kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

আশা জাগিয়ে স্বপ্ন শেষ

মোস্তফা মামুন, বার্মিংহাম থেকে   

৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আশা জাগিয়ে স্বপ্ন শেষ

শেষ চেষ্টা করেছিলেন সাইফ উদ্দিন। কিন্তু হলো না। ছবি : মীর ফরিদ

বিশ্বকাপ জেতা আর হচ্ছে না। সেমিফাইনালের সব রকম হিসাব কাল শেষ। আর সেমিফাইনালে না গিয়ে তো বিশ্বকাপ জেতা হয় না।

কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর একটা অংশের সমীকরণে সেমিফাইনালে না গিয়েও বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব ছিল। ভারতকে হারাও। ব্যস, তাতেই হয়ে যাবে বিশ্বকাপ। অনেক সম্ভাবনা জাগিয়ে, ওদের অনেক ভয় পাইয়ে, দর্শকদের অনেকভাবে দুলিয়ে শেষ পর্যন্ত হতাশায় সমাধি।

সমাধি শেষে শোকসভা হয়। শোকসভায় চলে ফিরে দেখা। ফিরে দেখতে গিয়ে শুধুই আফসোস। মুঠো গলে বেরিয়ে যাওয়ার হাহাকার। ‘যদি’ ‘কিন্তু’ দিয়ে জীবন বা খেলা কোনোটাই চলে না, তবু আবার ‘যদি’ ‘কিন্তু’তেই এর উত্তেজনার অস্তিত্ব। সাধারণত কোনো ম্যাচে একটি-দুটি ‘যদি’ থাকে কিন্তু এই ম্যাচে এতবার সম্ভাবনার দরজা খুলেছে যে যত লিখছি তত মনে হচ্ছে ম্যাচটা আসলে সব অঙ্ক উল্টে বাংলাদেশের হয়েই যেতে পারত। যদি তামিম ক্যাচটা ধরে ফেলতেন, যদি সাকিবকে কেউ একজন যোগ্য সঙ্গ দিতে পারতেন, যদি সাব্বির আউট না হতেন, যদি মাহমুদউল্লাহ থাকতেন...।

‘যদি’ পেরিয়ে ‘কিন্তু’তে আসি। সেখানেও লম্বা সারি তৈরি হবে। সেমিফাইনালে বাংলাদেশ খেলল না, হতাশার বিষয়; কিন্তু আবার এ-ও তো ঠিক যে তিনটি জয় বাদ দিলেও সব ম্যাচেই ধারাবাহিক বাংলাদেশ। এক ইংল্যান্ড বাদ দিলে কোনো ম্যাচে বিধ্বস্ত নয়। অস্ট্রেলিয়ার ৩৮১ দেখে সিঁটিয়ে যায়নি। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২৪৪ দিয়েও লড়েছে। এবং কাল যখন ৯ রানে রোহিত শর্মা বেঁচে যান, যখন ৩৭০-৩৮০’র হুমকি তখনো কী দারুণ ফিরে আসা। ব্যাটিংয়ে ১৭৯ রানে ৬ উইকেট পড়ার পর তো প্রেসবক্সেও সবাই চা-কফি খেতে উঠে গেলেন। কারো কারো ল্যাপটপ সচল। ম্যাচ তো কার্যত শেষ। শেষ হয়েও যে বাংলাদেশের এই বিশ্বকাপের ম্যাচ শেষ হয় না সেটা তো আমরা বাংলাদেশি সাংবাদিক ছাড়া কেউ সেভাবে জানে না। তাই সাইফউদ্দিনের স্কেল মেপে আঁকা সরলরেখার মতো সোজা স্ট্রেট ড্রাইভ দেখে অবিশ্বাসের শব্দ বেরোয় বিদেশি সাংবাদিকদের মুখে। কলকাতার একজন চেঁচিয়ে বলেন, ‘৮ নম্বর এমন খেলে মাইরি! এই দলকে তো আটকে রাখার নয়।’

এক চাকার কল্পিত গাড়ির কথা শুনেছি। মিথে দশ হাতের দেবতার কথা পড়েছি। বীরত্বের গল্পে একজনের সেনাবাহিনীর কথা জেনেছি। কল্পনা, মিথ আর বীর রসের সব ছবি এক হয়ে যাচ্ছে একজনে। সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের কাছে তিনি সব সময়ই ১ নম্বর। বিশ্বের কাছে বিশ্বমানের। এই বিশ্বকাপে এসে বিশ্বের সেরাদেরও সেরা। পয়েন্ট তালিকা দেখাবে বাংলাদেশের পয়েন্ট ৭ কিন্তু অনেকেই আসলে দেখবে সাকিবের পয়েন্ট ৭। বাংলাদেশ যেসব ম্যাচ জিতল এর সিংহভাগই এই সব্যসাচীর অবদান। হ্যাঁ, ব্যাট-বল সমানভাবে চলে। কাল সকালে ফিল্ডিংয়ে একটা মিস হলো, এর আগেও একদিন বোধ হয় এ রকম হয়েছিল, এই দুটো বাদ দিলে পুরো বিশ্বকাপে আর একটা মুহূর্তের কথা মনে করতে পারছি না, যেখানে সাকিব সাফল্যমণ্ডিত নন। কাল আরেকটি ঝকঝকে ৬৬, তাতে মোট রান ৫২২, সর্বোচ্চ থেকে ২ রান কম মাত্র। সঙ্গে ১১ উইকেট এবং কালকের রানস্রোতে ভাসার দিনেও ১০ ওভারে ব্যয় ৪১।

অথচ সকালবেলা পুরো বাংলাদেশ যেন হারিয়ে গিয়েছিল। ‘খেলবে টাইগার’ ‘জিতবে টাইগার’ স্লোগানটা বদলে মোটামুটি ‘মারছে ভারত, মারবে ভারত’ এ রকম। বাংলাদেশি সমর্থকরা এমনিতেই ভারতীয় বিরাট বহরের ভিড়ে হারিয়ে। একে সংখ্যালঘু, তার ওপর আক্রান্ত, এমন গুটিসুটি মেরে গিয়েছিল যে প্রেস বক্স থেকে কয়েকবার দেখার চেষ্টা করে মনে হলো অতল সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া আংটি খুঁজছি। কিছু মাথা দেখা যায় বটে, তবে মাথাগুলো যথাসম্ভব নিচু। এবং তখনই জাদুকরী মুস্তাফিজের আবির্ভাব। জানলাম, রক্তের নেশায় মত্ত শিকারিকে শিকার করার বীরপুরুষও বাংলাদেশ দলে আছে। সেই বীরত্বের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে এজবাস্টন। এবং বাংলাদেশ। এবং ক্রিকেট বিশ্বকাপের ব্লকবাস্টার ম্যাচও।

জাদুমঞ্চে অনেক জাদুকর এ রকম করেন। সাদামাটা জাদু দেখিয়ে দর্শকদের মধ্যে একটা কৃত্রিম হতাশা তৈরি করেন। এ আর এমন কী! এরপর বেরোয় সেরাটা। হতাশার সঙ্গে এমন কন্ট্রাস্ট তৈরি হয়, আবেশে বুঁদ হয়ে শেষ হওয়ার পরও মানুষ বের হতে চায় না। মুস্তাফিজের কালকের বোলিংটা এ রকমই। জমিয়ে রেখেছিলেন যেন। আগের কয়েক ম্যাচের মুস্তাফিজ ছিলেন রোলার কোস্টার, এই ওভার ভালো তো পরের ওভার জঘন্য। আর লেগসাইডের লাইনে বল করার এমন বদ-অভ্যাস যে সেগুলোর ভিডিও দেখে মুস্তাফিজ নিজেও লজ্জায় মাথা নিচু করেছেন নিশ্চয়। কাল কিন্তু সেই দোষমুক্ত। শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল, ভারতখেকো সেই মুস্তাফিজ আসি আসি করছেন। কিন্তু ‘আসি আসি বলে আর এলে না’র চোটও আমাদের বহু আছে বলে শঙ্কাও হয়। শেষে শঙ্কা কাটিয়ে যখন মুস্তাফিজ ফিরলেন মুস্তাফিজে তখন চিরকালীন ভীতি বিরাট কোহলি গেলেন। গেলেন এই পরিস্থিতিতে ‘শত্রু নম্বর ওয়ান’ হার্দিক পান্ডিয়া।

তাতে ওদের এমন কাঁপন তৈরি হলো যে শেষদিকের ব্যাটসম্যানদের কেউ কেউ এমন দৌড়ে ক্রিজ ছাড়লেন যে ‘ছেড়ে দে মা পালিয়ে বাঁচি’ কথাটা এই এত দূরে বসে মনে করে হাসি পেল। সত্যি মুস্তাফিজ যেদিন স্বভাবজাত দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেন ক্রিকেট ব্যাটিংকে হারকিউলিসের কাজ মনে হয়। ভারতের বিপক্ষে তৃতীয় ৫ উইকেট, কাটার-স্লোয়ারের বিভ্রান্তির জাদুজাল বিছানো এগুলো মনে রাখবে পরিসংখ্যানের লোকজন। আমরা মনে রাখব, পাহাড়কে তিনি নামিয়ে এনেছিলেন মাটির সমতায়। চোখ রাঙানি ছিল ধূলিস্যাৎ হওয়ার। পরে স্বপ্ন তৈরি হয় নতুন সৌধ গড়ার।

মুস্তাফিজ ফিরলেন। আর ধোনি রয়ে গেলেন ধোনির জায়গায়। নতুন এক ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ তৈরি করেছেন তিনি। স্লগ ওভারে ফোর্স করবেন না, ৪০ ওভারের পর নামলেও স্ট্রাইক রেট রাখবেন ৩০-৪০, একেবারে শেষে গিয়ে কয়েকটা বড় শট মেরে দেখিয়ে দেবেন হিম্মত। তখন মানুষজন শুরুর সমালোচনার জন্য লজ্জা পাবে। হয়ে গেলে দারুণ। নিজের প্রতি বিশ্বাসের জন্য মানুষ বাহবা দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো ক্রিকেট ব্যাটসম্যানদের জন্য শেষ পর্যন্ত ১ বলের খেলা। ব্র্যাডম্যান সেই হিসাব মেলাতে পারেননি ৪ রানের অনন্ত আফসোস নিয়ে জীবন কাটিয়ে গেছেন। আর তিনি, ধোনি যতই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, ক্যাপ্টেন কুল ইত্যাদি হয়ে থাকুন না কেন, শেষ পর্যন্ত আরেকজন ক্রিকেটারই তো। দেবতা তো নন। কালও সেভাবে খেললেন। খোলসে থাকলেন। খোলস ছেড়ে বেরোনোর হুমকি দিলেন। আর শেষে দিলেন মুস্তাফিজকে ক্যাচ। ম্যাচ পরিস্থিতিতে ধোনি গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে—কোনো কোনো দিন তো এভাবেই শেষ ২ ওভারে ২৫-৩০ রান করে সব ভুলিয়ে দিন। কিন্তু কাল যে তার ভোলানোর দিন নয়। এদিন ভুলতে বসা মুস্তাফিজকে ফিরে পাওয়ার দিন।

সমর্থকরা ক্যাচ পড়া নিয়ে যত হাহাকার করেন, ক্রিকেটসংশ্লিষ্টরা এটাকে তত হালকা করতে চান। বোধহয় এ জন্য যে প্রতেক্যেই জীবনে এমন কর্ম করে তোপে পড়েছেন এক বা একাধিকবার। যাই হোক, সেই আড্ডায় একজন বললেন, ‘ক্যাচ পড়লে ব্যাটসম্যানদের বিশ্বাসটা বেড়ে যায়। ফিল্ডারদের ক্ষমতার প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি হয়। মনে করে, একবার ক্যাচ ফেলেছে যখন তখন আরো ফেলতে পারে। তার তখন আরো বেপরোয়া শট খেলার মানসিকতা তৈরি হয়।’

আরেকজন যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাজে কথা। ক্যাচ পড়লে ব্যাটসম্যান ভয়ে আরো গুটিয়ে যাবে। আরো সতর্ক হয়ে খোলসে ঢুকে পড়বে।’

কোনোটাই আসলে ঠিক নয়। একেক ব্যাটসম্যান একেকভাবে ক্রিয়া করেন জীবন পাওয়ার সুবিধায়। তবে এই বিশ্বকাপে রোহিত শর্মার ক্ষেত্রে ক্যাচ পড়া মানে সেঞ্চুরি হওয়া। হলোও। তিনি একেক ধাপ করে আগাচ্ছেন বন্য হিংস্রতায় আর ওদিকে তামিম আরো ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছেন। ও, হ্যাঁ, ক্যাচ যিনি ফেলেন তার ওপরও চাপ পড়ে। ক্যাচ পাওয়ার পর নিশ্চয়ই মনে মনে একটা হিসাব চলে। তাঁর কারণে কত রান বেশি হলো। সেই অপরাধবোধ কাউকে জাগায়। কাউকে তলিয়ে দেয়। এই বিশ্বকাপে হুট করে নিজের আভিজাত্য হারিয়ে ফেলা তামিমের তলিয়ে যাওয়াই তো স্বাভাবিক। তামিম তলিয়ে গেলেনও। নইলে এমন সব শটে যার শুরু, তিনি কেন দলকে টেনে নিয়ে যেতে পারবেন না। কালকের দিনে এটাও একটা সমস্যা। প্রায় সবাই শুরু পেয়েছেন। পেয়ে নিজেদের বিলিয়েছেন। একটু স্লো উইকেট, বোলাররা বুদ্ধি-বৈচিত্র্য কাজে লাগাচ্ছিলেন, ব্যাটসম্যানদেরও ফাঁদ কেটে বেরোনোর জন্য যে, পাল্টা বিবেচনাবোধের দরকার ছিল সেটাই দেখা গেল না। 

এই মুহূর্তে যদি একটা গণভোট হয়, ভারত ম্যাচ কেন হারলাম, শতকরা ৯০ (আরো বেশি হতে পারে) ভাগ মানুষ দোষের আঙুল তুলবেন তামিমের দিকে। এবং ধরা যাক, একই ব্যালটে আরেকটা প্রশ্ন থাকল, বিশ্বকাপে কেন সেমিফাইনালে যাওয়া হলো না, সেখানেও খুব সম্ভব কাছাকাছিসংখ্যক ভোটেও মাশরাফি আসবেন প্রধান কারণ হিসেবে।

এটা ভেবেই দুঃখবোধ করি। কয়েক বছর ধরে যিনি মাঠে-মাঠের বাইরে অভিভাবক হয়ে দলটাকে সাজিয়ে নিয়ে আসলেন, তাঁকে কত সহজেই ছুড়ে ফেলছি আমরা। গত কয়েক বছরের সেরা ব্যাটসম্যান তামিমও চলে যাচ্ছেন বাতিলের খাতায়।

বিশ্বকাপে আমাদের ক্রিকেট আগাল। এখন ক্রিকেটবোধও আগাক। দুটো সমান্তরালে আগালে সেমিফাইনাল খুব দূরের ব্যাপার নয়।

খুব দূরের নয় বিশ্বকাপও। হ্যাঁ। আসল বিশ্বকাপ। ভারতকে হারিয়ে ‘নকল’ বিশ্বকাপ জেতার সান্ত্বনা নয়।

 

মন্তব্য