kalerkantho

ছাতক কংক্রিট স্লিপার কারখানা

সরকারি উৎপাদন বন্ধ রেখে ঝোঁক বিদেশ বেসরকারিতে!

পার্থ সারথি দাস ও শামস শামীম ছাতক থেকে ফিরে   

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সরকারি উৎপাদন বন্ধ রেখে ঝোঁক বিদেশ বেসরকারিতে!

দেশের একমাত্র সরকারি রেল স্লিপার কারখানাটি বিভিন্ন জেলার রেলপথের মতোই জীর্ণ-দীর্ণ। প্রায় তিন দশক বয়সী ‘ছাতক কংক্রিট স্লিপার কারখানা’য় তিন মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। মিটারগেজ রেলপথের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই কারখানায় উৎপাদিত স্লিপার ব্যবহার করা হয়ে আসছে। অভিযোগ আছে, ভারত ও চীন থেকে স্লিপার আমদানি এবং বেসরকারি দুটি কারখানার কংক্রিট স্লিপার বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতেই প্রতিবছর একাধিকবার বন্ধ রাখা হচ্ছে কারখানাটি। বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে তা হচ্ছে। তবে প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে, দরপত্র আহ্বানে বিলম্ব, কাঁচামাল সংকটের কারণে কারখানাটির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় এ কারখানা সংস্কার করে আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে এবং পশ্চিমাঞ্চলে নতুন কংক্রিট স্লিপার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। গত বছরের জুনে রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন এ কারখানায় গিয়ে অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু অবস্থার উন্নয়ন ঘটেনি এক বছরেও। গত সপ্তাহে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারখানাটি বন্ধ। ছাতক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘সরকারি কারখানাটি লুটপাটে বন্ধ হয়ে গেছে।’

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে ১২ কোটি ২১ লাখ টাকায় ছাতক রেলস্টেশনের কাছে ছয় একর জমির ওপর কংক্রিট স্লিপার কারখানাটি স্থাপন করে রেলওয়ে। ১৯৮৮ সালের মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এবং পরে ২৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। বছরে ২৪০ কোটি টাকা দামের স্লিপার উৎপাদনের সক্ষমতা আছে কারখানাটির। প্রধান কাঁচামাল ইস্পাতের রড ও পাত আমদানি করা হয় ভারত থেকে। তার সঙ্গে ছাতক সিমেন্ট কারখানার বিশেষ সিমেন্ট ও পাশের ভোলাগঞ্জের পাথর, বালু ব্যবহার করে তৈরি করা হতো উন্নত মানের স্লিপার। প্রথম ২৫ বছরে কাঁচামাল সংকটে পড়ে বছরে একাধিকবার বন্ধ হয় কারখানা। ছয় বছর আগে বেসরকারি দুটি কারখানার কংক্রিট স্লিপার এবং এ সরকারি কারখানার স্লিপার নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বেসরকারি কারখানার স্লিপারগুলো নিম্নমানের।

জানা গেছে, উৎপাদন হলেও স্লিপার সরবরাহের জন্য এখানে রেলওয়ের ওয়াগন ও ইঞ্জিন রাখা হয় না। লৌহজাত পণ্যের আমদানি খরচ বাড়ার কারণ দেখিয়ে ২০১০ সালে এক দফা বন্ধ রাখা হয় কারখানাটি। কেনা হয় বিদেশ থেকে কাঠের স্লিপার। এখন নষ্ট হচ্ছে কারখানার ভয়লা, কার্সার, মিকশ্চার, ভাইব্রেটর, প্রিসটেনিং, ভাণ্ডার, কংক্রিটিংয়ের মতো মূল্যবান যন্ত্র।

কারখানার স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর কাছ থেকে চাহিদা পাওয়ার পর উৎপাদন শুরু করা হয় কারখানায়। সর্বশেষবার ১৫ হাজার স্লিপার উৎপাদন করা হয়েছে এ কারখানায়। গত ১৯ মার্চ থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে কারখানাটিতে। এ কারখানা আধুনিক ও মানসম্মতভাবে গড়ে তুলতে সুপারিশমালা তৈরির জন্য গত মাসে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে (সেতু) প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠিন করা হয়। কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে আগস্ট মাসের মধ্যে। কমিটির এক সদস্য, কারখানার সহকারী প্রকৌশলী মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘যাতে এই কারখানা উৎপাদনক্ষম করে তোলা যায় সে জন্যই সুপারিশ তৈরি করবে কমিটি। কারখানায় উৎপাদন একেবারে বন্ধ হয়নি। আমরা সর্বশেষ ১৫ হাজার কংক্রিটের স্লিপার উৎপাদন করেছি।’

কারখানা সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদন চালু থাকলে গড়ে প্রতিদিন ২০০-২৫০টি স্লিপার উৎপাদন হয়। তবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কখনোই কারখানাটি স্লিপার উৎপাদন ও বিতরণ করতে পারেনি। বর্তমানে স্লিপার উৎপাদন বন্ধ থাকায় মজুদও ফুরিয়েছে। শুধু জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য কিছু স্লিপার রাখা আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতিবছর এলসি করে পাথর আমদানির জন্য সরকারিভাবে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। কারখানা-ইয়ার্ডে স্লিপার তৈরির প্রধান উপকরণ পাথরের মজুদ শেষ হয়ে গেলে গত মার্চে উৎপাদন বন্ধ হয়। এর আগে জানুয়ারিতেও একবার মিকশ্চার মেশিনে ত্রুটির ফলে উৎপাদন বন্ধ ছিল কিছুদিন।

কারখানার ১৫৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে কর্মরত ৪৫ জন। অপারেটরের ১৮টি পদই শূন্য। উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কারখানার ওয়েল্ডার, বয়লার অপারেটর, কাস্টিং মেশিন অপারেটর, মিকশ্চার মেশিন অপারেটর, গেন্টি অপারেটর নেই। এ ছাড়া গ্যাস কাটার, ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট, টেনশনিং মেশিন অপারেটর, ওয়েজেস অ্যান্ড ব্যারেল অপারেটর, রড কাটিং অপারেটর, ডিমোন্ডিং অপারেটরসহ গুরত্বপূর্ণ যন্ত্রের চালকও নেই। নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। 

কর্মচারীরা জানান, স্লিপারের প্রধান উপকরণ বোল্ডার পাথর। একসময় পাশের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ থেকে রোপওয়ে দিয়ে তা নিয়ে আসা হতো। কিন্তু দেড় যুগ ধরে সেখানে বোল্ডার পাথর মিলছে না। ফলে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে পাথর। রোপওয়ে বন্ধ রয়েছে।

রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এ কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এখন মিটারগেজে ব্যবহার উপযোগী স্লিপার এ কারখানা থেকে নেওয়া হয়। ভবিষ্যতে যাতে ব্রডগেজ ও ডুয়াল গেজ রেলপথেও এখানকার কংক্রিট স্লিপার ব্যবহার করা যায় তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কারখানার সহকারী প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান অবশ্য দাবি করেন, ঠিকাদার নিয়োগে জটিলতায় উৎপাদন বন্ধ আছে। উৎপাদন ঠিকাদার ও কাঁচামাল ঠিকাদার নিয়োগের জন্য পূর্ব রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দরপত্রসংক্রান্ত ফাইল পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত এলে এবং চাহিদা পাঠালে উৎপাদন করা হবে স্লিপার।

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুসারে, দেশে রেলপথ আছে দুই হাজার ৯২৯ কিলোমিটার। তার মধ্যে মান আছে ৭৩৯ কিলোমিটার বা ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশের। রেলপথের মান কমার অন্যতম কারণ কংক্রিটের স্লিপারের সংকট। কাঠের স্লিপার পচে নষ্ট হয়ে গেছে বিভিন্ন স্থানে। ফলে চালকরা কম গতিতে ট্রেন চালাচ্ছেন। কাঠের স্লিপারের চেয়ে কংক্রিটের স্লিপারের স্থায়িত্ব বেশি। রেলপথ নির্মাণ ও সংস্কারে বছরে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার কংক্রিট স্লিপারের দরকার। তার মধ্যে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে গড়ে ৬০ কোটি টাকার স্লিপার কেনে রেলওয়ে। এর দুই-তৃতীয়াংশই কংক্রিটের স্লিপার। নতুন প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য বছরে কেনা হয় ৫০ কোটি টাকার কংক্রিটের স্লিপার। কাঠের স্লিপারের স্থায়িত্ব ১০-১২ বছর। কংক্রিটের স্লিপার টেকে ৩০ বছরের বেশি।

মন্তব্য