kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

রাজশাহীতে অনুমোদনহীন ওষুধ দেদার বিক্রি হচ্ছে

প্রতারিত সাধারণ মানুষ

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজশাহীতে অনুমোদনহীন ওষুধ দেদার বিক্রি হচ্ছে

রাজশাহী নগরীর তেরোখাদিয়া মোড় এলাকায় কামারুজ্জামান বিভাগীয় স্টেডিয়ামের সামনে গোল হয়ে বসা দুই শতাধিক সাধারণ মানুষ। গান শুনছিল তারা। বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মাইকে গান গাইছিলেন কয়েকজন শিল্পী। দুই-তিনটি গান শেষ হতেই মাইক্রোফোন হাতে নেন একজন  মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি। এরপর একটি ওষুধের পাতা বের করে নাটকীয়ভাবে কয়েকবার কসম কেটে বললেন, এই ওষুধটি তিনি নিজেও সেবন করেন। ওষুধটির নাম ‘ক্যাল এক্স’। তৈরি করেছে হাইম্যাক ইউনানি ল্যাবরেটরিজ। বাজারে ওষুধটির এক প্যাকেটের

 দাম ৩০০ টাকা। প্রচারের স্বার্থে তিনি দাম নেন মাত্র ৫০ টাকা। ওষুধটি বাত, ব্যথাসহ বিভিন্ন রোগের উপশম করে।

এরপর উপস্থিত কয়েকজন ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিনা মূল্যে একটি করে ট্যাবলেট খাওয়ানো হলো। এভাবে নানা ছলচাতুরী করে শখানেক মানুষের কাছে দুই প্যাকেট করে ওষুধ ১০০ টাকা মূল্যে বিক্রি করল  ওই ব্যক্তি।

কথা প্রসঙ্গে পরে জানা গেল ওই ব্যক্তির নাম আবুল হোসেন রানা। ওষুধটি বেশ উপকারী, তাই তিনি ফেরি করে গ্রামগঞ্জে, শহরের পাড়া-মহল্লায় মাইক বাজিয়ে বিক্রি করেন।

ওষুধটি তিনি নিজে তৈরি করেন না। ঢাকায় উত্পাদিত ওষুধটি কম্পানির হয়ে তিনি বিক্রি করেন। ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি না জানতে চাইলে বললেন, না হওয়ারই কথা। ওষুধটির সরকারি অনুমোদন আছে কি না, আদৌ নানা ধরনের রোগবালাইয়ের উপশম হয় কি না, ওসব জানেন না তিনি। অথচ প্রতিদিন শত শত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে বিক্রি করা হচ্ছে ওষুধটি। হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা।

আবুল হোসেন রানার ওই ওষুধ বিক্রি দলে তিনজন শিল্পীসহ রয়েছেন ছয়জন। প্রতিদিন তাঁরা রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অসচেতন মানুষের কাছে বিক্রি করছেন অনুমোদনহীন ওই ওষুধ। 

রাজশাহী অঞ্চলের হাট-বাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে, পাড়া-মহল্লায় এভাবে প্রতিদিন শতাধিক হকার নানা ধরনের রোগবালাই উপশমের নামে বিচিত্র ধরনের ওষুধ বিক্রি করছে। অনুমোদনহীন এসব ওষুধ কিনে প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে হাজারো মানুষ। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে। এসব হকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন নীরব। এতে একদিকে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, অন্যদিকে প্রতারিত হয়ে পকেট খালি হচ্ছে সাধারণ মানুষের।

তেরোখাদিয়া মোড়ে ওষুধ বিক্রির সময় কথা হয় ওই এলাকার বাসিন্দা আলী আকবরের সঙ্গে। পেশায় রিকশাচালক আলী আকবর জানান, এর আগেও বিভিন্ন সময় হকারদের কাছ থেকে তিনি কোমরের ব্যথাসহ বিভিন্ন রোগবালাইয়ের ওষুধ কিনেছেন। কিন্তু কখনো উপকার পাননি। তার পরও অল্প টাকায় পাওয়া যায় বলে আবারও দুই প্যাকেট ট্যাবলেট কিনলেন হকার আবুল হোসেন রানার কাছ থেকে।

বারবার ঠকার পরও কেন কিনছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভালো ডাক্তারের কাছে গেলে ৬০০-৭০০ টাকা ভিজিট দিতে হয়। তারপর দেয় ওষুধ। সেসবের অনেক দাম। এত টাকা তিনি কোথায় পাবেন! ফলে ভালো হওয়ার আশায় যখন যে হকার পান, তাঁর কাছ থেকে ওষুধ কেনেন।’

রাজশাহীর কোর্ট চত্বর, বানেশ্বর বাজার, দুর্গাপুর বাজার, তাহেরপুর বাজার, কাঁকনহাট বাজারসহ এ অঞ্চলের বড় বড় হাটের দিন শতাধিক হকার নানা রোগবালাইয়ের নামে অনুমোদনহীন বিভিন্ন ধরনের ওষুধ বিক্রি করছেন। কেউ ভ্যানে করে, কেউ মাইক্রোবাসে করে, আবার কেউ নানা বাহানায় জটলা পাকিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করছেন অনুমোদনহীন ওষুধ।

রাজশাহীর কোর্ট চত্বরে এ রকম অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি করা হকার সেলিম হোসেন জানান, ২০-২৫ বছর ধরে তিনি এই কোর্ট চত্বরে ওষুধ বিক্রি করছেন। মানুষ উপকার পায় বলেই তাঁর কাছ থেকে কিনছে।

রাজশাহীর সিভিল সার্জন কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘হাট-বাজারে হকারদের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া এসব ওষুধে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে, তেমনি রয়েছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। এই শ্রেণির মানুষ আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় বারবার ছুটে যায় এসব হকারের কাছে। হকারদের প্রলোভনে পা দিয়ে প্রতারিত হন অনেক শিক্ষিত ও ধনিক শ্রেণির মানুষও। হকারদের কোনো ওষুধই মানসম্মত নয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

মন্তব্য