলেন, তাঁর ব্যবহার মানুষকে মুগ্ধ করেছে।’

জানাজায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুর-ই-আলম চৌধুরী। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ছিলেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুবউল আলম হানিফ ও মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও জি এম সিরাজ। জাতীয় পার্টির নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলের সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মুজিবুল হক চুন্নু ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এরশাদ-রওশনপুত্র সাদ এরশাদও জানাজায় শরিক হন।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জানাজায় গতকাল সংসদ ভবন এলাকায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের আলাপ করতে দেখা যায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

দুপুর ১২টায় এরশাদের মরদেহ কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আনা হয়। এ সময়ে সেখানে উপস্থিত বহুসংখ্যক নেতাকর্মী কান্নায় ভেঙে পড়ে। অনেককে বিলাপ করতে শোনা যায়। জাতীয় পার্টির পক্ষে সংগঠনের চেয়ারম্যানের মরদেহ গ্রহণ করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জি এম কাদের) ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। এ সময় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা সারিবদ্ধ হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে প্রয়াত নেতার কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। প্রথমে জাতীয় পার্টির পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জি এম কাদের ও মসিউর রহমান রাঙ্গা। পটুয়াখালী জেলা জাতীয় পার্টির পক্ষে শ্রদ্ধা জানান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও নাসরিন জাহান রত্না এমপি। সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে এরশাদের কফিনে শ্রদ্ধা জানান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তবে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেননি রওশন এরশাদসহ তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত নেতারা। বিকেল ৩টায় এরশাদের মরদেহ তৃতীয় দফা জানাজার জন্য নেওয়া হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। চোখের জলে দলীয় কার্যালয়ে এরশাদকে শেষবিদায় জানায় নেতাকর্মীরা। এ সময়ে অফিসের কর্মচারীরা চিৎকার করে কাঁদছিলেন। চোখ অশ্রুসজল ছিল অনেক নেতারও। তৃতীয় জানাজার আগে বড় ভাই সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পক্ষে ক্ষমা চান জি এম কাদের। এ সময় তিনি এরশাদ সরকারের আমলে গৃহীত ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। জাতীয় পার্টির মহাসচিব রাঙ্গা সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করে শোনান এবং তাঁর জন্য সবার কাছে দোয়া চান। জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন।

আজ সকাল ১০টায় এরশাদের মরদেহ হেলিকপ্টারযোগে রংপুর নেওয়া হবে। রংপুর জেলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে হেলিকপ্টারযোগে ফের ঢাকায় আনা হবে মরদেহ, এরপর বিকেলে ঢাকার সামরিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।

এরশাদের মরদেহ রংপুরে রেখে দেওয়ার ঘোষণা

এদিকে রংপুর অফিস জানায়, প্রতিবছর ঈদুল আজহাতে যে মাঠে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন এরশাদ, সেই মাঠে আবারও আসছেন তিনি। কিন্তু এবার কোনো কথা বলতে নয়, নিথর দেহ হয়ে শেষ বিদায় নিতে আসছেন। আজ মঙ্গলবার সকালে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মরদেহ রংপুরে আনা হবে। বাদ জোহর রংপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে চতুর্থ জানাজা শেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে মরদেহ। জানাজা শেষে মরদেহ আবার হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় নিয়ে বাদ জোহর সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। অন্যদিকে রংপুরে দাফনের দাবিতে এরশাদের মরদেহ আটকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে উত্তরবঙ্গ জাতীয় পার্টি (রংপুর ও রাজশাহী)। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও তাঁর মরদেহ রংপুরে রেখে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন উত্তরবঙ্গ জাতীয় পার্টির নেতারা। রংপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে জানাজা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্যান্ডেল নির্মাণ, মাইক স্থাপন ও মাঠ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে।

এদিকে যেকোনো মূল্যে এরশাদের দাফন রংপুরেই করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে উত্তরবঙ্গ জাতীয় পার্টি (রংপুর ও রাজশাহী)। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও তাঁর মরদেহ রংপুর থেকে নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন নেতাকর্মীরা। রাজধানীর সামরিক কবরস্থানে সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধানের দাফনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার দুপুরে রংপুরে অনুষ্ঠিত জাতীয় পার্টির উত্তরবঙ্গ প্রতিনিধিসভায় নেতারা এ ঘোষণা দেন। নগরীর সেন্ট্রাল রোডের দলীয় কার্যালয়ে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার সভাপতিত্বে ওই সভায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ঊর্ধ্বতন নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় মেয়র মোস্তফা বলেন, জীবদ্দশায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে কোনো দিন ভালোভাবে রাজনীতি করতে দেওয়া হয়নি। মৃত্যুর পরও তাঁকে এবং তাঁর দলকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্নসহ দলকে নিশ্চিহ্ন করতে সামরিক কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এরশাদের দাফন রংপুরে করার লক্ষ্যে কবরও খোঁড়া হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে রংপুর সিটি মেয়র মোস্তফার নেতৃত্বে নগরীর দর্শনা মোড়ে এরশাদের পল্লীনিবাস বাসভবনসংলগ্ন লিচুবাগানে কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করে জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। বিকেল পৌনে ৪টার কবর খোঁড়া শুরু হয়ে ৫টার কিছু পরে শেষ হয়।

মন্তব্য