kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

সাকিব কীর্তির রহস্য

সাইদুজ্জামান, সাউদাম্পটন থেকে   

২৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাকিব কীর্তির রহস্য

‘ইটস অল অ্যাবাউট মাইন্ডসেট’, মুহূর্তেই সাফল্যের গোপন রহস্য জানিয়ে দেন সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপে তাঁর চোখ-ধাঁধানো নৈপুণ্যের অনেক গূঢ় রহস্যের এই একটিই জানা গেছে আপাতত। মন দিয়ে দুনিয়া জয় করার ‘রেসিপি’র ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর অনায়াসে হতে পারেন সাকিব। তবে সেই ‘কিক’টা এখনো অজানা। তিনি বলেন না যে!

আপনি কতটা কী করছেন, তা জনে জনে বলার দরকার নেই। আপনি কাজটা ঠিকঠাক করছেন কি না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাকিব আল হাসানের কাছে।

তাই ‘ক্লোজ সার্কেলে’র এক-দুজন ছাড়া আর কেউ জানে না আইপিএলে উপেক্ষার চারটা সপ্তাহ ঠিক কী করেছেন বিশ্বসেরা এ অলরাউন্ডার। বড়জোর ধারণা করা যায় এটুকু সময়েই ছয় কেজি ওজন কমানোর জন্য ‘মেদ-ভুঁড়ি কী করি’ টাইপ টোটকার সাহায্য নেননি; ক্রিকেটে ওসবের অনুমোদন নেই। তাহলে নিশ্চিত দৌড়ে, জিম করে এবং খাবারের মেন্যু ছেঁটে ফেলে ওজন কমিয়ে ঝরঝরে হয়েছেন। কে জানে, বাবার ফিটনেসের ফর্দ দেখেই কিনা শিশুকন্যা অ্যালাইনারও ডিনারে সাদা আটার রুটি চাই-ই চাই!

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, ম্যাচের দিন ছাড়া রোজা মিস করেননি বিশ্বকাপ উন্মাদনার মাঝেও—কেউ জানে না। আসলে জানান দেন না আলহাজ সাকিব আল হাসান। তাঁর ধর্মচর্চায় লোক-দেখানো ব্যাপার নেই।

এক তরুণ ক্রিকেটার তাঁর নির্দেশ উপেক্ষা করেছেন—ক্ষুব্ধ না হয়ে উল্টো মুচকি হেসে এড়িয়ে যান সাকিব আল হাসান। তাঁর পুরনো বন্ধুর কাছে যে হাসির ব্যাখ্যা, ‘ফাঁকিবাজি হয়ে থাকলে একদিন সে (ওই তরুণ ক্রিকেটার) নিজেই পস্তাবে! সাকিবের কাছে সিনিয়র-জুনিয়র বলে কিছু নেই। সবার বেলাতেই বিষয়টা এভাবে দেখে।’

সাকিব আল হাসানের ‘মাইন্ডসেট’টাই এমন, চূড়ান্ত পেশাদার। তোমার কর্ম তোমাকেই দুই হাত ভরে দেবে কিংবা নিঃস্ব করে দেবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে আসা তুমি তো আর কিশোর নও, জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্নই হওয়ার কথা। না হয়ে থাকলে, সেটি তোমার দুর্ভাগ্য! তিনি অনেক দিন ধরেই বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ ক্রিকেটের মুখ। রোদে পুড়ে মাঝেমধ্যে সে মুখ ‘ট্যানড’ হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে নতুন মুখের আবির্ভাবও দেখেছে বিশ্ব। এই বিশ্বকাপেই তো সাকিবের সঙ্গে রেসে নেমেছেন মুশফিকুর রহিম। তবে খ্যাতি-অর্থ এবং ক্যারিসমায় এখানেও এগিয়ে সাকিব। বাংলাদেশসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের যেকোনো আলাপে কিংবা কলামে এবং অবশ্যই প্রতিপক্ষের গেম প্ল্যানিংয়ের প্রথমেই থাকছেন সাকিব। সাত ম্যাচের একটা ইনিংসেই শুধু ৫০ পেরোতে পারেননি তিনি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আউট হন ৪২ রান করে। বাকি ছয় ইনিংসের দুটিতে সেঞ্চুরি এবং বাকি চারটিতে ফিফটি করা বাংলাদেশি এ অলরাউন্ডারের বাঁহাতি স্পিন নিয়েও বিশেষ ছক করতে হয় প্রতিপক্ষকে। ফিল্ডিংয়ে তিনি বাংলাদেশের সেরা কি না, এ নিয়ে সংশয় সামান্যই। সাকিবের ক্রিকেটবুদ্ধির ভক্ত দলের আপামর সিনিয়র-জুনিয়র!

অদৃষ্টে বিশ্বাসীদের জন্য সাকিবের ক্রিকেটে উপাদান রয়েছে। সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান সেদিন কৌতুক করে বলছিলেন, ‘ওর (সাকিব) শুরুর কয়েকটা বল নিয়ে টেনশনে থাকি। ওই সময়টা পেরিয়ে গেলেই বুঝে ফেলি বড় ইনিংস আসছে!’ ওই শুরুতে একটু ভাগ্যও লাগে সাকিবের এবং ভাগ্যদেবীও প্রায়ই আজলা ভরে ‘বর’ দেন। ক্যাচ ওঠে, কিন্তু পড়ে ফাঁকা মাঠে। ফিল্ডারের হাতে গেলেও ফসকে যায়। আম্পায়ারের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাও যায় তাঁর পক্ষে।

গতকাল সোমবার অবশ্য আম্পায়ার তাঁর বিপক্ষেই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। সানরাইজার্স হায়দরাবাদ টিমমেট রশিদ খানের প্রথম বলটাই ভেতরে আসবে, বুঝতে পারেননি সাকিব। বল সোজা আঘাত হানে তাঁর প্যাডে, খালি চোখে যেটাকে মনে হচ্ছিল নিশ্চিত এলবিডাব্লিউ। তাই সাকিব রিভিউ নেওয়ায় কিছুটা অবাকই লাগছিল। তবে কি ব্যাটে লেগেছিল বল? না, সে রকম কিছু স্নিকোমিটারও খুঁজে পায়নি। বল ট্র্যাকার জানাল যে মিডল স্টাম্পের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল বল। এতে ভাগ্যের ছোঁয়া নেই, পুরোটাই সাকিবের জাজ করার ক্ষমতা।

তবে এরও আগে মোহাম্মদ নবির একটা বল ফ্লিক করতে গিয়ে ক্যাচের মতো দিয়েছিলেন। বল সাকিবের ব্যাটের কানায় লেগে পয়েন্ট আর কাভারের মাঝখানে ক্যাচ উঠেছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগুলো ফিল্ডারের হাতেই জমা পড়ে। কিন্তু তিনি সাকিব আল হাসান যে! ক্যাচটাও তাই পড়েছে নো ম্যান্স ল্যান্ডে।

ভাগ্য লাগে ক্রিকেটে, পুরোদস্তুর পেশাদার সাকিবও ভাগ্যে বিশ্বাসী, তবে নির্ভরশীল নন। ব্যাটিংয়ে নামার আগে নাকি কারো কথায় কান দেন না, যোগীর মতো ধ্যানে মগ্ন থাকেন। কেউ কিছু বললে মুচকি হেসে ভান করেন যে শুনছেন। তবে দীর্ঘদিনের বন্ধুদের বিশ্বাস, তিনি আমলেই নেন না বক্তার পরামর্শ কিংবা শুভ কামনা।

ব্যাটিংয়ে নেমে গোটা দুয়েক কাট কিংবা ড্রাইভ ঠিকঠাক হয়ে গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন সাকিব। মানে, চাপ তাঁর মনেরও ওজন বাড়িয়ে দেয় ব্যাটিংয়ে নামার আগে। আবার সেই চাপ সরেও যায় অল্প সময়ে। প্রতিপক্ষ এবং পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুতই মানিয়ে নিতে জানেন তিনি। কাল যেমন রশিদ খান শুরুতেই ঘাবড়ে দিয়েছিলেন। ওদিকে আফগান অধিনায়ক আবার দুই অফস্পিনার আক্রমণে এনে সাকিবের জন্য ফাঁদ তৈরি করেছিলেন। এতে একসময় সফলও হয়েছেন গুলবাদিন নাইব। তবে তাঁর আগে টুর্নামেন্টে আরেকটি ফিফটি হয়ে গেছে সাকিবের। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এবারের পঞ্চাশে তাঁর বাউন্ডারি শট মাত্র একটি।

পরিস্থিতি যে এর বেশি আক্রমণাত্মক হতে দেয়নি। আক্ষেপ একটাই—এত কষ্ট করে অত দূর যাওয়ার পর মুজিবের বলের লাইন মিস করে আরো বড় কিছুর পিছু নেওয়া হয়নি সাকিব আল হাসানের।

এ নিয়ে তাঁর মনের আক্ষেপ মাপার অবশ্য কোনো উপায় নেই। নিশ্চিত জানি, বলবেন না সাকিব আল হাসান!

 

মন্তব্য