kalerkantho

রিফাত ফরাজীর হত্যা

প্রস্তুতি নিয়েই হামলা, নেতৃত্ব ও প্রথম আঘাত

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রস্তুতি নিয়েই হামলা, নেতৃত্ব ও প্রথম আঘাত

রিফাত ফরাজী

আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে বরগুনায় রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ প্রস্তুতির নেতৃত্ব দিয়েছে রিফাত ফরাজী। সে একাই দুটি ধারালো অস্ত্র বহন করেছিল। এর একটি অস্ত্র দিয়েছিল হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডকে। রিফাত শরীফকে প্রথম আঘাত করে রিফাত ফরাজীই।

বরগুনা সরকারি কলেজের ফটকের সামনে থেকে রিফাতকে ধরে নিয়ে রাস্তার অন্য পাশে প্রায় ২০ গজ দূরে কুপিয়ে জখম করার পুরো ঘটনাটি ঘটেছে ১৫ মিনিটে। এরপর ঘাতক ও তাদের সহযোগীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

গত ২৬ জুন রিফাত শরীফকে স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্যে কোপানোর ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল মোবাইল ফোনে। এ ঘটনার আরেকটি ভিডিও পাওয়া গেছে। এটি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরায় ধারণা করা। নতুন এ ভিডিওতে হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া রিফাত ফরাজী ও তার সহযোগীদের পুরো তৎপরতা ধরা পড়েছে।

নতুন এ ভিডিওটি কারা ছেড়েছে, সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারছে না। তবে নতুন এ ভিডিওতে রিফাতকে কোপানোর আগের ঘটনাটি দেখা গেছে। যেটা মোবাইল ফোনে প্রথম ধারণ করা ডিভিওতে দেখা যায়নি। নতুন ভিডিওতে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য রিফাত ফরাজী ও তার সহযোগীদের প্রস্তুতি নেওয়া থেকে শুরু করে হামলার দৃশ্য দেখা গেছে।

রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এজাহারের ২ নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী। সে বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। গ্রেপ্তারের পর তাকে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তার আরেক ভাই রিশান ফরাজী এজাহারভুক্ত ৩ নম্বর আসামি। সে এখনো পলাতক। এর মধ্যে খুনের ঘটনার পরিকল্পনাকারী ও ঘাতক নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।

রিফাত হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ুন কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় অন্তত ২০ জন অংশ নিয়েছিল। তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভিডিও ফুটেজ দেখে এমন ১৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরোক্ষভাবে জড়িত আরো পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ১০ জনের মধ্যে ছয়জন খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

রিশান ফরাজীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে ওসি জানান।

বরগুনার স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে রিফাত খুনের ঘটনার নতুন একটি ভিডিও এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, রিফাত হত্যার পরিকল্পনাকারী নয়ন বন্ড হলেও রিফাত ফরাজী হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সকাল ১০টায় রিফাত শরীফ তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিতে একটি সাদা মোটরসাইকেলে করে বরগুনা সরকারি কলেজে আসেন। ১০টা ৩ মিনিটে বন্ড ০০৭ গ্রুপের দ্বিতীয় প্রধান রিফাত ফরাজী ছয় সহযোগীকে নিয়ে কলেজের ফটকের সামনে অপেক্ষা করছে। এর দু-এক মিনিট পর সে তিন সহযোগীকে কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতর পাঠায়। সকাল ১০টা ৯ মিনিটে ওই তিনজন তাদের আরো কয়েকজন সহযোগীসহ কলেজ থেকে বেরিয়ে কলেজের ক্যান্টিনের বিপরীত দিকে সড়কে অবস্থান নেয়। এক মিনিট পর রিফাত ফরাজী ফটকের কাছে এসে অন্য দুই সহযোগীকে কিছু নির্দেশ দিয়ে উল্টো দিকে পাঠায়। সকাল ১০টা ১২ মিনিটে কলেজ থেকে বেরিয়ে রিফাত শরীফ গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখনই তাঁকে রিফাত ফরাজী সহযোগীদের নিয়ে ধরে নিয়ে যায় বন্ড ০০৭ গ্রুপের প্রধান নয়ন বন্ডের কাছে। নয়ন কলেজ ফটক থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে রাস্তার অন্য পাশে অপেক্ষা করছিল। নয়নের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর রিফাত ফরাজীর সহযোগীরা রিফাত শরীফকে কিল-ঘুষি দিতে থাকে। সরকারি কলেজের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত ক্যালিক্স একাডেমির গাড়ির গ্যারেজের বেড়ার ফাঁকে আগেভাগেই অস্ত্র রাখা ছিল। রিফাত ফরাজী ছুটে গিয়ে সেখান থেকে দুটি রামদা নিয়ে আসে। এর একটি দেয় নয়নকে, অন্যটি দিয়ে সে নিজেই রিফাত শরীফকে কোপাতে শুরু করে। তখন আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি তাঁর স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তাদের সহযোগীরাও পালিয়ে যায়। তখন রিফাত শরীফ একটি রিকশার ওপর ঢলে পড়েন। পাশে থাকা মিন্নি তাঁকে নিয়ে সেই রিকশায় করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের দিকে চলে যান।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হত্যা মামলার আরেক আসামি অলি আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, হত্যার আগের দিন পরিকল্পনা করা হয়। সে অনুযায়ী সে রাকিবুল ইসলাম রিফাতের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র কলেজ রোডে থাকা রিফাত ফরাজীর কাছে পৌঁছে দেয়। পরে ওই অস্ত্র দিয়ে রিফাত ফরাজী, রাকিবুল ইসলাম রিফাত ও টিকটক হৃদয় নয়ন বন্ডের সঙ্গে হামলায় অংশ নেয়। সে হত্যাকারীদের সহযোগিতা করে বলে অলি জবানবন্দিতে জানিয়েছে।

আমাদের বরগুনা প্রতিনিধি জানান, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ১২ নম্বর আসামি টিকটক হৃদয় ও সন্দেহভাজন রাফিউল ইসলাম রাব্বিকে দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল শনিবার বিকেলে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে গত ২ জুলাই একই আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ুন কবীর বলেন, টিকটক হৃদয় ও রাফিউল ইসলাম রাব্বিকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মন্তব্য