kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

বঞ্চিতের শেষ হাসির অপেক্ষা

মোস্তফা মামুন, বার্মিংহাম থেকে   

২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বঞ্চিতের শেষ হাসির অপেক্ষা

ধোনি ব্যাট দিয়ে বল মারতে চাইলেন না। তার জায়গায় যা করলেন তা আসলে অদৃশ্য মশাল হাতে আগুন জ্বালানো।

এমনিতে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ অগ্নিকুণ্ড হয়ে থাকে। ধোনিকাণ্ডে তা রীতিমতো আগ্নেয়গিরি। কাল সকালে এজবাস্টনের মাঠে ঘুরতে ঘুরতে মনে হচ্ছিল উত্তপ্ত লাভা বের হতে শুরু করেছে। যাঁর সঙ্গেই দেখা হয়, তাঁরই এক কথা—ধোনি এটা কী করলেন? কেন করলেন? কী চাইছিলেন আসলে? কেউ জানেন না। বুঝতে পারছেন না। তবে এটা সবাই বুঝতে পারছেন, আজকের ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচটা বরাবরের মতো আর ক্রিকেট ম্যাচ রইল না। ভারতের ম্যাচের দিন বাংলাদেশের মানুষের টেনশন থাকে আম্পায়ার নিয়ে, পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত অযৌক্তিকভাবে ওদিকে হেলে যায় কি না! পরশু ইংল্যান্ড-ভারত ম্যাচের আগ পর্যন্ত তা-ই ছিল। কিন্তু এবার বঞ্চনার ব্যথা শুরু হয়ে গেল আগেই। দেখে দেখে মনে হচ্ছে, আজ সকালে মাশরাফির হাত থেকে প্রথম যে বলটা বের হবে তাকে ক্রিকেট বলই দেখবেন কিন্তু আসলে মিশে থাকবে আগুনের রং। সাকিবের হাতের ব্যাটকে যদি তলোয়ার ধরে বসেন তাতেও খুব দোষ হবে না। আর যদি বঞ্চনাবোধ বের করে আনে সর্বোচ্চ সক্ষমতা তাহলে আজ হয়তো মিলে যাবে অনেক পুরনো হিসাব। মেলবোর্ন ট্র্যাজেডি, এশিয়া কাপ দুঃখ, তিন বলে দুই রানের কান্না। বকেয়া তো কম জমেনি।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জটিল এবং কৌতূহলকর। বড় প্রতিবেশী-ছোট প্রতিবেশীতে অবশ্য এমনই হয়ে থাকে। ভৌগোলিক চাপ, রাজনৈতিক বঞ্চনা, বড় ভাইসুলভ আচরণে ন্যুব্জ হয়ে থাকতে হয় ছোটদের। জবাব দেওয়ার জায়গা তখন একটাই। মাঠ। আমাদের ক্ষেত্রে ক্রিকেট মাঠ। কিন্তু এর এমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গত কিছুদিন দেখেছিলাম যে ঠিক করেছিলাম এবার ম্যাচপূর্ব হাওয়াকে ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টাই করব। প্রিভিউতে

যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব থাকবে না। শুধু ক্রিকেটই রাখব। কারণ, অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই যে চাপ আমরা সবাই মিলে তৈরি করি, তাতে দলের ওপর কুপ্রভাবই পড়ে। স্বাভাবিক খেলাটা আর হয় না। চাপ ভারতের ওপরও পড়ে। কিন্তু ঐতিহ্যগত পেশাদারি, পরিণত ক্রিকেট সংস্কৃতি, পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াইজনিত অভিজ্ঞতা মিলে ওরা চাপটা সামাল দেয়। ওদের ক্রিকেট ওরা ঠিক খেলে যায়। আমরা নিজেদের হারিয়ে খুঁজে বেড়াই। কিন্তু নিয়তি যে ঠিক করে রেখেছে এই ম্যাচের ওপর একটা বিতর্ক চাপাবেই। এটা যে এখন আধুনিক ক্রিকেটের ব্লকবাস্টার। বিশ্ব ক্রিকেটকে বন্য উন্মাদনা জোগানোর ম্যাচ। সেই বিতর্কের বিষজনিত ক্ষতি তো অনেক দেখলাম। ভুগলাম। জগতের নিয়মে ভোগান্তি তো একদিন শেষ হওয়া উচিত।

আজই কি! সেই ধোনিতেই আবার সম্ভাবনা দেখতে পাই। ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচে আমরা যতই উন্মাদনা তৈরি করি ভারতের দিক থেকে অতটা চাপ থাকে না। এবার বাংলাদেশকে অঙ্ক থেকে বাদ দিলেও এটা ওদের কাছে জীবন-মরণ ম্যাচ। কারণ, সেমিফাইনাল এখনো নিশ্চিত হয়নি। এবং পরশু ম্যাচের পর হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত এমন গেল গেল রব উঠেছে যে আজ পান থেকে চুন খসলেই ওরা খাদে। সুবাদে ওরা চাপে। ক্রিকেটগত চাপের বাইরে এমন চাপে ভারত কি বাংলাদেশ ম্যাচের আগে ছিল কোনো দিন! চাপ আছে আরেকটা। ভারত যে বিশ্ব ক্রিকেটে বড় শক্তি হয়ে উঠল তাতে তাদের অক্লান্ত সমর্থকদলের বিরাট অবদান। গোটা পৃথিবীতে ওরা ছড়িয়ে থাকে বলে হোম গ্রাউন্ডের সুবিধা পায় সব জায়গায়। সিংহভাগ সমর্থক ওদের। আজও তাই থাকবে। পরশু রাতে এক পাকিস্তানি হোটেলে খেতে গিয়ে জানলাম যে ৪০ মিনিট অপেক্ষা করলে তবে জায়গা মিলবে। এরপর ঢুকে মনে হলো হোটেল নয় বিশ্বকাপের ফ্যানজোনের ভারতীয় অংশে এসেছি। পুরো রেস্টুরেন্ট নীল শার্ট পরাদের দখলে। মাঠেও তাই থাকবে। ওরা দলবদ্ধভাবে তৈরি। কিন্তু মাঠ আর ওদের একার নয় কোনোমতে। কারণ, দেশ-বিদেশ থেকে বাংলাদেশি সমর্থকরাও ঘাঁটি গাড়ছেন। ভারতীয়রা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তবু একচ্ছত্র নয়। আর সংখ্যার ঘাটতি আওয়াজে-উন্মাদনায় বাংলাদেশিরা যেভাবে পুষিয়ে দিচ্ছেন তাতে একটা লেখায় পড়লাম, এবারের বিশ্বকাপে ‘ফ্যানস অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হচ্ছে বাংলাদেশিরা। সবচেয়ে সজীব। ইঞ্জিনের দম নিয়ে যেন মাঠে আসে ওরা। পরশুর পর ইঞ্জিনে নতুন জ্বালানি। প্রতিশোধবোধের জ্বলন্ত তেজ।

দুপুরে মাশরাফির সংবাদ সম্মেলনে ঢুকতে গিয়েই যে পরিচিত ভারতীয় সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা তিনি প্রাথমিক সম্ভাষণের বদলে চিৎকার করে বললেন, ‘শচীন টেন্ডুলকার কী বলেছে জানো?’

‘কী বলেছে?’

‘বলেছে সাকিব হচ্ছে এই টুর্নামেন্টের এখন পর্যন্ত সেরা খেলোয়াড়। ভারতকে এই ম্যাচ জিততে হলে সাকিবকে আটকাতে হবে। আলাদা করে পরিকল্পনা লাগবে।’

সরে গিয়ে আজও তিনি অম্লান। আজও ভারতীয়দের কাছে শচীন টেন্ডুলকারের কথা মানে দৈববাণী। দেবতার সেই দৈববাণীতেও এখন সাকিবের অবধারিত অবস্থান। এবং এটাও অবধারিত যে বিশ্বকাপের স্বপ্নযাত্রা অটুট রাখতে সাকিবের মধ্যে ভর করা দেবত্বের প্রকাশ আজও লাগবে। সংবাদ সম্মেলনে দল-পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথা হয়। তবু ফিরে ফিরে সাকিব আসেন অনন্যতা নিয়ে। এই মাঠের একটা দিক এত ছোট যে স্পিনারদের জন্য বিরাট দুশ্চিন্তার ব্যাপার। ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচের উইকেটেই খেলা হবে, যেখানে স্পিনাররা এমন মার খেয়েছেন তাঁদের বল করানোর চেয়ে লুকানোর কথাই বেশি ভাবতে হচ্ছে অধিনায়কদের। তবু ভারত মনে করে সাকিবের ১০ ওভারই গড়ে দিতে পারে ম্যাচের পথ। যেমন ব্যাট হাতে তাঁর আরেকটা ইনিংসই তাদের পিষ্ট করে দিতে পারে। মোটের ওপর ভারতীয়দের কাছে সাকিব এমনই জায়গায় যে ওদের সমীকরণে বাংলাদেশ মানে তো সাকিব। ওঁকে ঠেকাও। ওঁকে জলদি ফেরাও। ট্রাম্প কার্ডকে নিয়ে যখন প্রতিপক্ষের এ রকম রণসজ্জা থাকে তখন বাকি অস্ত্রগুলোতেও শাণ দিয়ে রাখতে হয়। এতে মাহমুদ উল্লাহকে নিয়ে বড় দুশ্চিন্তা। আজ সকালের আগে জানা যাচ্ছে না খেলতে পারছেন কি না। শেষ পর্যন্ত না পারলে সাব্বির। মেহেদী হাসান মিরাজের ক্ষেত্রে তেমন সংশয় নেই। দলে ঢুকছেন রুবেল হোসেন। ব্যবচ্ছেদ করে যে গবেষণা ফলটা বাংলাদেশ পেয়েছে, তাতে মেহেদীকে স্পিনস্বচ্ছন্দ ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা মেন্যু বানিয়ে বসতে পারেন। ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা যেমন ভারতের রিস্ট স্পিন জুটির বিপক্ষে মাঠের ছোট অংশটাকে টার্গেট করেছিলেন, তেমনই লক্ষ্যবস্তু ভারতও বানাতে পারে। তাঁর জায়গায় রুবেল। মানে পেস বোলিং দিয়েই চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা। আর কে না জানে, এই বিশ্বকাপে ভারতের ব্যাটিংটা হলো মাথায় চকচকে টুপি, পায়ে দামি জুতা; কিন্তু মাঝখানে শার্টটা ছেঁড়া। বলছি ভঙ্গুর মিডল অর্ডারের কথা। বিজয় শঙ্করের নেতৃত্বে এমন নিকৃষ্ট মিডল অর্ডার ভারতে কোনো দিন ছিল কি না, তা-ই নিয়ে কালকে আলোচনায় বসলেন কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিক। ফল, যা ধরেছেন তা-ই। এরাই সবচেয়ে খারাপ। দরকার তাই শুরুর চাপ। টপ অর্ডারের বিস্ফোরণ থামানো। ভারতবধের এই মন্ত্র অবশ্য সবার কাছে খোলা খাতা। কেউ পারেনি। ইংল্যান্ড পেরেছে। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ইংল্যান্ডের সাফল্যের পেছনে এটা একটা কারণ। ওরা মাঠের বড় অংশে খেলতে বাধ্য করেছে ব্যাটসম্যানদের। লাইন ঠিক রাখা তাই জরুরি। মুস্তাফিজ শুনছেন তো! মাশরাফি যেমন শুনলেন তার ভারত জয়ের কীর্তির কথা। স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছে কি না এই বিদায়লগ্নে—এ রকম প্রশ্ন। উত্তরে সুনির্দিষ্ট কিছু নেই। তবে ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, নতুন বলে দুরন্ত মাশরাফি ভারতবধের একেবারে শিওর সাকসেস থিওরি।

সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থেকে বেরোতে বেরোতেই স্টার জলসায় একটা আলোচনায় ডাক পড়ে। গিয়ে দেখি, সেখানেও যুদ্ধ সাজ সাজানো। দুই দিকে দুই দেশের দুজন করে সাংবাদিক। মাঝখানে মডারেটর যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করলেন। প্রথমে বাংলাদেশি সাংবাদিক দেখিয়ে দেব জাতীয় জোরালো বক্তৃতা দিলেন। নিজের ফ্লোর যখন এলো তখন যুদ্ধ শেষ হয়ে চারদিকে থইথই পানি। কারণ ভারতীয় সাংবাদিকরা বাংলাদেশকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা দুজন বাংলাদেশের একান্ত সুহৃদ। সব সময়ই ভালো কথা বলেন।

কিন্তু এটাও তো ঠিক যে এবারের বাংলাদেশের প্রশংসা না করলে মিথ্যা হয় ক্রিকেটবোধ। আর তাই যখন আমরা বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা বলি তখন তাঁরা হাসেন। ঘোর প্রতিপক্ষকেও মুগ্ধ ভক্ত বানিয়ে নিয়ে স্বপ্নের উচ্চতায় এবারের বাংলাদেশ।

আর মাঠে যদি ঘটে যায় ঘটনাটা, তাহলে কিন্তু ক্রিকেট নিয়তিও হাসবে। তার কল্পিত ব্লকবাস্টারের জন্য যে এই চিত্রনাট্যটাই সবচেয়ে ভালো যায়। হৃদয় ভাঙা ট্র্যাজেডি, খেয়ালি ভাগ্যের টানা মার শেষে বঞ্চিতের শেষ হাসি।

 

মন্তব্য