kalerkantho

পাঁচ সমস্যায় হাবুডুবু ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান

শরীফুল আলম সুমন ও তানজিদ বসুনিয়া   

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাঁচ সমস্যায় হাবুডুবু ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’—এ গানটি ঢাকা কলেজেরই এক ছাত্রাবাসে বসে লিখেছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ঐতিহ্যবাহী এই কলেজেই পড়েছেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, মালদ্বীপের সাবেক রাষ্ট্রপতি মামুন আবদুল গাইয়ুম, বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদসহ বহু বিশিষ্টজন। একসময় দেশের এক নম্বর কলেজ বলতে ঢাকা কলেজকেই বোঝাত। কিন্তু সেই সুনাম এখন আর নেই। ১৮৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকা কলেজে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। উঠে আসে নানা সমস্যার কথা। শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার, পরিবহন ও আবাসন সংকটের পাশাপাশি রয়েছে সেশনজটও।

জানা যায়, ঢাকা কলেজে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার আর শিক্ষকের সংখ্যা ২২৪। কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স রয়েছে। তিনটি অনুষদের অধীনে রয়েছে ১৯টি বিভাগ। আর শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার জন্য রয়েছে ৯টি গ্যালারি ও ৪২টি শ্রেণিকক্ষ। উচ্চ মাধ্যমিকের দুটি বর্ষ, স্নাতকের চারটি বর্ষ ও স্নাতকোত্তরের একটি বর্ষ রয়েছে। মোটামুটিভাবে একেকটি বিভাগের জন্য শ্রেণিকক্ষ পাওয়া যায় দুটি। শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস হয় না। এ ছাড়া বছরজুড়েই থাকে কোনো না কোনো বিভাগের পরীক্ষা। এতে অর্ধেক শ্রেণিকক্ষেই পাঠদানের সুযোগ হয় না। দেখা যায় বছরে মাত্র কয়েক মাস ক্লাস করেই পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। নিয়মিত পাঠদানের জন্য বর্তমানে যা আছে তার অন্তত তিন গুণ শ্রেণিকক্ষ দরকার বলে জানান শিক্ষকরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভর্তি হওয়ার এক বছর হতে চলল। অথচ ক্লাস হয়েছে দুই মাসেরও কম। আমাদের ক্লাস নেওয়া হয় যে হলরুমে সেটি বছরের অর্ধেক সময় ব্যস্ত থাকে অন্যান্য ব্যাচের পরীক্ষার জন্য। প্রত্যেক বছর চার-পাঁচটি ব্যাচের পরীক্ষার জন্য হলরুমটি ব্যস্ত থাকে। আমরাও নিশ্চিতভাবে সেশনজটে পড়তে যাচ্ছি।’

বর্তমানে কলেজটিতে সেশনজট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এখন কলেজে স্নাতকের চারটি ও স্নাতকোত্তরের একটিসহ মোট পাঁচটি ব্যাচের শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও স্নাতকে ছয়টি ও স্নাতকোত্তরে তিনটিসহ মোট ৯টি ব্যাচ রয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকার সময়ই এই সেশনজটের সৃষ্টি হয়। এরপর কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গেলে তাদের প্রস্তুতির কারণে সেশনজট আরো দীর্ঘ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সেশনজটের কবলে পড়েছে বাংলা, ইংরেজি, দর্শন, ইসলামের ইতিহাসসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে দর্শন বিভাগে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন তবিবুর রহমান। এ বছর ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা যখন ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন তিনি নিশ্চিত নন কবে নাগাদ শেষ হবে তাঁর পড়াশোনা। নিজের হতাশার কথা জানিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার যে বন্ধুরা একই শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল তাদের মাস্টার্স শেষ হয়েছে আরো তিন বছর আগে। অনেকেই দুই-তিন বছর ধরে চাকরি করছে, অথচ আমি সবেমাত্র মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা শুরু করলাম।’

জানা যায়, ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ছোট দুটি কক্ষে গ্রন্থাগারের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যেখানে ৩০ থেকে ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসতে পারে না। আর সান্ধ্য গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুযোগও শিক্ষার্থীদের নেই।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য পদ্মনীল (মিরপুর), শঙ্খনীল (যাত্রাবাড়ী), পুষ্পক (গাজীপুর) ও শঙ্খচিল (রামপুরা) নামের চারটি বাস রয়েছে। একেকটি বাসে ৪৬ জন করে বসার ব্যবস্থা রয়েছে। চারটি বাসের মধ্যে প্রায়ই এক-দুটি নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে।

মিরপুর রুটে নিয়মিত যাওয়া-আসা করেন মো. নাহিদ আলম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন অনেক শিক্ষার্থী বাসে সিট না পেয়ে অন্য বাসে যাওয়া-আসা করে। যারা কলেজ বাসে যায় তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। ৪৬ জনের সিটের ব্যবস্থা থাকলেও আমরা ১২০ থেকে ১৫০ জন উঠি।’

ইতিহাস বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী দোলন আহমেদ বলেন, ‘গত মার্চ মাসে পরিবহন সংকট নিরসনের দাবিতে মানববন্ধনও করা হয়েছিল। সেই সময় আমাদের জন্য বিআরটিসির বাস ভাড়া করে দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সেটি হয়নি।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক নেহাল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্লাসরুমের সংকট কাটাতে নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে। একটি ভবন চার তলা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে, যা ১০ তলা হবে। আমরা চাচ্ছি আপাতত চার তলা আমাদের কাছে হস্তান্তর করুক। তাহলে সেখানে দুটি বিভাগ শিফট করতে পারব। আর লাইব্রেরি নিচতলায় বড় পরিসরে করব। এ ছাড়া মূল ভবনটি আমাদের কলেজের ঐতিহ্য। তাই ভবনের আকৃতি ঠিক রেখে পাশে যদি একটি সুউচ্চ ভবন করা যায়, তাহলে ক্লাসরুমের সংকট দূর হবে।’

অধ্যক্ষ আরো বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীর সংখ্যার চেয়ে মানের দিকে নজর দিয়েছি। এ জন্য আমরা শিক্ষার্থী বাড়ানোর বদলে কমাচ্ছি। সেশনজটে যে শিক্ষার্থীরা রয়েছে তারা বের হয়ে গেলে আমাদের শিক্ষার্থী আরো কমে যাবে। আমরা সেশনজট দূর করতে এখন পরীক্ষা কেন্দ্র থেকেই পরীক্ষকদের খাতা বিতরণ করছি। শিক্ষকদের খাতা দেখার জন্য ১৫ দিন সময় দেওয়া হচ্ছে, এক মাসের মধ্যেই ফল দেওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যে কোনো সেশনজট থাকবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবহন সংকট কাটাতে বিআরটিসির বাস ভাড়া করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুটি বাসের পেছনে সাত লাখ টাকা খরচ করতে হবে, যা কলেজের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই আমরা উপহার বা সহায়তা হিসেবে দুটি বাস আনার চেষ্টা করছি।’

 

মন্তব্য