kalerkantho

ফাঁকতালে ফাঁকির পথ এড়াতে হবে

মোস্তফা মামুন, লন্ডন থেকে   

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ফাঁকতালে ফাঁকির পথ এড়াতে হবে

বাংলাদেশের সঙ্গে ইংল্যান্ডের সম্পর্ক নিয়ে বহু লেখা আছে। ‘বিলেতে অত দিন’, ‘কালাপানির ওপারে’, ‘সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে’—এ রকম শিরোনামের বইয়ের সংখ্যা কম নয়। এখন নতুন একটি বইও কেউ লিখতে পারে চাইলে—‘বিলেতে ক্রিকেট দুঃস্বপ্নের এক সপ্তাহ’। শেষ সপ্তাহে দানটা এমন ঘুরে গেল যে এখন মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপটা এক সপ্তাহ আগে শেষ হয়ে গেলেই বরং ভালো ছিল। গায়ে এই শেষের কাদাটুকু লাগে না।

এক সপ্তাহ আগের হিথরো এয়ারপোর্ট। বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলে এ দেশের ইমিগ্রেশনের লোকজন অনেক ঘুরিয়েফিরিয়ে পরীক্ষা করে। প্রশ্ন যা হয় তাতে তাচ্ছিল্য বা অপমানের ঢিল থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু এবার সবুজ রঙা পাসপোর্টটি দেখেই মুখ উজ্জ্বল, ‘ক্রিকেট?’

‘হ্যাঁ।’

‘প্লেয়িং গুড ক্রিকেট।’

‘বাংলাদেশ প্লেয়িং গুড ক্রিকেট’ কথাটি এত এত শুনতে হয়েছে যে মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ড জয় একরকম বোধ হয় হয়েই গেল। ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে হোটেলকর্মী, ব্রিটিশ বৃদ্ধ থেকে শুরু করে বেড়াতে আসা আমেরিকান—সবার কাছে পরিচয়, ‘প্লেয়িং গুড ক্রিকেট।’

এক সপ্তাহ পর গতকালের লর্ডস। মাঝখানে দুটি মাত্র ম্যাচ হয়েছে। ম্যাচে নামার আগে দল যখন ঘুরে বেড়াচ্ছিল তখনই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে বিদায়। তারপর দুই ম্যাচের হারে স্বপ্নের বিশ্বকাপটা প্রায় দুঃস্বপ্নের। কাল পাকিস্তান ম্যাচে কতজনের সঙ্গে কথা হলো।

বাংলাদেশ নিয়ে তাদের আলোচনায় আর আগ্রহ নেই। বরং পাকিস্তান যে, সে-ই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে একটি হারের কারণে সেমিফাইনালে যেতে পারল না এটিই টকিং পয়েন্ট। এক সপ্তাহ আগে মাঠের পারফরম্যান্স, বাইরের উন্মাদনা মিলিয়ে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বকাপের অলংকার। এখন যেন আবিষ্কৃত হয়েছে সেই অলংকারে খাদ মেশানো। আলোচনায়-উন্মাদনায় বাংলাদেশ হারিয়েই গেল।

তিন জয়, সঙ্গে আরেকটি বৃষ্টিজাত পয়েন্ট মিলিয়ে ৭ পয়েন্ট। বিশ্বকাপে এত পয়েন্ট বাংলাদেশ আগে কখনো পায়নি। তিনটি জয় আছে আগের, আছে আগের তিনবার, কিন্তু ভেবে দেখলে সেগুলোতে ফাঁকি আছে কিছু। আগের দুই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ বড় দল বলতে হারিয়েছে শুধু ইংল্যান্ডকে। সঙ্গে আয়ারল্যান্ড-নেদারল্যান্ড-স্কটল্যান্ড বা আফগানিস্তানের সঙ্গে জয়। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছিল, দুটিই বড় দল, কিন্তু সমস্যা হলো, পরে আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। তা ছাড়া সুপার এইটে ওঠার পর এত বড় বড় ব্যবধানে বেশির ভাগ ম্যাচে হার যে মনে আছে, মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের এক সিনিয়র ক্রিকেটার আফসোস করে বলছিলেন, ‘সুপার এইটে না উঠলেই ভালো হতো।’

‘কেন? কেন?’

‘ধরেন ভারত-বারমুডাকে হারিয়ে অঙ্কের মারপ্যাঁচে বাদ পড়ে গেলে সবাই বাহবা দিত। এখন এই  বড় বড় হারে সেই কীর্তিটা মানুষের মন থেকে মুছে যাচ্ছে।’

এই মন থেকে মুছে যাওয়া খুব গুরুতর ব্যাপার। এবারও ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে দুই ম্যাচে হেরে মন থেকে অনেক কিছু মুছে যাচ্ছে। শেষের হিসাব-নিকাশে বরং এখন সমীকরণটা দাঁড়াচ্ছে এ রকম—আমরা যাদের হারিয়েছি তারা সবাই আমাদের বিশ্বকাপে ছিল ভীষণ অবিন্যস্ত। ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম দুই ম্যাচের পর নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ওই দুই ম্যাচও লাগেনি। শুরু থেকেই নিখোঁজ। আর আফগানিস্তান তো আফগানিস্তানই। শেষের হিসাবে বাংলাদেশ ১০ দলের মধ্যে সপ্তম স্থানে (গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেওয়ার কীর্তি করলে এমনকি অষ্টম স্থানেও নেমে যাওয়া সম্ভব)। সেই হিসাবে তো গত বিশ্বকাপ ভালো। স্থান নির্ধারণী সেভাবে ছিল না বলে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা মানে ৫-৮-এর মধ্যে এবং ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর ভারতের সঙ্গে ম্যাচে আম্পায়ারিং বঞ্চনায় বাংলাদেশ ‘অবিচারের শিকার ট্র্যাজিক কিং’ হিসেবে ফিরেছিল দেশে। এবার কাগজে-কলমে এর চেয়ে ভালো করেও সেটি জুটছে না। কারণ, একে প্রত্যাশা ছিল বেশি। দ্বিতীয়ত, হিসাব করে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ এশিয়ার তিন দেশের পেছনে যখন মাত্রই গত এশিয়া কাপে বাংলাদেশ হয়েছিল রানার্স-আপ। তা-ও যেখানে চ্যাম্পিয়ন হওয়াও খুব সম্ভব ছিল।

এসবই সাধারণ হিসাব-নিকাশ। পেরিয়ে একটু ভেতরে গেলে প্রথম যে প্রশ্নটি আসে, আমাদের প্রত্যাশাটা কি তাহলে বেশি ছিল? সেমিফাইনাল-সেমিফাইনাল যে হাওয়াটা উঠেছিল, তার কি জ্বালানি সত্যিই ছিল নাকি আবেগের কাছে অঙ্ক মার খেয়ে গিয়েছিল? একটি হিসাব খুব সোজা। সাকিব যা পারফর্ম করেছেন, তার ধারে-কাছে বাকিরা থাকলে অবশ্যই সেমিফাইনাল সম্ভব ছিল। কিন্তু কেন বাকিরা পারলেন না! প্রথম ভোগাস্তি মাশরাফির ফর্ম হারিয়ে ফেলা। গত কয়েক বছরে মাশরাফির অধিনায়কত্ব কীর্তির আড়ালে তাঁর বোলিংটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু সত্যি বললে নতুন বলের মাশরাফি ছিলেন বোলিংয়ের নেতা। পাওয়ার প্লেতে তাই বিপক্ষের উইকেট পাওয়া হয়নি। ওরা চেপে বসেছে। তখন রাশ সামাল দেওয়া যায়নি। প্রায় প্রতি ম্যাচে যে তিন শ হলো, এর পেছনে মূল কারণ হলো শুরুর দিকে বিপক্ষ ব্যাটিংয়ে চেপে ধরতে না পারা। অধিনায়ক ফর্মহীন হওয়াতে দুটি সমস্যা হয়েছে। ক্রিকেটগত সমস্যাটি তো বললামই, ক্রিকেটবহির্ভূত ক্ষেত্রে মাশরাফির যে ছায়া পায় দল, তার ফর্মহীনতায় সেখানেও ঘাটতি ঘটেছে। মাশরাফি স্বীকার করবেন না কিন্তু নিজে ফর্মে না থাকলে দুশ্চিন্তা স্বাভাবিক। তাতে দলের দিকে মনোযোগ অতটা দেয়ো যায় না যতটা বাংলাদেশের এই দল দাবি করে। অনেক ম্যাচই আসলে হাতছাড়া হয়ে গেছে ম্যাচের প্রথম ভাগে। দ্বিতীয়ত, তামিম। তামিম ভূমিকা বদলে গত কয়েক বছর লম্বা দৌড়ের ঘোড়ার মতো শুরু করেন ধীরে। তারপর পুষিয়ে দেন। কিন্তু এবার তা না হওয়াতে প্রায় প্রতি ম্যাচেই মিডল অর্ডারকে চলে আসতে হয়েছে আগে। রান তাড়ার বদলে পুনর্নির্মাণে হাত দিতে হয়েছে, আর তাতে ম্যাচের অঙ্ক জটিল হয়ে গেছে। স্কোরবোর্ড তাই দেখাবে দুই-একটা ইনিংস বাদ দিলে প্রায় সব ইনিংসেই বাংলাদেশের ব্যাটিং সফল, কিন্তু ম্যাচ জেতার দৌড় বিবেচনায় নিলে অনেক ইনিংসই ছিল রোগী মারা যাওয়ার পর আসা ডাক্তারের মতো। আর ফিল্ডিং! এত প্র্যাকটিস, এত ট্রেনার-কোচ দিয়ে এই যদি হয় ফিল্ডিংয়ের মান, তাহলে পুরো সিস্টেমটি নিয়েই নতুন করে ভাবতে হবে। ভালো ফিল্ডিং শুধু রান বাঁচায় না, পুরো দলকে উজ্জীবিত করার কাজও করে। একমাত্র ফিল্ডিংটিই দলগুলো একসঙ্গে করে। একটি ভালো ফিল্ডিংয়ে দুটি কাজ হয়। রান বাঁচানো। মিলিত ইতিবাচকতার প্রকাশ। বোলারদেরও ভরসা বাড়ে যে ফিল্ডারদের সমর্থন পাচ্ছি। আবার ফিল্ডিংটি খারাপ হলে পুরো দল সম্পর্কে ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে এদের মধ্যে ক্ষুধাটা বোধহয় নেই। কিংবা বোধহয় মনসংযোগটা নড়ে গেছে। আর ফিল্ডিংয়ের কয়েকটি ভুল তো ম্যাচ নির্ধারণী।

হেরে যাওয়াতে দোষ বেরোচ্ছে! কেউ কেউ বলতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটি হলো দোষ হয় বলেই তো হারে। দোষ না থাকলে বাংলাদেশ ম্যাচগুলো জিতত। কিন্তু সেই দোষগুলো আসলে বের হতোই। কারণ, এখানে মানেরও প্রশ্ন আছে। আমরা আবেগে ভাসি বলে অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের সীমানার কথা মনে থাকে না। দক্ষিণ আফ্রিকা-ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলগতভাবে ভীষণ অবিন্যস্ত, যা বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচের পরে আরো ব্যাপকভাবে প্রমাণিত। কিন্তু পরিকল্পনায় ঋদ্ধ, চিন্তায় সমন্বিত যে দলগুলো তাদের সেরা খেলাটা খেলতে পেরেছে, তাদের কাউকে আমরা হারাতে পারিনি।

এগিয়ে থাকা এই দলগুলোকে হারাতে নিজেদের সেরা খেলাটিও বেশি খেলতে হতো। সেরার চেয়েও বেশি করতে হলে লাগে তীক্ষ পরিকল্পনা, তার নিঁখুত বাস্তবায়ন, সঙ্গে মরিয়া মনোভাব।

কিন্তু এই উপায়ে একটি টুর্নামেন্টে এক-আধটা ম্যাচে হয়। আমরাও এখানে করতে পেরেছি দুই-একটি ম্যাচে। এবং দুই-একটি ম্যাচেই হবে। সব ম্যাচে হবে না।

নিরাপদ উপায় তাই সামগ্রিক ক্রিকেট মান বাড়ানো। আর তার জন্য সবার আগে বাদ দিতে হবে অমুককে নাও, তমুক থাকলে...জাতীয় লঘু চিন্তা। এই চিন্তাগুলোর সমস্যা হলো, তাতে মনে হয় আমাদের সব ঠিক আছে। কিন্তু আসলে যাদের নিয়ে কথা হয় এরা মানগতভাবে এত কাছাকাছি যে, এর জায়গায় ও হলে এক দিন-দুদিন কিছু একটা হবে। দীর্ঘ মেয়াদে সেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়ি বড়ি থোড়ের গল্পই হবে। সামগ্রিক মান বাড়ানো আর মনোভাবের উন্নতির জন্য দীর্ঘ মেয়াদের দূরদর্শী চিন্তা চাই।

ও হ্যাঁ, ওই যে দল ভালো করছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে—এই জাতীয় স্লোগানগুলো তরুণ ক্রিকেটারদের সন্তুষ্টিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে কি না, সেটিও খেয়ালে রাখতে হবে। মানের অগ্রগতি দরকার। তবে এর চেয়েও বেশি দরকার বোধহয় মানসিকতার বদল।

কিন্তু মানসিকতা আবার মান থেকেই আসে। সামগ্রিক মান বাড়লে মানসিকতা ইতিবাচক হবেই।

মনে হচ্ছে এটিই শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের শিক্ষা। ক্রিকেটের মান বাড়ানো। আমাদের মানসিকতা বদলানো। তাই মান বাড়ানোর কাজে হাত দিতে হবে। লম্বা সময় ধরে, অসীম ধৈর্য নিয়ে।

আর তা যদি না হয়, যদি সেই তুকতাকে মেরামতির চেষ্টা চলে, তাহলে ২০২৩ সালেও অনেক আশা জাগিয়ে হতাশার গল্প লিখতে হবে।

চলুন ফাঁকতালে ফাঁকি দেওয়ার পথ এড়িয়ে চলতে সবাই হাতে হাত রাখি।

মন্তব্য