kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

অর্জনে-গর্জনে রাঙাল বাংলাদেশ

১৮ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অর্জনে-গর্জনে রাঙাল বাংলাদেশ

তামিমের রান আউট এবং মুশফিকের বিদায়ের পর লিটন দাশের সঙ্গে দুর্দান্ত জুটিতে ম্যাচ জেতালেন সাকিব। ছবি : মীর ফরিদ

বিশ্বকাপের মঞ্চে সেঞ্চুরি, তাও টানা দ্বিতীয়। তবু দায়সারা উদ্‌যাপনে মাঠে উপস্থিত ফটো সাংবাদিকদের হতাশই করে থাকবেন সাকিব আল হাসান! তবে তিনি তো বাইশ গজে ভালো ছবির সাবজেক্ট হতে নামেননি গতকাল। এসেছিলেন জয় দিয়ে নিজের অর্জনকে রাঙাতে। লিটন কুমার দাশের অষ্টম বাউন্ডারিতে ৭ উইকেটের জয় নিশ্চিত হতেই যেন সাকিবের মনে হয়েছে ১২৪ রান করে ফেলেছেন তিনি! ব্যাটটা এক পাক ঘুরিয়ে একটা স্মারক স্টাম্প তুলেই অবশ্য উদ্‌যাপন শেষ সাকিবের। কাজ আরো বাকি যে!

২ উইকেট এবং অপরাজিত ১২৪—ম্যাচসেরা বেছে নেওয়ার জন্য এক মুহূর্তও ভাবতে হয়নি ম্যাচ অ্যাডজুডিকেটরদের। ব্যাটে-বলে এমন প্রভাবশালীর দিনে আর সবাই যেন শুধুই পার্শ্বচরিত্র! এমনকি গতকাল যে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সাম্প্রতিক রেকর্ডটা ৮-২ করেছে বাংলাদেশ, সেটিও। ক্রিকেটে এমন কিছু দিনে কিছু ব্যক্তিগত নৈপুণ্য এতটাই প্রভাবশালী হয় যে, বাকি সব আড়ালে পড়ে যায়।

সে দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেকে দুর্ভাগা ভাবতে পারেন অনেকেই। মাশরাফি বিন মর্তুজা তো সেদিন একঘর সাংবাদিকের সামনেই বলেছেন, ‘ভাগ্য সঙ্গে না থাকলে তামিম বাকি ম্যাচগুলোয় আর ২৩ রানও করতে পারবে না।’ গতকাল বড় ইনিংসের সম্ভাবনা জাগিয়ে এগিয়ে যাওয়া তামিম ইকবালের ওরকম রান আউট হওয়াটা যেন অধিনায়কের বিশ্বাসকেই সমর্থন দিয়ে গেল। মুশফিকুর রহিমও তো লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে করা ওশান থমাসের বাউন্ডারি বলে উইকেট দিয়েছেন। লিটন কুমার দাশের চার-ছক্কার দুটোই উড়ে গেছে থার্ড ম্যান বাউন্ডারির ওপর দিয়ে। আর ক্যারিবীয় অধিনায়ক জেসন হোল্ডার তো হারের পেছনে সাকিবের দেওয়া ক্যাচ নিতে না পারা নিয়ে আক্ষেপও করেছেন।

তবে ভাগ্যই সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি নয়। প্রস্তুতিও শেষ কথা নয়। প্রস্তুতি, সামর্থ্যের মতো সমান গুরুত্বপূর্ণ ‘মাইন্ডসেট’ও। আইপিএল থেকে ফেরা সাকিবের ফিটনেসের উন্নতি দেখে চোখ কপালে উঠেছে সবারই। তামিম সেই আয়ারল্যান্ডেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘সিওর থাকুন, ও (সাকিব) খুব ভালো করবে।’ ডাবলিনে তিনি ভুল প্রমাণ করেননি। এরপর বিশ্বকাপের দেশে এসে শোনা গেল, সাকিবের নজর টুর্নামেন্ট সেরার ট্রফির দিকে। তিনি নিজে বলেননি অবশ্য, তবে মাঠে সেরার মতোই নৈপুণ্য দেখিয়ে চলেছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। ৭৫, ৬৪, ১২১ এবং গতকালের অপরাজিত ১২৪ রান সাকিবকে ফিরিয়ে দিয়েছে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের চেয়ার।

একজন অলরাউন্ডার ‘শো-স্টপার’ হয়ে গেলে অন্যদের ভাগে খুব বেশি জোটে না। যদিও লিটন পর্যাপ্ত বিশেষণের দাবিদার। ক্রিজে এসে ফর্মের তুঙ্গে সাকিবকে পেয়েছেন। তবে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচের স্নায়ুচাপ সয়ে খেলতে হয়েছে লিটনকে। তার ওপর নিজের অভ্যস্ত টপ অর্ডারের পরিবর্তে মিডল অর্ডারে খেলার ঝক্কিও নিতে হয়েছে তাঁকে, যা দেখে ম্যাচসেরা সাকিবও মুগ্ধ, ‘প্রথম কয়েকটা বল খেলার পর যে ব্যাটিং লিটন করেছে, সেটা দেখাও আনন্দের।’ প্রচণ্ড চাপের পুরো ম্যাচটাকেই তো আনন্দবিহার বানিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ ৩২১ রান করার পরও জয়ের আত্মবিশ্বাসে ড্রেসিংরুম ভরপুর থাকে কি এমনি এমনি নাকি! ঘরের এ খবর ‘ফাঁস’ করেছেন সাকিব নিজেই, ‘সবচেয়ে ভালো দিক হলো—ড্রেসিংরুমে আমরা সবাই বিশ্বাস করছিলাম যে ৩২২ রান করা সম্ভব। একবারের জন্যও মনে হয়নি কাজটা কঠিন। এটাই আমাদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।’ গতকালের দাপুটে জয় নিশ্চিতভাবেই বিশ্বকাপের বাকি অংশেও আত্মবিশ্বাস জোগাবে বাংলাদেশ দলকে।

শুরুতে ক্রিস গেইল এবং শেষে আন্দ্রে রাসেল। পুরো ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ব্যাটিং লাইন আপ নিয়েই ছক এঁকেছিল বাংলাদেশ। তবে টন্টনের ছোট মাঠে গেইল এবং রাসেলই যে বেশি ভয়ের কারণ, সেটি তো সব দলের বেলাতেই প্রযোজ্য। তবে এ দুজনকেই বিনা রানে ফিরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। গতকালের শো ডাউনের বেশ কয়েকটি বাঁকের ওটা একটা অবশ্যই। নতুন বলে একদিকে ক্রমাগত রান আটকে গেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। আর অন্য প্রান্ত থেকে গেইলকে তুলে নিয়েছেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। বল বাইরে যাবে ভেবে জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট পেতেছিলেন স্বঘোষিত ‘ইউনিভার্স বস’। কিন্তু সামান্য ভেতরে আসা বল তাঁর ব্যাটের কানায় লেগে জমা পড়ে উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিমের গ্লাভসে। এই ক্যাচটা বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে ধরেছেন তিনি। আর রাসেলেরটা ডানে ঝাঁপ দিয়ে, মুস্তাফিজুর রহমানের বলে। পার্থক্য এই যা।

অবশ্য দুই হার্ডহিটারের বিনা রানে বিদায়ের মাঝখানের সময়টায় আবার পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের বোলিংয়ের সঙ্গে সাম্প্রতিককালে ‘মৈত্রী’র সম্পর্ক গড়ে তোলা শাই হোপ ও শিমরন হেটমায়ার। এ ম্যাচে নামার আগে বাংলাদেশের বিপক্ষে হোপের ওয়ানডে ব্যাটিং গড় ব্র্যাডম্যানীয়, নব্বইয়ের ওপরে। দশম ম্যাচে যা আরেকটু বেড়ে হয়েছে ৯৪.৭৫। আর হেটমায়ার কিছুক্ষণ উইকেটে  থাকলেই যথেচ্ছ পেটান। গতকালও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ২৫ বলে ফিফটি করেছেন, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো ক্যারিবীয়র দ্রুততম ফিফটি। হেটমায়ারের অবশ্য সৌভাগ্যই যে ব্যক্তিগত ১২ রানে রান আউট করার সহজ একটি সুযোগ নষ্ট করেছেন সাইফউদ্দিন। আর তাঁকে তুলে মারার মঞ্চ তৈরিতে হোপের সঙ্গে অবদান রেখে গেছেন এভিন লুইসও।

গতকালের লুইস দুটি স্বতঃসিদ্ধ ধারণা ভুল প্রমাণ করে গেছেন। প্রথমত, মাশরাফি কিংবা মুস্তাফিজের অতীত সাফল্য থাকা মানেই তিনি এই দুই বাংলাদেশি পেসারের নিয়মিত শিকার নন। আবার বাঁহাতি ব্যাটসম্যান দেখলেই সাকিবের দূরে দূরে থাকারও দরকার নেই। চ্যাম্পিয়ন বোলারই তো গতকাল ফিরিয়েছেন লুইসকে। বিষয়টি কনফার্ম করার জন্যই কি না, সাকিবের দ্বিতীয় শিকারটিও এক বাঁহাতি ব্যাটসম্যান নিকোলাস পুরানের। এ দুজনকে সেখানেই থামানো না গেলে আরো দূরের পথ পাড়ি দিত ক্যারিবীয়রা।

অবশ্য মুস্তাফিজের শিকারগুলোও কম মূল্যবান নয়। হেটমায়ারকে স্লোয়ারে ফেরানোর দুই বল পরই তিনি তুলে নিয়েছেন রাসেলকে। সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে হোপও মুস্তাফিজের শিকার। অথচ ৫৯ রানে ৩ উইকেট নিয়ে দিনের সফলতম বোলার এ বাঁহাতি শুরুর দুই স্পেলে হতাশাই ছড়িয়েছিলেন শুধু। তবে প্রয়োজনের মুহূর্তে আবার আশাও জাগিয়েছেন। ৩২০ রান তো ম্যাচের আগে বাংলাদেশের গেম প্ল্যানে ছিলই।

সাড়ে ৮ ওভার বাকি রেখে ৩ উইকেটেই বাংলাদেশের ৩২২ রান তুলে ফেলায় তো সে ছকেরই প্রতিফলন!

মন্তব্য