kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

বিশেষ সাক্ষাৎকার ► হাসানুল হক ইনু

ঐক্যের সাফল্যের ওপরই সরকার

মহাজোটের ঐক্যের সাফল্যের ওপরই শেখ হাসিনার সরকার দাঁড়িয়ে আছে

২১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৪ মিনিটে



ঐক্যের সাফল্যের ওপরই সরকার

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। বিগত মহাজোট সরকারের তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবে কালের কণ্ঠ’র মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, জনগণ, প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনী সবাই মিলে বাংলাদেশকে সংবিধান, গণতন্ত্র ও নির্বাচনের পথে রাখতে পেরেছে—এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম আবেদীন

 

কালের কণ্ঠ : কেমন সময় যাচ্ছে আপনার?

হাসানুল হক ইনু : আমরা এখন জীবনের শেষ প্রান্তে। সামনের দিকে এক পা রাখা মানে এক পা কবরের দিকে যাওয়া। যদিও কবরের দিকে হাঁটা মানুষ বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করলে হয়তো সে হাঁটতে পারত না। সে জন্যই বর্তমানকে আমি ভালোবাসি। বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে সাধ্যের মধ্যে যতটুকু জীবন্ত থাকা যায় ততটুকু থাকার চেষ্টা করি। সে হিসেবে আমি চমৎকার আছি।

কালের কণ্ঠ : দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন যাচ্ছে?

হাসানুল হক ইনু : বঙ্গবন্ধু হত্যার রাজনৈতিক বিপর্যয় অর্থাৎ পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ের পরে এখন সবচেয়ে সুসময়ের রাজনীতি চলছে। সুসময় এ জন্য বলছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, সংবিধানের পথে, বাংলাদেশের পথে বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ আবার হাঁটা শুরু করেছে। সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিটা সবচেয়ে সুসময়ের।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু অনেকেই বলেন রাজনীতিতে দুর্দিন যাচ্ছে।

হাসানুল হক ইনু : আমি মনে করি না দুর্দিন যাচ্ছে। বাংলাদেশে আবার সসম্মানে বঙ্গবন্ধু নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। কবিগুরু এবং জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম তাঁরা আবার সসম্মানে প্রত্যাবর্তন করেছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী শক্তিরা যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছিল, তারা পিছু হটে এবং দখলদারিত্ব থেকে উচ্ছেদ হয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। শীর্ষপর্যায়ের যুদ্ধাপরাধীদের সাজা কার্যকর হয়েছে। অসম্ভব একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও উদার রাজনৈতিক ধারায় আলোর পথে হাঁটা শুরু করেছে।

কালের কণ্ঠ : মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে গণতন্ত্র অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। সেই গণতন্ত্র কি সঠিক পথে আছে?

হাসানুল হক ইনু : স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর সাম্প্রদায়িক ও সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের রাজনৈতিক পর্ব হচ্ছে চলমান সময়। আমরা এখনো উত্তরণ পর্বে আছি। সুতরাং এই পর্বে একদিকে যেমন সাম্প্রদায়িকতা এবং সামরিক শাসনের রাজনৈতিক জঞ্জালগুলো পরিষ্কার করতে হচ্ছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাতে হচ্ছে এবং নতুন করে তৈরি করতে হচ্ছে; আইন-কানুনের সংস্কার করতে হচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশ বেরিয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলা এবং বিভিন্ন রকমের ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আইনের শাসনের পথে পা রেখেছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে একেবারে চমৎকার পশ্চিমা গণতন্ত্রের মতো আইনের শাসন বিদ্যমান আছে।

কালের কণ্ঠ : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সমাজে সমর্থনযোগ্য হয়েছে। কিন্তু সমাজের সাধারণ মানুষ কি আইনের শাসন পাচ্ছে?

হাসানুল হক ইনু : দেখুন, মূলত আমাদের দণ্ডবিধি অনুযায়ী মোটা দাগে আইনের শাসন চলছে। তাই সাধারণ মানুষ আইনের শাসন পাচ্ছে না—এ ধারণা ঠিক নয়। কেউ যদি খুন হয়, কারো জমি যদি কেড়ে নেওয়া হয়, কেউ যদি নির্যাতিত হয়—সে ক্ষেত্রে মামলা কিন্তু হচ্ছে। হ্যাঁ, মামলার বিলম্ব বা বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। এগুলোর কারণ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। কিন্তু আবার যদি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কারণে অনেক অপরাধী মুক্ত হয়ে আছে; সেদিক থেকে অবশ্যই ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু ১৭ কোটি মানুষের দেশে আইনের শাসন না থাকলে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতো। অরাজকতা বলতে যেটি বোঝায়, সেটি তো দেশে নেই। হ্যাঁ, আইনের শাসন বিচারহীনতার সংস্কৃতি আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু আবার সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগের জন্ম ও উত্থানই হয়েছে গণতন্ত্রের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর আজীবন লড়াইও ছিল গণতন্ত্রের জন্য। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের গণতন্ত্রের সঙ্গে আজকের গণতন্ত্রের মিল খুঁজে পান?

হাসানুল হক ইনু : দেখুন, সংবিধানে বর্ণিত চার নীতির যে গণতন্ত্র এবং বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের জন্য যে সংগ্রাম করেছেন, মাঝখানে যে বিপর্যয়গুলো ঘটে গেছে, সে বিষয় বা সময়গুলো বাদ দিলে এখন তো গণতন্ত্রকে চর্চার দিকে বা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের কাজ চলছে। সেখানে মূল বিষয় হলো চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স। শেখ হাসিনার গত ১০ বছরের শাসনকালে সংসদীয় পদ্ধতিকে শক্তিশালী করা হয়েছে। স্থায়ী কমিটিগুলোকে পুনর্গঠন করা হয়েছে। মানবাধিকার ও তথ্য কমিশন করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে আরো স্বাধীন করা হয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের এখনকার চ্যালেঞ্জ কী, সেটিও ভেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশ এখন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে।

কালের কণ্ঠ : গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া ভারসাম্য রক্ষা কিভাবে সম্ভব?

হাসানুল হক ইনু : এ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি বেশ কয়েকবারই। উত্তর দেওয়ার আগে আমি পঁচাত্তর-পরবর্তী ঘটনার কথা স্মরণ করতে বলব। সেই সময় সামরিক শাসনের হাত ধরে গায়ের জোরে স্বাধীনতাযুদ্ধের পরাজিত অগণতান্ত্রিক শক্তি, সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী জামায়াতি চক্রকে রাজনীতিতে নিয়ে এসে পুনর্বাসন করে তাকে রাজনীতির বিরোধী পক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। পঁচাত্তরের পরে একদিকে ছিল মুক্তিযুদ্ধ গণতন্ত্র, সমাজতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি; তার বিপক্ষ হচ্ছে জঙ্গিবাদী জামায়াতি যুদ্ধাপরাধী চক্র। যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে বিএনপি। সে জন্যই আমি বলি, বিএনপি রাজনীতির বিষবৃক্ষ। সুতরাং যতই ডালপালা ছাঁটেন, রাজনীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে না পারলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা জঙ্গিবাদের পুনরুৎপাদন হতেই থাকবে।

কালের কণ্ঠ : আপনার ভাষায় ‘বিষবৃক্ষ’ বিএনপিকে তাহলে কি উপড়ে ফেলার কথা বলছেন? এটি কি বাস্তবে সম্ভব?

হাসানুল হক ইনু : আমি সেই কথায়ই আসছি। পঁচাত্তরের পরে কী হলো? বিরোধী দল ও রাজনীতিতে বহু দল লালন করার নামে সাম্প্রদায়িকতাকে হালাল সার্টিফিকেট দেওয়া হলো। জঙ্গিবাদী রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হলো। শুরু হলো রাজনীতির মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা। একবার রাজাকার সমর্থিত সরকার, আরেকবার মুক্তিযুদ্ধ সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় বসতে লাগল। এই মিউজিক্যাল চেয়ারের ভেতরে আমরা যখন দুলছি, তখনই আপনি প্রশ্ন করছেন গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল রাখার নামে বিএনপিকে জামাই আদর করে সংসদে নিয়ে এসে বসতে হবে। বিএনপির রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে হবে। যখনই আমরা আগুন সন্ত্রাসীর ঘটনা, জঙ্গিবাদ লালনের ঘটনা, হত্যা-খুনের ঘটনা এবং সাম্প্রদায়িকতা ও যুদ্ধাপরাধী লালনের ঘটনাকে বিচারের আওতায় নিয়ে যাচ্ছি, তখনই অনেকজন চিৎকার করে বলছেন, বিরোধী দল দমন করা হচ্ছে। যত দিন এই বিএনপি রাজনীতির অঙ্গনে থাকবে এবং সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী জামায়াতিরা থাকবে, তত দিন বাংলাদেশ নিরাপদ নয়। গণতন্ত্র নিরাপদ হবে না।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক শক্তিকে নির্মূল করা আদৌ সম্ভব?

হাসানুল হক ইনু : এই সাম্প্রদায়িক শক্তির মধ্যে যারা সরাসরি অপরাধের সঙ্গে জড়িত, গত ১০ বছরে তাদের বিরুদ্ধে সরকার শূন্য সহিষ্ণুনীতি গ্রহণ করেছে। এতে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বিএনপিও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। নির্বাচনে ২০০৮ সালে তারা পরাজিত হয়েছে। ২০১৪ সালে বয়কট করে রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছে। ২০১৮ সালে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হয়েছে। নির্বাচন, আন্দোলন এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের কোণঠাসা করা হয়েছে। আমি মনে করি, ২০১৮ সালের রাজনীতির পরে বিএনপির অপরাজনীতির যুগের অবসান হলো। যেমন করে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরে মুসলিম লীগ যুগের অবসান হয়েছিল। ১০ বছরে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদী রাজনীতির ধংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে উদার গণতন্ত্রের সুজলা-সুফলা জমিন তৈরি করছি।

কালের কণ্ঠ : আপনি মুসলিম লীগের মতো বিএনপির বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন। কিন্তু নির্বাচন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার অনুষ্ঠিত হলে এখনো বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে—দেশে এমন আলোচনা অনেকের মধ্যে আছে।

হাসানুল হক ইনু : আমি রাজনীতির গত ২০ বছরের পুরো পরিস্থিতিকে যুদ্ধের চশমা দিয়ে দেখছি। যুদ্ধের চশমা দিয়েই আমি ২০০৮ সালের ভোট, ২০১৪ সালের ভোট ও ২০১৮ সালের ভোটকে দেখছি। মনে রাখতে হবে, ২০১৮ সালের ভোটের দশ দিন আগে কী ঘটেছিল। ড. কামাল হোসেনসহ উত্তর-দক্ষিণ মেরুর অনেকে যখন গিয়ে রাজাকারের কোলে এবং বিএনপির কোলে গিয়ে বসল এবং বাংলাদেশে হুংকার ছাড়ল যে শেখ হাসিনা সরকার পালিয়ে যাবে, সেই পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিতে হবে। তারা নির্বাচন বয়কটের হুংকার ছাড়ল এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। আমরা ওই ঘটনাকে ভুলে যাচ্ছি। শেষের দিকে তারা পেরে না উঠে ভোটে অংশ নিয়েছে। কিন্তু আগের পরিস্থিতি ছিল খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে। মহাজোটের সরকারকে উৎখাত করতে হবে। নইলে ভোট করবে না। তারা একটি উৎখাতের খেলায় নেমেছিল।

কালের কণ্ঠ : তার অর্থ গত তিনটি নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি বা এই সময়টিকে আপনি গণতন্ত্রের বাইরে বিশেষ একটি পরিস্থিতির কথা বলতে চাইছেন?

হাসানুল হক ইনু : হ্যাঁ, আসলে আমি এই সময়টিকে একটি বিশেষ পরিস্থিতি, যা আমার ভাষায় ‘রাজনৈতিক যুদ্ধের চশমা’ বলি। যে যুদ্ধের প্রতিপক্ষ হচ্ছে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী যুদ্ধাপরাধী চক্র এবং তার পৃষ্ঠপোষক বিএনপি। আপনি রাজাকারকে বর্জন করবেন আর বিএনপিকে কোলে টেনে নেবেন, এই দ্বৈতনীতি বাংলাদেশে চলতে পারে না।

কালের কণ্ঠ : আপনার কথায় তিনটি নির্বাচনকালীন ওই সময়কে বিশেষ পরিস্থিতি হিসেবে ধরে নিয়েই জানতে চাই, বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি কত দিন চলার পর স্বাভাবিক গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসবে?

হাসানুল হক ইনু : এটি আমি এভাবে বলব যে ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল এই ১০ বছরকে আমি প্রথম পর্ব বলছি। শেখ হাসিনা সরকারের এই প্রথম পর্বে জঙ্গিবাদের ব্যাপার শূন্য সহিষ্ণুনীতি অবলম্বন করে আমরা তাদের কোণঠাসা ও পিছু হটতে বাধ্য করেছি। বাংলাদেশ কিছুটা শান্তির পথে এসেছে। একই সঙ্গে সংবিধানের চার নীতির পথে প্রত্যাবর্তন করেছে। বাংলাদেশকে সঠিক ও বাঙালিয়ানার পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে এই সময় গণমুখী তথা সাবলম্বী অর্থনীতির দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। প্রথম পর্বের এই রাজনৈতিক যুদ্ধের খেলায় এটি মহাজোটের ঐক্যের নীতির একটি সাফল্য বলা যায়। এই সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়েই প্রথম পর্বে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। মহাজোটের সাফল্যের ওপর শেখ হাসিনার ঐক্যের সরকার দাঁড়িয়ে আছে।

কালের কণ্ঠ : দ্বিতীয় পর্বে কী ঘটতে পারে?

হাসানুল হক ইনু : ২০১৯ সাল থেকে আমরা দ্বিতীয় পর্বে যাচ্ছি। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে গেলেও যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। এখনো এদিকে-ওদিকে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী চক্ররা হামলা চালাচ্ছে। এখনো বিএনপি সংবিধানের চার নীতি মানেনি এবং রাজনৈতিকভাবে জাতির পিতাকে স্বীকার করে নেয়নি। তারা একাত্তরের গণহত্যাকে স্বীকার করে নেয়নি। যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াতি চক্রকে বিএনপি এখনো তার জোট থেকে পরিত্যাগ করেনি। সুতরাং বিএনপি এখনো রাজনীতির জন্য হুমকি। এই দ্বিতীয় পর্বে তারা প্রধান থাকবে না। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের যে অবশেষটুকু, এটি ধ্বংস করার শেষ যুদ্ধটি এই দ্বিতীয় পর্বে চলবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক শান্তি টেকসই করার জন্য জঙ্গিবাদ উৎখাতের যে সাফল্য অর্জন করেছি, সেটিকে টেকসই করা এবং এই বিশ্বাস মানুষের মধ্যে দেওয়া যে বাংলাদেশে আর কোনো দিন রাজাকার ও জঙ্গিবাদী সমর্থিত সরকার আসবে না। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ সরকারের প্রতিপক্ষ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক আরেকটি দলই থাকবে।

কালের কণ্ঠ : আপনি তো স্বীকার করবেন যে রাজনীতিতে পারসেপশন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মতো বড় শক্তির বিপরীতে অ্যান্টি আওয়ামী লীগও অন্যতম আরেকটি বড় শক্তি বলে মনে করা হয়। এই বড় শক্তির এখনো মূল প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে বিএনপি। এখন অন্য কোনো বড় মেরুকরণ না ঘটলে এই বিএনপিকে কী আদৌ দুর্বল করা সম্ভব?

হাসানুল হক ইনু : সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী পৃষ্ঠপোষক বিএনপি, খালেদা জিয়া ও তারেক—এই রাজনৈতিক অপশক্তির বিদায় না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান আপনি দেখবেন না। জনগণ কিন্তু তার ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশ করছে। শ্রমিক নারী কিংবা সামাজিক শক্তিরা কিন্তু রাজপথে আছে। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি মাঠে নেই। তার অর্থ মহাজোট বনাম সাম্প্রদায়িক শক্তির মধ্যে যে যুদ্ধ বা লড়াই চলছে, সেটির সমাপ্তি বা বিদায়ঘণ্টা বাজার পর্ব চলছে। এই দ্বিতীয় পর্বে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়বে এবং তাদের আর সম্ভাবনা থাকবে না। নতুন শক্তির উত্থান তখন দেখা যাবে। তার আগে দেখা যাবে না।

কালের কণ্ঠ : তার মানে মেরুকরণ আপনি সামনে দেখতে পাচ্ছেন?

হাসানুল হক ইনু : দেখুন, আমরা এখন যুদ্ধের ভেতর দিয়েই যাচ্ছি। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদী অপরাজনীতির ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে উদার গণতন্ত্রের সবুজ সুফলা জমি তৈরির কাজ চলছে। বিএনপি-জামায়াতি চক্রের চূড়ান্ত বিদায়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন মেরুকরণ ঘটবে।

কালের কণ্ঠ : সেটি কি মাইনাস বিএনপি, মাইনাস জামায়াত?

হাসানুল হক ইনু : হ্যাঁ, মাইনাস বিএনপি, মাইনাস জামায়াতের পরেই উদার আরেকটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটবে।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু রাজনীতি থেকে বিএনপিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা হলে শক্তি হিসেবে মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কা বলে অনেকে মনে করেন।

হাসানুল হক ইনু : বিএনপি হচ্ছে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী চক্রের রাজনৈতিক ঠিকানা। তাই আমি মনে করি বিএনপির অবসান হলে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হচ্ছে না। কারণ লড়াইটি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। বিএনপিকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ রাজনীতির ময়দানে সাম্প্রদায়িকতাকে টিকিয়ে রাখা।

কালের কণ্ঠ : ঠিক আছে বিএনপিকে টিকিয়ে রাখা হলো না। কিন্তু জঙ্গিবাদের উত্থানের সম্ভাবনা আছে কি না?

হাসানুল হক ইনু : ওই শক্তির সম্ভাবনা দেখি না। বিএনপি যদি সাম্প্রদায়িক না হয়ে ডানপন্থী হতো, তাহলে আমি ওই মেরুকরণ দেখতাম। বিএনপি জামায়াত-জঙ্গিবাদী ও যুদ্ধাপরাধীরা একই ঠিকানার মালিক। সুতরাং বিএনপির অবসান হলে একসঙ্গে আম ও ছালা সবসুদ্ধ চলে যাবে।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু সরকারবিরোধী যে বিরাট শক্তি, তারা তো নির্মূল হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছে না।

হাসানুল হক ইনু : আমি দলের কথা বলছি না। রাজাকারের যে সরকারবিরোধী গ্রুপ বা শক্তিটা, তারই তো ধ্বংস চাচ্ছি আমি।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু সরকারবিরোধিতা কি শুধুই রাজাকারদের, নাকি অন্য শক্তিও আছে?

হাসানুল হক ইনু : আমি অন্য শক্তির ধ্বংস চাচ্ছি না। যখনই রাজাকাররা মাঠ ছেড়ে দেবে; যেমন সারা দেশের গ্রামেগঞ্জে বিএনপি এরই মধ্যে মাঠ ছেড়ে দিয়েছে। এখন ওরা জায়গা বদল করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। মাঠপর্যায়ে অনেকে দল না ছাড়লেও তাদের এখন কোনো তৎপরতা নেই। নিরপেক্ষ হয়ে যাবে—এমন একটি মাহেন্দ্রক্ষণে বিএনপি দাঁড়িয়ে আছে।

কালের কণ্ঠ : জামায়াত নিষিদ্ধ হচ্ছে না কেন, এটিও তো একটি বড় প্রশ্ন?

হাসানুল হক ইনু : জামায়াত নিষিদ্ধ হচ্ছে না—এটি সময়ের ব্যাপার। এটি একটি আইনের ব্যাপার। এ প্রশ্নে হাইকোর্টে একটি মামলা আছে। সরকার একটি একটি করে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এখানে সরকারকে দোষ দেবেন না এ জন্য যে, সরকার তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। অনেকে মনে করেছে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি হবে না। ফাঁসি তো হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারকে সময় দিতে হবে।

কালের কণ্ঠ : আপনার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল বলে ব্যাপক গুঞ্জন আছে!

হাসানুল হক ইনু : বন্ধুত্ব নয়, সে তো আমার বয়সে ছোট ছিল। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ষাটের দশকের তরুণ প্রজন্মের একজন ছিলেন। ওর বাবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পরিচয় ছিল। আমার বাবা রাজনীতি না করলেও চাকরির সুবাদে ওর বাবার সঙ্গে পরিচয় ছিল। তাঁরা ষাটের দশকে ধানমণ্ডিতে বসবাস করার কারণে পরিচয় ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বন্ধুত্ব কখনো ছিল না।

কালের কণ্ঠ : হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ককে কিভাবে দেখছেন?

হাসানুল হক ইনু : হেফাজতের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক চুক্তিও নেই। হেফাজতের রাজনীতির কোনো অনুমোদনও দেওয়া হয়নি। তবে হেফাজতের নেতা মাওলানা শফী সাহেব কওমি মাদরাসার একটি কমিটির প্রধান হয়েছিলেন। সেই কমিটি কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে কিভাবে মূল স্রোতে আনা যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ করে। সরকার অনেক পরীক্ষ-নিরীক্ষা করে সেই সুপারিশের কিছু গ্রহণ করেছে। সেই সুবাদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। এই বৈঠকটিকে হেফাজতের সঙ্গে বৈঠক বলে চালিয়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং কওমি মাদরাসা শিক্ষাকে মূল স্রোতে নিয়ে আসার ঘটনা শেখ হাসিনার যুগান্তকারী পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে, ২০১৪ সালের আগে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ঢাকা দখল করার হেফাজতি জঙ্গি তাণ্ডব শেখ হাসিনা কঠোরভাবে দমন করেছিলেন। হেফাজতের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধাবস্থা এবং সেই যুদ্ধাবস্থা থেকে বিজয়ী হয়ে আমরা সামনের দিকে এগোচ্ছি।

কালের কণ্ঠ : ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে কোনো মূল্যায়ন?

হাসানুল হক ইনু : ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ভালো-মন্দ মিশিয়ে ভালোই হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন সব একাট্টা হয়ে নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন বানচাল ও ভূতের সরকার কায়েমের চক্রান্ত মোকাবেলা করে নির্বাচনটি পার হয়েছে। এটিই গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক দিক।

কালের কণ্ঠ : নির্বাচন রাতে, নাকি দিনে হয়েছে এই বিতর্কে না যাওয়াই ভালো মনে করছেন?

হাসানুল হক ইনু : জনগণ, প্রশাসন ও সশস্র বাহিনী সবাই মিলে বাংলাদেশকে সংবিধান, গণতন্ত্র ও নির্বাচনের পথে রাখতে পেরেছে—এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।

কালের কণ্ঠ : প্রধানমন্ত্রী নিজেও এ ধরনের নির্বাচনের পক্ষে ছিলেন না—এমন গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে শোনা যায়।

হাসানুল হক ইনু : এর কোনো উত্তর আমি দেব না। কে কী চেয়েছেন এটি বড় কথা নয়। তবে ২০১৪ সালের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে সংবিধানে রাখা এবং ২০১৮ সালেও এই চ্যালেঞ্জ ছিল। ওই দুটি ভোট চক্রান্ত ও যুদ্ধের চশমা দিয়ে দেখা হলে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও গণতন্ত্রের জন্য অনেক বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ।

কালের কণ্ঠ : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরোধী দলে থাকার ঘটনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

হাসানুল হক ইনু : সামরিক স্বৈরাচার হিসেবে এরশাদের অপরাধ ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে মামলা চলছে। এগুলোর ব্যাপারে সরকার আপস করেনি। জাতীয় পার্টি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়েছে। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি এবং আশির দশকে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশগ্রহণের পরে বিএনপির কাছে আমরা আশা করেছিলাম পরিস্থিতি তারা একটু পুনর্মূল্যায়ন করে নেবে। কিন্তু দলটি সামরিক শাসন ও সাম্প্রদায়িকতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে না এসে জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নেয়। জাতীয় পার্টি কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা থেকে দূরে সরে আসে। মহাজোটের শরিক হিসেবে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জামায়াতকে নিষিদ্ধকরণ, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারসহ গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রশ্নে শরিক হয়েছে। সুতরাং জাতীয় পার্টির এই শরিকানাটি তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

কালের কণ্ঠ : জামায়াতকে পরিত্যাগ করলেই আপনার ভাষায় বিএনপি শুদ্ধ হবে?

হাসানুল হক ইনু : শুধু জামায়াতকে ছাড়লেই বিএনপি গণতন্ত্রের পরিধির জন্য উপযুক্ত হবে না। বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চারটি কাজ করতে হবে। সংবিধানের চার মূলনীতির প্রতি আস্থার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক বন্ধ করে স্বাধীনতার ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার করা, পাকিস্তানের গণহত্যাকে মেনে নেওয়া এবং জামায়াত ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বর্জন করতে হবে।

কালের কণ্ঠ : ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক। মহাজোটের সরকারে আপনারা এবার মন্ত্রী নেই কেন?

হাসানুল হক ইনু : একটি হচ্ছে জোটের রাজনীতি, অন্যটি সরকার গঠন। জাতীয় পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দলে চলে যাওয়ার পরও মহাজোট এখনো বিদ্যমান। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনটি মহাজোটের নির্বাচন হয়েছে। সে জন্যই আমি বলছি, মহাজোটের সাফল্যের ওপর শেখ হাসিনার সরকার দাঁড়িয়ে আছে। সেই সরকারে কয়জন আওয়ামী লীগ মন্ত্রী বা কয়জন জোটের মন্ত্রী হলো—এটি বড় কথা নয়। মন্ত্রিসভাটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব এখতিয়ার। তার এই এখতিয়ারে ২০০৯ সালেও আমি, মেনন ভাই ও তোফায়েল ভাইসহ অনেকে ছিলাম না। তখনো আমি বলেছিলাম এটি মহাজোটেরই সরকার। মন্ত্রিসভায় ইনু থাকল কি থাকল না, এটি বড় বিষয় নয়।

কালের কণ্ঠ : আপনি এখনো একই কথা বলছেন? কোনো অসন্তোষ নেই?

হাসানুল হক ইনু : একই কথা বলছি। এমপি-মন্ত্রীর তকমা লাগার আগে ইনুর জন্ম হয়েছে। এমপি-মন্ত্রীর তকমা দিয়ে ইনু পরিচিত নয়। ইনু একজন সংগ্রামের সৈনিক।

কালের কণ্ঠ : স্বাধীনতার পরে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করার লক্ষ্য নিয়ে জাসদের জন্ম। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে জাসদের শীর্ষ তিনজন নেতা তিন সময়ে মন্ত্রী হয়েছেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

হাসানুল হক ইনু : মন্ত্রিত্ব বড় কথা নয়। কোন সরকারে কিভাবে মন্ত্রী হলেন সেটি বড় কথা। আ স ম আবদুর রব ১৯৯৬-পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। তখন ঐক্যবদ্ধ জাসদ আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রব সাহেব মন্ত্রী হয়েছেন। এটি প্রশংসার যোগ্য। শাহজাহান সিরাজ সাহেব জাসদ রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে গিয়ে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হলেন। এটি রাজনৈতিকভাবে অসম্মানজনক ছিল বলে আমি মনে করি। আমি মহাজোটের সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে, তার পরিণতিতে মন্ত্রী হয়েছি। এটি একটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগের বিরোধিতার মধ্য দিয়েই জাসদের উত্থান হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

হাসানুল হক ইনু : ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদের রাজনীতি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমাজতন্ত্রের পক্ষে। আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় থাকলেও জাসদ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল না। জাসদের রাজনীতি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে। পাকিস্তানের রেখে যাওয়া রাষ্ট্রযন্ত্র ঢেলে সাজাতে হবে এবং তৎকালীন সময়ে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বহিষ্কার করতে হবে। সমাজতন্ত্র কায়েমের সেই লড়াইয়ের সময় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। ফলে দৃশ্যমান লড়াইটি মনে হয়েছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। এ লড়াইটি প্রকাশ্যে হয়েছে, গোপনে নয়। কিন্তু যে মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন, ঘোষণা দিয়ে বলেছি, এই হত্যাকাণ্ড নাজায়েজ। ১৬ আগস্ট থেকেই মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে জাসদ আনুষ্ঠানিক ভূমিকা নেয়। যে কারণে ৮২ দিনের শাসনকালে জাসদের শতাধিক কর্মীকে মোশতাক হত্যা করে।

কালের কণ্ঠ : ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলির সময়ে ট্যাংকের ওপর উঠে আপনি উল্লাস প্রকাশ করেছেন বলে খবর বেরিয়েছিল।

হাসানুল হক ইনু : এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা। আসলে ব্যাপার হলো, গত ১০ বছরে বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ফলে জামায়াতি ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লাসহ বিভিন্ন জায়গায় তারা ফেক ছবি তৈরি করে এই প্রচারটি করেছে। সেখানে ট্যাংকের ওপর গোঁফওয়ালা প্যান্ট-শার্ট পরা একজন লোকের ছবি বসিয়ে অপপ্রচার চালায় যে ওই লোকটি ইনু। কিন্তু ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ঢাকা শহরে কোনো লোক নাচানাচি করেনি। সব নীরব-নিস্তব্ধ ছিল। ৭ নভেম্বরের পর অসংখ্য সৈনিক ও পাবলিক নাচানাচি করেছে। আমি ইনু তখন আত্মগোপনে ছিলাম। রাজনৈতিকভাবে আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী। 

কালের কণ্ঠ : জঙ্গিবাদ ও বিএনপিকে কোণঠাসা করা ছাড়া দ্বিতীয় পর্বে আর কি কোনো চ্যালেঞ্জ আছে?

হাসানুল হক ইনু : ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের দ্বিতীয় পর্বে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্ব এখনো শেষ হয়নি। জঙ্গিমুক্ত রাজনীতিকে টেকসই করে সাম্প্রদায়িকতার অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে দিতে হবে। এ ছাড়া নতুন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বৈষম্য, দলবাজি ও দুর্নীতি মোকাবেলা করে সুশাসনের বাংলাদেশ তৈরি করা। এই কাজগুলো করতে গেলে এখনো ঐক্যের প্রয়োজন আছে। মহাজোটের ও ১৪ দলের প্রয়োজন রয়েছে। এখনো একলা চলার সময় আসেনি। এখনো চক্রান্ত বিদ্যমান। সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদীরা গর্তে চলে গেলেও ধ্বংস হয়নি। যেকোনো সময় ছোবল মারতে পারে। ভূতের সরকার এবং অস্বাভাবিক সরকার তৈরির স্বপ্ন এখনো অনেকে দেখেন। রাজাকার সমর্থিত সরকার তৈরির স্বপ্নও অনেকে দেখেন। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে এখনো আত্মসমর্পণ কিংবা ভুল স্বীকার করেনি। সুতরাং বাংলাদেশ এখনো বিপদের মধ্যে আছে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, মহাজোটের সরকারই হচ্ছে শেখ হাসিনার এবং আওয়ামী লীগারদের নিয়ে মন্ত্রিসভা। এতে আমার আপত্তি নেই। উনি যাকে পছন্দ করছেন তাকে নিয়েই সরকার চালাক। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে উনি এখনো ১৪ দলকে বর্জন করেননি। এটি উনি সঠিক কাজ করেছেন। মো. নাসিম ১৪ দলের সমন্বয়ক। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী মহাজোট ও ১৪ দল রাখার পক্ষে। এই দুই ঐক্য রেখেই দ্বিতীয় পর্বের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত এখনো আছে। শেখ হাসিনা ঐক্য রাখলেই আমি সন্তুষ্ট।

কালের কণ্ঠ : সুশাসন, দলবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে কতটা আশাবাদী আপনি?

হাসানুল হক ইনু : মহাজোটের ছাতার তলে দুর্নীতি, দলবাজি, ক্ষমতাবাজি, ভেজাল খাদ্য ও মাদকবিরোধী লড়াইয়ের প্রশ্নে কোনো প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। জঙ্গি দমনের লড়াইয়ের চেয়েও এটি কঠিন লড়াই। জঙ্গি দমন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সফলতা পেলে আমার বিশ্বাস, আইনের শাসন ও দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়েও তিনি সফল হবেন। দুর্নীতিবাজদের দিন ফুরিয়ে আসছে বলে আমি মনে করি। তবে লড়াইটি ওপর থেকে হতে হবে। রাস্তার ট্রাফিক পুলিশ পাঁচ টাকা, দশ টাকা ঘুষ খাচ্ছে—এই উকুন বাছতে যাওয়া যাবে না। ওপর থেকে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ব্যাংকের টাকা লুটপাটকারী, মানুষের টাকা আত্মসাৎকারী—এ ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ঈদের পর থেকেই শুরু হবে। দল ও মুখ দেখে আইন চলবে না। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই নীতি প্রতিষ্ঠা করাটাই হচ্ছে এই মুহূর্তের বড় চ্যালেঞ্জ।

কালের কণ্ঠ : বিরোধী দল কে হবে এটি ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নয়—এমন বক্তব্য আপনি কোন প্রেক্ষাপটে দিয়েছিলেন?

হাসানুল হক ইনু : ভোটের পরে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের সময় কিছু আওয়ামী লীগের নেতা এরশাদ এবং ১৪ দলের শরিকদের হুট করে বিরোধী দলে ঠেলে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগে গেলেন। সেই সময় আমি বলেছি যে ফরমায়েশি বিরোধী দল হয় না। আজকে যদি শেখ হাসিনা ঐক্য ভেঙে দেন, তারপর জাসদ সিদ্ধান্ত নেবে যে শেখ হাসিনা সরকারকে সমর্থন দেব, কি দেব না। ঐক্য ভেঙে দিলেও তো আমি সমর্থন দিতে পারি বা আরো কোনো দল দিতে পারে। সুতরাং আপনি বলার কে যে জাসদ বিরোধী দলে যাও বা জাসদ সরকারি দলে আসো। আমার পার্টি সিদ্ধান্ত নেবে যে আমি জোটে থাকব, কি থাকব না। আমার পার্টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ঐক্য ভাঙার সময় এটি নয়। একলা চলার সময় এটি নয়। এখন কনসিলিয়েশনের জন্য ঐক্য রক্ষার সময়।

কালের কণ্ঠ : জাসদ ভাঙার কারণ কী?

হাসানুল হক ইনু : সাম্প্রতিককালে যাঁরা জাসদ ত্যাগ করেছেন, তাঁরা কেন করেছেন তার কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

কালের কণ্ঠ : ওই অংশের কোনো দাবি ছিল?

হাসানুল হক ইনু : আকস্মিকভাবে তাঁরা চলে গেছেন। কোনো দাবি নেই। এখন তাঁরা ১৪ দলের পক্ষে ওকালতি করছেন। একসময় তাঁরা চিৎকার করে বলেছিলেন ইনু সাহেব মন্ত্রী কেন থাকবে। মন্ত্রিত্ব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বলেছেন। এ রকম অরাজনৈতিক সব কথাবার্তা। কিন্তু তাঁরা যে কী চান সেটি তাঁরাই ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

কালের কণ্ঠ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

হাসানুল হক ইনু : আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য