kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

সবাইকে ছাড়িয়ে সাকিব

টন্টন থেকে প্রতিনিধি   

১৮ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সবাইকে ছাড়িয়ে সাকিব

ওভারকোট গায়ে অশীতিপর এক বৃদ্ধ ধীর কিন্তু লম্বা পা ফেলে কুপার অ্যাসোসিয়েটস মাঠ ছাড়ছেন। তিনি জোয়েল গার্নার, চোখে-মুখে রাজ্যের বিরক্তি কিংবা ক্ষোভ। ৩২১ করেও আজকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ জেতে না! আশির দশকের ক্রিকেট দর্শকদের হৃদয় মুচড়ে ওঠারই কথা এ দৃশ্য দেখে।

কিন্তু তার মিনিটখানেক আগে রোমাঞ্চকর মুভি দেখে ফেরা পথ চলতি মানুষের বয়েই গেছে ‘বিগ বার্ডে’র হৃদয়ের ব্যথা বুঝতে। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে আরেকটা অলরাউন্ড নৈপুণ্য দিয়ে গেছেন সাকিব আল হাসান, যা গার্নারের কাউন্টি মাঠে গতকাল তাঁর ব্যাটে-বলে নৈপুণ্যের মতোই অনবদ্য। নিজের ২ উইকেট, অপরাজিত ১২৪ রানে এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের মসনদে ফেরা, বাঁচা-মরার লড়াইয়ে দলের দাপুটে জয় এবং ম্যাচ সেরার পুরস্কার মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটাকে এক রকম মজাদার স্যান্ডউইচই বানিয়ে খেয়েছেন সাকিব! ওহ, তাঁর এবং দলীয় অর্জনের দিনে বাঁ হাতি অলরাউন্ডারের আরেকটি ব্যক্তিগত ল্যান্ডমার্কের কথা উল্লেখ করা হয়নি। দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ছয় হাজারি ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন তিনিও। এমন স্মরণীয় ম্যাচের স্মারক হিসেবে একটি স্টাম্প তিনি রাখতে চেয়েছিলেন সংগ্রহে।

তুলেছিলেনও। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটের স্টাম্পগুলো এতটাই ডিজিটাল যে ওসব সংগ্রহের জন্য নেওয়ায় নিষেধ আছে সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের। তাই তুলে আবার স্টাম্পটি রেখেও দিতে হয়েছে সাকিবকে।

নিজের ভাণ্ডারে আরেকটি স্মারক না উঠুক, সাকিবের এদিনের নৈপুণ্য স্মারক হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ৩২২ রান তাড়া করে ৭ উইকেটে জেতা বাংলাদেশকে আবার নতুন চোখে দেখছে ক্রিকেট বিশ্ব। আত্মবিশ্বাসও বহুগুণ বেড়েছে বাংলাদেশের। ওটাই সাকিবের সবচেয়ে তৃপ্তির দিক। তবে ছোট্ট হলেও অতৃপ্তি একটা আছে অলরাউন্ডারের, ‘তামিমকে বলেছিলাম, যে উইকেট তাতে আমরাই খেলা শেষ করে দিতে পারি।’ কিন্তু অভাবিত রান আউটে তামিমের সঙ্গে ‘বিচ্ছেদ’ ঘটে সাকিবের।

পারফরম্যান্স তাঁদের কাছে এনেছিল। আবার পারফরম্যান্সই তাঁদের দূরে ঠেলেছে। এই দূরে চলে যাওয়া মানে শত্রুতা নয় কোনোভাবেই। তবে ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চোরাস্রোত কিন্তু বইছে তামিম ইকবাল খান ও সাকিব আল হাসানের মধ্যে। সেটি একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার!

একদা তাঁরা প্রকাশ্যে বন্ধুতার ঘোষণা দিয়ে যেতেন। বরাবরের ‘ইমোশনাল’ তামিমের মুখ থেকেই বেশি বেশি শোনা যেত হৃদ্যতার কথা। সাকিবও এ বন্ধুতার কথা কোনোকালেই অস্বীকার করেননি। নইলে পুরো দল থেকে এ দুজনকে আলাদা করা যেত কেন সহজেই? এ বন্ধুতা নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে অতীতে। একযোগে অধিনায়কত্ব যেমন পেয়েছিলেন, হারিয়েছেনও একই সঙ্গে। তবে নেতৃত্বের মুকুট না থাকলেও টিম মিটিং কিংবা ক্রিকেটীয় যেকোনো ইস্যুতে এখনো যথেষ্টই গুরুত্ব পায় এ দুজনের অভিমত। একজন নিজের ‘প্লেয়িং রোল’ বেছে নিয়েছেন। আরেকজন পছন্দের ব্যাটিং পজিশন চেয়ে নিয়েছেন। বিনিময়ে তাঁরা দিচ্ছেনও দুই হাত ভরে। নইলে তামিমের ক্রিজে স্থায়ীত্বের সঙ্গে দলের ইনিংসের আয়ু নির্ভরশীল—এমন ধারণা কেন ভর করবে দলের ভেতরে! ওদিকে তিন নম্বরে নেমে সাকিব যা করছেন, তাতে টপ-অর্ডারে তামিম এবং তাঁর মাঝের জায়গাটি নিয়ে বড়জোর লড়াই হতে পারে সৌম্য সরকার, লিটন কুমার দাশ কিংবা অন্য কারোর মাঝে। এক এবং তিন—ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের এ দুটি পজিশন দীর্ঘদিনের জন্যই হয়ে গেছে তামিম ও সাকিবের।

কিন্তু তাঁদের সেই অফ দ্য ফিল্ড পার্টনারশিপটা আগের মতো দৃশ্যমান নয়। তাঁদের টুকটাক কথা বলতে দেখা যায় শুধু মাঠে, বিশেষ করে ব্যাটিংয়ের সময় কিংবা সাকিব যখন বোলিং করেন, তখন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যাঁদের আয়ারল্যান্ড সফর থেকে হিসাব করলে পরবর্তী দেড় মাসে একসঙ্গে আড্ডা দিতে দেখা যায়নি, সেই তাঁদের ব্যাটিংয়ের সময় এমন দুর্দান্ত বোঝাপড়া! গতকাল আরেকটি পঞ্চাশোর্ধ জুটি গড়ার পথে সাকিব পয়েন্ট আর গালির মাঝে বল ‘ট্যাপ’ করতেই তামিম ছুটেছেন সিঙ্গেলসের জন্য। রান শেষ করে সঙ্গীর সিদ্ধান্তকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন সাকিব। আইপিএল ফেরত ঝরঝরে সাকিব যে দারুণ খেলবেন বিশ্বকাপে—এমন ভবিষ্যদ্বাণী ডাবলিনে বসেই করেছিলেন তামিম। আবার গতকালের ম্যাচ ৯ উইকেটেই জেতা সম্ভব—তামিমের ওপর এতটাই আস্থাশীল সাকিব।

‘হাই প্রোফাইল’ মানুষের সম্পর্কের রসায়ন বোঝা অবশ্য কঠিনই। বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মার ‘সম্পর্ক’ নিয়ে কত রটনাই তো আছে বাজারে। তবু ক্রিকেট মাঠে তাঁরা ভারতের কান্ডারি, যুদ্ধ করেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। স্টিভেন স্মিথ-ডেভিড ওয়ার্নারের সম্পর্কও সাপে-নেউলে হয়ে গেছে বল টেম্পারিং কাণ্ডের পর থেকে। তাঁরাও একসঙ্গে খেলে যাচ্ছেন একই দলে। অবশ্য সাকিব-তামিমের বহুল আলোচিত বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিণত হয়েছে, এমনটা এখনো শোনা যায়নি। তবে সেই মাখামাখি যে আর নেই, এটি আর গোপন নেই। অটুট আছে পেশাদারি সম্পর্কটাই, মাঠে।

ড্রেসিংরুমের ভেতর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে দারুণ একটি উক্তি আছে সাকিবের। চন্দিকা হাতুরাসিংহের জমানায় কোচের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না তাঁর। এ নিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তরে নিজস্ব দর্শনের কথা বলেছিলেন সাকিব, ‘তিনি আমার বন্ধু নন, কোচ।’ মানে, কোচকে বন্ধুই হতে হবে এমন তো কোনো বাধাধরা নিয়ম নেই। তেমনি টিমমেটের সঙ্গেও গলাগলি বন্ধুত্বের দরকার নেই, যে যার কাজটা ঠিকঠাক করলেই তো হয়!

হচ্ছেও তাই। তামিম-সাকিবের দলে প্রভাব সম্পর্কে সেদিন মাশরাফি বিন মর্তুজা বলছিলেন, ‘আমাদের দলের সবচেয়ে স্মার্ট ক্রিকেটার সাকিব। আর তামিম হলো দলের স্থিতি।’ সাকিবের তিন নম্বরে উঠে আসার ব্যাপারে অত্যুৎসাহী ছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, তেমন দাবি হয়তো তিনি নিজেও করবেন না। তবে সেই আয়ারল্যান্ডে বসেই মাশরাফি মুগ্ধতা নিয়ে বলছিলেন, ‘ওরা (তামিম ও সাকিব) একসঙ্গে লম্বা সময় ক্রিজে থাকলে এর চেয়ে ভালো কী হতে পারে?’

সত্যিই তো। দলের সবচেয়ে সফল দুই ব্যাটসম্যান ক্রিজে বেশি সময় থাকা মানেই তো ইনিংসের এভারেস্টে চড়ে বসার প্রবল সম্ভাবনা।

এক যুগেরও বেশি সময় ঘাম ঝরিয়ে গড়ে তোলা ‘ইমেজ’ অক্ষুণ্ন রাখার ব্যক্তিগত লড়াইয়েও কি বাড়তি অনুপ্রেরণা পান সাকিব ও তামিম? দলীয় খেলায় ব্যক্তিগত চিন্তা করার অনুমোদন নেই। তবু তামিম সেঞ্চুরি করলে কি সাকিবের হাত নিশপিশ করে না? কিংবা উল্টোটা?

এ জাতীয় আবেগতাড়িত প্রশ্নে সাকিবের উত্তর পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে আবেগের আলতো ছোঁয়া সব সময়ই থাকে তামিমের ক্রিকেট কফিনে। তাই অনায়াসে বলে দেন, ‘দলের অন্য কেউ বড় রান করলে অবশ্যই ভালো লাগে। দলই সবচেয়ে আগে। তবে তখন মনে হয় রানগুলো তো আমিও করতে পারতাম। এভাবে আমি নিজেকে চার্জড আপ রাখি।’ তাতে লাভ হয় দলেরই। পরের ইনিংসে তামিম রানের জন্য আরো জোরে ছোটেন। অলক্ষ্যে সাকিবও।

মাসখানেকের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত দুজনের পরিসংখ্যানেই তো মারকাটারি লড়াইয়ের ঝাঁজ! হাবিবুল বাশার টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের তিন হাজারি ক্লাব খুলে অবসরে গেছেন সেই ২০০৬ সালে। ওয়ানডেতে সেটির গোড়াপত্তন তামিমের। এরপর চার, পাঁচ এবং সবশেষ ছয় হাজার রান করা প্রথম বাংলাদেশিও তিনি। গতকাল সেই ছয় হাজারি ক্লাবে তামিমের সঙ্গী হয়েছেন সাকিব আল হাসান।

দুজনের সামনেই ওয়ানডের পরের স্টেশন সাত হাজারি। নিশ্চিত থাকুন, এগিয়ে থাকা তামিম ওই ক্লাবের দরজা খুলতে আরো জোরে ছুটবেন। আবার ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র এগিয়ে যাওয়া বসে বসে দেখার লোকও নন সাকিব আল হাসান, তুমুল লড়াই অবশ্যম্ভাবী!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা