kalerkantho

সোমবার । ২২ জুলাই ২০১৯। ৭ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৮ জিলকদ ১৪৪০

সাকিব বীরত্বে আফগান জয়

সাইদুজ্জামান, সাউদাম্পটন থেকে   

২৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাকিব বীরত্বে আফগান জয়

২০১০ সালে বাংলাদেশে এসেছিল নিউজিল্যান্ড। আর সাকিব আল হাসান প্রতিদিনই হাজির হতেন প্রেস কনফারেন্সে। ওই সিরিজের সব ম্যাচেই যে সবচেয়ে প্রভাবশালী নৈপুণ্য ছিল তাঁর। ২০১৯ বিশ্বকাপকেও যেন সে রকম কোনো একতরফা হোম সিরিজই বানিয়ে ফেলেছেন চ্যাম্পিয়ন অলরাউন্ডার। প্রতি ম্যাচেই অভাবিত ধারাবাহিক তিনি গতকাল এবারের সেরা বোলিং ফিগারের মালিকও হয়েছেন। তার আগে আরেকটি ফিফটি দিয়ে পুনরুদ্ধার করেছেন ব্যাটসম্যানদের শীর্ষস্থান। দলও ৬২ রানের জয়ে সেমির সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রেখেছে। এমন অবস্থায় সপরিবারে তাঁর ইউরোপ সফর দ্বিগুণ আনন্দদায়কই হওয়ার কথা। আজ থেকে চার দিনের ছুটি মিলেছে ক্রিকেটারদের। সাকিব যাচ্ছেন ফ্রান্সে।

২৬২ রান তো অনেক। হ্যাম্পশায়ার বৌলের উইকেট এবং প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটিং শক্তি বিবেচনায় তো অবশ্যই। তবু রান তাড়া করতে নামা আফগানিস্তান ইনিংস ১০ ওভারে গড়াতেই যেন ডিপ্রেশনে আক্রান্ত বাংলাদেশ, ততক্ষণে বিনা উইকেটে ৪৮ রান উঠে গেছে যে! মাশরাফি বিন মর্তুজাদের ১০ ওভার গেম প্ল্যানে এ তো একরকম হারই।

এরপর তিনি এলেন, বল করলেন এবং বাংলাদেশকে নিয়ে জিতে গেলেন। নান্দনিকতায় পাঁচতারা মানের হ্যাম্পশায়ার বৌলে ফাইভস্টার পারফরম্যান্স। ব্যাটে ৫১ রানের পর ৫ উইকেট নিয়ে বিশ্বকাপকে আরেকবার জোর ঝাঁকুনি দিলেন সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে হাজার রান, এ আসরের সবচেয়ে বেশি রান, সেরা অলরাউন্ডারের শীর্ষস্থান ধরে রাখা—খুঁটিনাটি ক্রিকেটীয় অর্জনের অলংকার গড়াগড়ি খেয়েছে কাল তাঁর পায়ে। এসব দেখেটেখে মায়াই লাগছে মুশফিকুর রহিম কিংবা মোসাদ্দেক হোসেনের জন্য। বাংলাদেশের ইনিংস গড়ায় আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান মুশফিকের ৮৭ বলে ৮৩ রান কিংবা লোয়ার অর্ডারে নেমে মোসাদ্দেকের ২৪ বলে ৩৫ রানও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ ম্যাচ শেষ হতে হতে তাঁরা প্রায় বিস্মৃত আমদর্শকের স্মৃতি থেকে। সবটা জুড়ে যে সাকিব আল হাসান!

এবারের বিশ্বকাপে দলটির হতোদ্যম নৈপুণ্য দেখে বিশ্বাস হয়নি আফগানিস্তান অধিনায়ক গুলবাদিন নাইবের কথা। আগের দিন তিনি বলেছিলেন যে ভারত ম্যাচের আত্মবিশ্বাস তাঁদের বাংলাদেশের বিপক্ষে ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগাবে। কিন্তু একাদশ ওভারে সাকিব আক্রমণে আসার আগে পর্যন্ত দারুণ অনুপ্রাণিতই দেখাচ্ছিল আফগানদের। রহমত শাহকে নিয়ে অধিনায়ক নিজেই ভেঙে দিচ্ছিলেন পূর্বধারণা। উইকেট যতই গতিহীন হোক, শুরুর ধাক্কা সামাল দিতে পারলে লক্ষ্যমাত্রা সাধ্যাতীত নয়। নতুন বল অনায়াসে খেলেছেন গুলবাদিন ও রহমত শাহ। তাঁদের সমস্যায় ফেলার জন্য যে ঝাঁজ দরকার, সেটি অনুপস্থিত ছিল মাশরাফি বিন মর্তুজা কিংবা মুস্তাফিজুর রহমানের বোলিংয়ে। উল্টো বেলাইনে বল ফেলে কিছু রান অপচয়ও করেছেন বাঁহাতি পেসার। তাঁর জায়গায় আক্রমণে আসা মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনও সুবিধা করতে পারেননি।

এ রকম পরিস্থিতিতে যা হয় আর কি, ফিল্ডিংয়েও একটা হতোদ্যম ভাব বাংলাদেশের। সাউদাম্পটনের গ্যালারি হঠাৎই মৌনব্রতে। সমর্থকদের বেশির ভাগই যে বাংলাদেশের। প্রেস বক্সেও ততক্ষণে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে, এখানেই না শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ! হাতে গোনা কয়েকজন আফগান সাংবাদিক পাখতুন ভাষায় কিচিরমিচির করছেন। বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে সেসবে মিশে সম্ভাব্য জয়ের উচ্ছ্বাস।

তো, ওই ১০ ওভার পর সামান্য ‘পজ’ চিত্রনাট্যে। প্রেস বক্সের উল্টো প্রান্তে তখন বোলিং মার্কে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং সাজাচ্ছেন সাকিব। ‘শো স্টপারে’র আগমনে নতুন আশার সঞ্চার চারপাশে। বেশিক্ষণ অপেক্ষায় রাখেননি সাকিব, তাঁর পঞ্চম বলটাই মিড অনে তামিম ইকবালের হাতে তুলে দিয়েছেন আফগান ওপেনার রহমত শাহ।

আফগানিস্তান দেখতে অনেকটা কয়েক বছর আগের বাংলাদেশের মতো। শুরুতে কিংবা ইনিংসের কোনো একটা পর্যায়ে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে সেটা নিজেরা নেভাতও। একটা লম্বা জুটি বিচ্ছিন্ন হওয়া মানেই ইনিংসের হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়া। গতকাল উদ্বোধনী জুটির জ্বালিয়ে যাওয়া আশার আলো যেমন নিভিয়েছেন পরের ব্যাটসম্যানরা।

বাংলাদেশ অধিনায়কও ততক্ষণে বুঝে গেছেন যে সাকিবকে দিয়েই ‘খেলে’ দিতে হবে আফগানদের। তাই দুই ওভার পরই তাঁকে তুলে নিয়ে হাশমত উল্লাহ শাইদির সামনে ছেড়ে দিয়েছেন অফস্পিনার মোসাদ্দেক হোসেনকে। তিনিও হতাশ করেননি মাশরাফিকে, ফিরিয়ে দিয়েছেন আফগানিস্তানের বাঁ হাতি এ ব্যাটসম্যানকে।

৭৯ রানে ২ উইকেট। এমন অবস্থায়ও ম্যাচ থেকে আফগানিস্তানকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার উপায় নেই। নাইব এবং আজগর আফগান ক্রিজে সেট হয়ে গেছেন, ড্রেসিংরুমে বসে মোহাম্মদ নবী-বাংলাদেশের জন্য কোনোটাই সুখবর নয়।

তাই আবারও সাকিবের দরজায় কড়া নেড়েছেন মাশরাফি। এবার টানা ৫ ওভারের স্পেলে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের ভাগ্য এক রকম নির্ধারণই করে দিয়েছেন বাঁ হাতি স্পিনার। দুই স্পেল মিলিয়ে সাকিবের বোলিং ফিগার তখন ৭-১-১০-৪। নাইব, আজগরের সঙ্গে নবীকেও শিকার বানিয়েছেন তিনি এই স্পেলে। বিশ্বকাপে তাঁর সেরা বোলিং নৈপুণ্য হয়ে গেছে তখনই। প্রেস বক্সের স্কোরার বাড়তি তথ্য দিয়েছেন, ‘ষাটের ভাগেরও বেশি বলে রান দেননি সাকিব।’ বাউন্ডারিও হয়নি কোনো সাকিবের এই ৭ ওভারে। তৃতীয় স্পেলের শুরুতেই অবশ্য একটা বাউন্ডারি হজম করেছেন, সেটাও আবার ছক্কা। সামিউল্লাহ শেনওয়ারি সাকিবের অষ্টম ওভারের একটি বল উড়িয়ে গ্যালারিতে ফেলেছেন লং অফ দিয়ে। আবার ওই স্পেলেই নাজিবুল্লাহকে ফিরিয়ে পঞ্চম উইকেটও তুলে নিয়েছেন সাকিব, বিশ্বকাপে যা তাঁর তো বটেই কোনো বাংলাদেশি বোলারের সেরা সাফল্যও। শেষ করেছেন তিনি ২৯ রানে ৫ উইকেট নিয়ে, যা এবারের বিশ্বকাপেরই এখন পর্যন্ত সেরা বোলিং ফিগার। এত দিন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আমেরের ৩০ রানে ৫ উইকেটই ছিল সেরা।

সকালে টসে হার অবশ্য অকল্যাণকর হয়নি বাংলাদেশের জন্য। আফগানিস্তানের বিপক্ষে নাকি টস জিতলে ব্যাটিংই নিত বাংলাদেশ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে খেলা মিনিট দশেক দেরিতে শুরু হওয়া নিয়েই সামান্য আশঙ্কা ছিল, যদি সুইং পায় পেসাররা। কিন্তু কিসের কী? বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের জন্য পুরনো কৌশলেই আক্রমণে নেমেছে আফগানিস্তান। পেস নয়, বোলিং ওপেন করেছেন অফস্পিনার মুজিব উর রহমান। প্রথম অন্য প্রান্ত থেকে দুই ওভার করিয়েই দৌলত জাদরানকে সরিয়ে নিয়েছেন আফগান অধিনায়ক।

এরপরের অংশটুকুর হাইলাইট আফগান স্পিন বনাম বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের লড়াই। মোহাম্মদ নবী খুব বেশি সময় নেননি তামিম ইকবালকে ফিরিয়ে দিতে। বলের লাইন মিস করে আরেকবার বড় ইনিংস খেলার সম্ভাবনা নষ্ট করেছেন বাঁ হাতি ওপেনার। তাঁর আগে মুজিবের বলে ড্রাইভ খেলে কাভারে ক্যাচ দিয়েছেন এ ম্যাচে ওপেনারের ভূমিকায় ফেরা লিটন কুমার দাশ। সাকিবও ধোঁকা খেয়েছেন মুজিবের বলে। তবে যাওয়ার আগে সাউদাম্পটনের জন্য নিরাপদ আড়াই শর রোড ম্যাচ এঁকে দিয়েছেন তিনি। মুশফিকের সঙ্গে তাঁর ৬১ রানের জুটি স্থিতি দিয়েছে বাংলাদেশ ইনিংসে। আর সেখান থেকে ইনিংসটাকে টেনে নিয়ে গেছেন মুশফিক।

মাঠ বড়, তাই বাংলাদেশ ইনিংসে বাউন্ডারি মোটে ১৭টি। একমাত্র ছক্কাটি মুশফিকুর রহিমের, সঙ্গে বাউন্ডারি চারটি। দেখে মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের টানা দুই ইনিংসে সেঞ্চুরির পরম্পরা বুঝি রক্ষা করতে চলেছে তিনিও। গত বিশ্বকাপে মাহমুদ উল্লাহ এবং এবার সাকিবের পর ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সেঞ্চুরিয়ান মুশফিক সে ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার পথেই এগোচ্ছিলেন। কিন্তু রানের গতি বাড়াতে গিয়ে দৌলত জাদরানকে তুলে মেরেছিলেন মুশফিক, যা ক্যাচ হয়ে জমা পড়ে মিড অফে দাঁড়ানো নবীর হাতে। তবে গতকালের ফিফটিতে এবারের বিশ্বকাপে ৩২৭ রান নিয়ে সাকিবের পিছু নেওয়া অব্যাহত রেখেছেন মুশফিক!

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্নের গাড়িও এগিয়ে চলেছে সতর্ক পদক্ষেপে। আফগানিস্তানকে হারানোর পর এবার সেটির গন্তব্য বার্মিংহাম।

 

মন্তব্য