kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

রোহিঙ্গায় আরো আশ্বাস চীনের

► এই সংকট আর ফেলে রাখা যায় না—শেখ হাসিনার সঙ্গে একমত শি চিন পিং
► সু চিসহ মিয়ানমারের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন সিপিসি নেতারা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রোহিঙ্গায় আরো আশ্বাস চীনের

বেইজিংয়ের দিয়ায়োতাই স্টেট গেস্ট হাউসে গতকাল চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : ফোকাস বাংলা

রোহিঙ্গা সংকটের ‘দ্বিপক্ষীয় সমাধানে’ চীনের সহযোগিতার আশ্বাস নিয়ে আজ শনিবার দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতি ও মানবতার চরম বিপর্যয়ের পর প্রথমবারের মতো চীন সফরের সুযোগে ওই দেশটির নেতাদের কাছে পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন তিনি। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশকে আলোচনার মাধ্যমেই এ সংকট সমাধান করতে বলার পাশাপাশি প্রয়োজনে সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন চীনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াংয়ের পর গতকাল শুক্রবার প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং ও ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিষয়ক মন্ত্রী সং তাওও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁরা নিশ্চিত করেছেন, চীন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়। রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়েই এ সংকটের সমাধান।

চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শুক্রবার বেইজিংয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই নেতা একমত হয়েছেন যে এটার (রোহিঙ্গা সংকট) দ্রুত সমাধান করতে হবে। এটাকে আর  ফেলে রাখা যাবে না। দুই বছর হয়েছে চুক্তি হয়েছে। সুতরাং ওই ব্যাপারেও কোনো দ্বিমত নেই।’

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই যে এ সংকটের সমাধান সে বিষয়েও দুই নেতা একমত হয়েছেন বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘দুই নেতা এটাও সম্মত হয়েছেন যে, দুই দেশের প্রতিনিধিদল একসঙ্গে কাজ করবে। তারাও মিয়ানমারের ওপর তাদের ‘গুড উইল’ ব্যবহার করবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ লাখ রোহিঙ্গার কারণে বাংলাদেশে পরিবেশ, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে এর সমাধানে চীন সরকার ও প্রেসিডেন্টের ‘গুড উইল’ প্রত্যাশা করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা সংকটে ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, তাঁরা আগেও মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করেছে। এখনো করে যাবে। রোহিঙ্গারা দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যাবে এমনটি চীনেরও লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের যে মন্ত্রী কাজ করেন তিনি হয়তো বাংলাদেশ সফরে আসবেন। আশা করা যাচ্ছে, আরেকটা সম্ভাবনা দেখা দেবে।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, নির্ধারিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর নৈশভোজের টেবিলেও রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বলেছেন। শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গারা বর্তমান অবস্থায় মিয়ানমারে ফিরে গেলে আবারও অত্যাচারের শিকার হওয়ার ভয় করছে। তিনি এ ক্ষেত্রে চীনের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা চান।

জবাবে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, রাখাইন পরিস্থিতির দিকে এখন আন্তর্জাতিক মনোযোগ আছে। তাই অত্যাচারের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। চীনের পক্ষে যতটা সম্ভব চেষ্টা করা হবে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘তিনি (চীনের প্রেসিডেন্ট) বলেছেন, চীনের কাছে মিয়ানমার-বাংলাদেশ দুই দেশই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কেউ কম, কেউ বেশি নয়। সমান বন্ধু। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে চীন দুই দেশেরই স্বার্থ  দেখবে, এটা নিশ্চিত করেছেন।’

এদিকে চীনা আন্তর্জাতিক বেতারের (সিআরআই) বাংলা বিভাগের অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

অন্যদিকে সিপিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক মন্ত্রী সং তাও গতকাল বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধানে আমরা অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব।’

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর দুইবার চীন সফরের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘উনি (বঙ্গবন্ধু) বলেছিলেন, একটা নতুন চীন হচ্ছে।’ এখন আমি সেই চীন দেখতে পাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ডায়েরি থেকে ‘নতুন চায়না’ নামে একটা বই সম্পাদনা করা হচ্ছে। চীনের  ভবিষ্যৎ নিয়ে সে সময় বঙ্গবন্ধু ডায়েরিতে যা লিখেছিলেন, ওই বইতে তা আছে। বইটি প্রকাশিত হলে সং তাও সেটি চীনা ভাষায় অনুবাদ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী গতকাল বেইজিংয়ে তিয়ানানমেন স্কয়ারে চীনের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবের বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী গত সোমবার চীনের দালিয়ান যান। এরপর গত বুধবার থেকে তিনি বেইজিংয়ে দ্বিপক্ষীয় সফর শুরু করেন। গত বৃহস্পতিবার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং একটি বিনিময়পত্র সই হয়। সফর শেষে আজ শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ আছে বলে জানিয়েছেন চীনের স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। গতকাল শুক্রবার বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা জানান। শিগগিরই রোহিঙ্গাদের প্রথম ব্যাচের প্রত্যাবাসন শুরু হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

গতকালের বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে রোহিঙ্গা সংকটের বিভিন্ন দিক তুলে  ধরে বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধ নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা ভালো প্রতিবেশী। আমরা চাই, মিয়ানমার তার নাগরিকদের (রোহিঙ্গাদের) বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাক।’

এর প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিগগিরই রোহিঙ্গাদের প্রথম ব্যাচের প্রত্যাবাসন শুরুর ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেন।

মন্তব্য