kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সিপিডির পর্যালোচনা

উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি সুবিধা পাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি সুবিধা পাবে

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার প্রতিফলন নতুন অর্থবছরের বাজেটে নেই বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গবেষণা সংস্থাটি বলেছে, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত নয়, যারা সচ্ছল ও উচ্চ আয়ের মানুষ, তারা বাজেটের বেশি সুবিধা পাবে। যারা ‘অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী’, এবারের বাজেট তাদের পক্ষেই গেছে।

সিপিডির মতে, পরিবর্তনের জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োজন তা বাজেটে নেই, অথচ তা নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল। এটা পরিতাপের বিষয়। এ ছাড়া অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোও বাজেটে তুলে ধরা হয়নি এবং সমাধানের কোনো আভাসও নেই। বরং বাতাসের ভেতর কিছু আশ্বাসের বাণী দেওয়া হয়েছে; কিন্তু সেগুলো বাস্তবভাবে আসেনি। নতুন বাজেটকে ভারসাম্যহীন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে সিপিডির পক্ষ থেকে পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থার সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

বাজেটে বেশি সুফল কারা পাবে এমন প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় বলেন, ‘এ বাজেট দ্বারা সচ্ছল ও উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি সুবিধা পাবে। এ ছাড়া গরিব মানুষের জন্য প্রান্তিকভাবে একধরনের ব্যবস্থা থাকছে। কিন্তু বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে বিকাশমান মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বাজেট থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে না। কৃষককে ধানের লোকসানের জন্য কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ানো হয়নি। কিন্তু সম্পদের সারচার্জ সীমায় ছাড় দেওয়া হয়েছে।’

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জন্য আমরা কী করতে পারব, এটার ওপর নির্ভর করছে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়ার বিষয়টি। কারণ বিকাশমান মধ্যবিত্তরাই হলো চালিকাশক্তি। চিন্তা, চেতনা, উপার্জন ও বুদ্ধিমত্তা—এগুলো সব ক্ষেত্রেই চালিকাশক্তি। সেই চালিকাশক্তিকে যদি আপনি ঠিকভাবে পরিপালন না করেন, তাহলে ইশতেহারের চেতনা তো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে। বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ আগামীতে পৌঁছে দেওয়ার যে অঙ্গীকার নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল, তা পূরণের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা বা কর্মসূচি এবারের বাজেটে রাখা হয়নি।’

ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নিয়ে কর্মপরিকল্পনা নেই : ব্যাংকিং খাতে সংস্কার ও আলাদা কমিশন গঠন করার ঘোষণা না আসা প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নিয়ে বাজেটে আলোচনা আছে; কিন্তু কর্মপরিকল্পনা নেই। ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে এটা একদম পরিষ্কার, যারা এটা থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে, তারা এ পরিবর্তনগুলো আনতে দিতে চায় না। তারা আসলে স্বচ্ছতা চায় না। ব্যাংকিং কমিশন হলে তথ্য-উপাত্তের যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলো প্রকাশিত হলে কী হবে, সেই দুশ্চিন্তা থেকেই ব্যাংকিং কমিশন করতে দেওয়া হবে না। শুধু স্বচ্ছতাকে ভয় পায় বলেই এটা করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

সুবিধাভোগীরা নীতি নিয়ন্ত্রণ করছে : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘শুধু করের আওতা বৃদ্ধি করলে হবে! মানি লন্ডারিংয়ের জন্য নির্বাচনী ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি আছে, এগুলোও বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ করের টাকা তো বিদেশেও চলে গেছে। এটা একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। তাহলে আপনি বিদেশের টাকা আটকাবেন, কালো টাকা বিনিয়োগ করতে দেবেন—এটা কেমন কথা। তাহলে তো আপনার পুরোটাকে একটা সামঞ্জস্যের মধ্যে আনতে হবে। কিন্তু সব কিছুকে সামঞ্জস্যের মধ্যে আনার জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রকাশ করতে পারছেন না। কারণ সুবিধাভোগীরা নীতি নিয়ন্ত্রণ করছে।’

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সক্ষমতা বাড়ছে না গরিবের : শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে জিডিপি অনুপাতে ব্যয় না বাড়া দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, ‘যারা ব্যাংকক, সিঙ্গাপুরে গিয়ে শিক্ষা নিতে পারে না, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারে না, তাদের জন্য আপনি কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন? তাদের জন্য গণপরিবহন তৈরি হচ্ছে কি না, তাদের শিশুরা সে রকম মানের উচ্চশিক্ষা পাচ্ছে কি না, এটিই বড় বিষয়।’ তিনি বলেন, দেশে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু গরিব মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সক্ষমতা বাড়ছে না। বরং আয়বৈষম্য, ধনের বৈষম্য ও ভোগের বৈষম্য বাড়ছে।’

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে ধরনের চাপ এ মুহূর্তে সরকারের আছে, সেই চাপের স্বীকৃতি অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে নেই বলে মনে করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, ‘যেহেতু সমস্যাটারই স্বীকৃতি নেই, সেহেতু উনারা কোনো অভিনব কৌশল খোঁজেননি। মুদ্রানীতির ভেতর, বাণিজ্য নীতির ভেতরে অথবা ভর্তুকি বিতরণের ক্ষেত্রে—কোনো ক্ষেত্রেই সেই ধরনের অভিনবত্ব নেই। অর্থাৎ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী যে ধরনের অভিনবত্ব দেখিয়েছেন, উনার বাজেট প্রস্তুতের এবং প্রস্তাবের ভেতর সেই অভিনবত্বটা আমরা দুঃখজনকভাবে খুঁজে পাইনি।’

গত্বাঁধা কিছু ভালো কথা আছে বাজেটে : আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল, সেগুলোর বিষয়ে বাজেটে কিছু আছে কি না, সেটিও তুলে ধরা হয় সিপিডির পর্যালোচনায়। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ধরে এ বাজেট তৈরি করেছে বলে সিপিডি মনে করছে না। বরং গত্বাঁধা কিছু ভালো কথা থাকে, সেই কথাগুলো আছে বাজেটে। সেই কথাগুলো যখন আছে, সেগুলোর আবার কর্মসূচি নেই।’ এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথা বলেছেন। কিন্তু কোন খাতে, কত দিনে, কতজন করে কাজ পাবে তার কোনো প্রাক্কলন বাজেটে নেই। বাজেটে বলা হয়েছে, করদাতার সংখ্যা এক কোটি হবে। বলে দিলাম শিগগিরই হবে; কিন্তু শিগগিরই মানে সেটা কবে হবে, দুই বছর পর না পাঁচ বছর পর? পৃথিবীতে যেকোনো কর্মসূচি যখন দেওয়া হয়, সেটার বিশ্বাসযোগ্যতা থাকা দরকার। আপনি নির্দিষ্ট করে বলেন যে আমি এটা নিয়ে এই অর্জন করতে চাচ্ছি। এ অর্জনের জন্য এই কৌশল নিয়েছি। এ কৌশলকে কার্যকর করার জন্য এই পদক্ষেপগুলো নিয়েছি। এটা যতক্ষণ না বলেন, ততক্ষণ আমি অর্থনীতিবিদ হিসেবে আশ্বস্ত হই না। নাগরিক হিসেবে খুব খুশি হই। তবে নাগরিক ও অর্থনীতিবিদের মধ্যে পার্থক্য আছে কিন্তু। তাই বাজেটে নির্দিষ্ট করে কিছু না বলাটাও বৈষম্য।’

প্রবৃদ্ধি টেকানো কষ্টকর হবে : দেবপ্রিয় বলেন, যে সমাজে অসাম্য বৃদ্ধি পায়, বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, সেই সমাজ আজ হোক বা কাল হোক টেকে না। সে সমাজগুলোতে প্রবৃদ্ধি হারে পতন ঘটে। যে হারে বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ছে, তাতে ৭, ৮, ৯ ও ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি টেকানো কষ্টকর হবে। এটা ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। বাংলাদেশ তো সৃষ্টি হলো বৈষম্যের কারণে। বাংলাদেশের সংবিধানটাই হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। তাই ওই বৈষম্য যদি দেশের ভেতর বাড়তে থাকে, তাহলে আমরা আগামী দিনে কিভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাব?’

বাজেট নিয়ে এনবিআর আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যের মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার তফাত পাওয়ার কথা তুলে ধরে দেবপ্রিয় বলেন, এর ফলে বাজেটে স্বচ্ছতার অভাব থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ট্যাক্সের যে উেস কর কাটা হবে সেটার স্ল্যাবগুলো কী হবে, সেটা বাজেট বক্তব্যের ভেতর আছে ২৫ লাখ টাকা। আর এনবিআর হিসাব দিয়েছে ১৫ লাখ টাকা। এখানে সমস্যা রয়ে গেছে।

দেবপ্রিয় বলেন, অঘোষিত আয় ও বেআইনি আয়কে আলাদা করার সময় এসেছে। সরকারি টাকায় অবকাঠামো নির্মাণ করে জিডিপি বাড়ানোর চেষ্টা প্রগৈতিহাসিক ধারণা। এটা অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা