kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

খুনিদের বাঁচাতে অপতৎপরতা চলছেই

মিন্নির দুর্নাম রটাতে মাঠে এমপিপুত্র সুনাম

রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল ও সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

১৫ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মিন্নির দুর্নাম রটাতে মাঠে এমপিপুত্র সুনাম

রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার পর এমন নৃশংসতায় গোটা দেশ যখন স্তম্ভিত, বিচার দাবিতে সোচ্চার, ঠিক তখনই আসামিদের পক্ষে নামে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতারা। এরই অংশ হিসেবে চেষ্টা চলতে থাকে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা ছিদ্দিকা মিন্নিকে খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার নানা পাঁয়তারা। যে সাহসী নারী তাঁর স্বামীকে বাঁচাতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একাই খালি হাতে লড়েছিলেন। ঘটনার পরের দিন এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিন্নিকে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত করে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। এ নিয়ে কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন ও নানাভাবে সমালোচনা শুরু হলে এমপিপুত্র পিছপা হন।

কিছুদিন চুপ করে থাকলেও এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথ থেমে থাকেননি। মিন্নির পিছুও ছাড়েননি। মিন্নির দুর্নাম রটাতে এখন রীতিমতো মাঠে নেমেছেন সুনাম। অভিযোগ রয়েছে, এমপিপুত্রের চাপে রিফাতের বাবা সংবাদ সম্মেলন করে খুনের নেপথ্যে মিন্নির সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। এখানেই শেষ নয়, এমপিপুত্র খুনিদের বাঁচাতে মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল রবিবার বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন। সেখানে এমপিপুত্র তাঁর বক্তব্যে মিন্নিকে আইনের আওতায় আনার দাবিও জানান। অথচ তিনি তাঁর বক্তব্যে একটিবারও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার বা গ্রেপ্তারকৃতদের শাস্তি নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি। দেশ তোলপাড় করা এমন ঘটনায় এমপিপুত্রের এমন অবস্থান ব্যাপক সমলোচনার জন্ম দিলেও তিনি জড়িতদের বাঁচাতেই মাঠে নেমেছেন এমন মন্তব্য এখন বরগুনাবাসীর।

মিন্নির বিরুদ্ধে মানববন্ধন

মিন্নিকে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের দাবিতে রবিবার বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বরগুনা সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হলেও এমপিপুত্র সুনাম ছিলেন নেপথ্যের কারিগর। বরগুনা-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষযক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথের বক্তব্যে এবং অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিই তার প্রমাণ দেয়। সুনামের যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাঁরা অংশ নেন, তাঁদেরকেই ওই মানববন্ধনে দেখা গেছে। মানববন্ধনের একটা বড় সময়জুড়েই সুনাম দেবনাথ বক্তব্য দেন। এ ছাড়া রিফাতের বাবা আর চাচা সাদামাটা ধরনের সংক্ষিত বক্তব্য দেন।

সুনাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘রিফাতের পরিবার সংবাদ সম্মেলনে মিন্নির বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো তুলেছে, এর বড় ধরনের তদন্ত হওয়া দরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ছবি এবং ভিডিও দেখা যাচ্ছে, তাতে আমাদের সবার মনে হয় এর তদন্ত হওয়া দরকার। এরপর কে আইনের আওতায় আসবে কি আসবে না, তদন্তেই তা বেরিয়ে আসবে।’

সুনার তাঁর বক্তব্যের কোথাও মিন্নির নাম উচ্চারণ করেননি। রিফাতের বাবার প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে সুনাম বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেকেই খুনিদের ব্যাপারে প্রশাসনকে কোনো তথ্য দিইনি। তাদের কেউ কেউ নিজেদের কাছে অপরাধীদের লুকিয়েও রেখেছি।’ সুনাম আরো বলেন, ‘রিফাত হত্যার ব্যাপারে পুলিশ তাদের সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করেছে। আমরা যতটুকু পেরেছি, পুলিশ প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছি।’

শনিবারের প্রেস কনফারেন্সকে ইঙ্গিত করে সুনাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘রিফাত শরীফের পরিবারও তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করতে চাচ্ছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই মামলার তদন্তের স্বার্থে, আরো অগ্রগতির স্বার্থে তিনি (রিফাতের বাবা) যে অভিযোগগুলো করেছেন, সেগুলো তাদের (পুলিশ) নজরে আসা উচিত বলে আমি মনে করি। তিনি আরো বলেন, রিফাত হত্যার বিচার হচ্ছে। ভালোভাবেই হচ্ছে। তবে আরো ভালোভাবে হতে হবে, এটাই আমাদের কামনা।’

মিন্নির সংবাদ সম্মেলন 

০০৭ সেভেন গ্রুপ সৃষ্টিকারীরা ক্ষমতাবান ও অর্থশালী। তারা নিজেরা আড়ালে থাকতে রিফাত হত্যার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। আমার শ্বশুরকে চাপ প্রয়োগ করে আমার বিরুদ্ধেই সংবাদ সম্মেলন করিয়ে আমাকে হত্যায় জড়িত করার চেষ্টা করছে।

গতকাল দুপুরে নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুর অসুস্থ, তিনি ছেলের শোকে বিধ্বস্ত। আর এ সুযোগে প্রভাবশালীরা তাঁকে চাপ প্রয়োগ করে নিজেরা বিচারের আওতামুক্ত থাকতে আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করিয়েছেন।’

নিজেকে নির্দোষ দাবি করে মিন্নি বলেন, ‘ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে রিফাত কলেজে ঢুকে আমাকে বলেছিল, তার বাবা দুলাল শরীফ এসেছেন। কলেজ গেটে এসে শ্বশুরকে না দেখে আবার কলেজে ঢুকতে চেয়েছিলেন মিন্নি। তখনই রিশান ফরাজীসহ আরো অনেকেই তাঁর স্বামী রিফাত শরীফকে ঝাপটে ধরে কলেজের বাইরে রাস্তায় নিয়ে যান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিল-ঘুষি, পরবর্তীতে কোপানো শুরু করে।’

মুঠোফোনে মিন্নি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। তখন চিৎকার করে সবার সহযোগিতা চেয়েছি। কই কেউ তো আমার স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো না। আজ আমাকে একটি মহল বিচারের আওতায় আনার কথা বলছে। আমার শ্বশুরযাদের কথায় আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন, তারা কারা। কাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিত তারা। তা বরগুনাবাসী জানে। মূলত আসামিদের বাঁচানোর জন্যই আমার দিকে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’ 

রিফাত খুনের আগের দিন নয়ন বন্ডের বাসায় মিন্নি গিয়েছিলেন বলে মিডিয়াতে নয়ন বন্ডের মায়ের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে মিন্নি বলেন, ‘২৫ জুন দুপুরে রিফাতের ফুফাতো বোন হ্যাপির চরকলমীর এলাকার বাসায় রিফাতের পুরো পরিবার গিয়েছিল। আমিও তাদের সঙ্গে ছিলাম। সন্ধ্যার দিকে রিফাত আমাকে বাসায় রেখে ওর গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। একজন সন্ত্রাসীর মায়ের এমন বক্তব্যে শুধু আমি নই, পুরো নারীসমাজ বিব্রত।’ 

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মেয়ের বিরুদ্ধে বরগুনা প্রেস ক্লাবে নিহত রিফাত শরীফের বাবা সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনের আগে-পরে কারা প্রেস ক্লাবে গিয়েছিল। কিসের জন্য গিয়েছিল। তা বরগুনার সাংবাদিকরা জানেন। এখন প্রশ্ন হলো, আমার মেয়ে বিধবা হলো। আবদুল হালিম দুলাল শরীফ তাঁর ছেলে হারালেন। দুটি পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত। আপনারা যাঁরা মিন্নির দিকে আঙুল তুলছেন, তাঁদের স্বার্থ আসামিদের বাঁচানো। কারণ তারা তো আপানাদের সৃষ্টি। তারা জেলে থাকলে আপনাদের শক্তি কমে যাবে। আপনাদের শক্তি ধরে রাখতেই মিন্নিকে ফাঁসাতে চাইছেন আপনারা।’ 

মিন্নির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন এবং মানববন্ধন প্রসঙ্গে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে  যা যা প্রয়োজন আইনানুগভাবে আমরা সে ব্যবস্থা নেব। মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাদের খুব তাড়াতাড়ি গ্রেপ্তার করা হবে।’

 

 

মন্তব্য